ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের হামলায় ইসরায়েলে বাড়ছে হতাহতের সংখ্যা। গত শনিবার হামাসের প্রথম হামলার জবাবে ইসরায়েল গাজায় লাগাতার পাল্টা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। সেখানেও বাড়ছে নিহত মানুষের স্বজনদের আহাজারি আর আহতদের আর্তনাদ। তবে তার মধ্য থেকেই হামাস হামলা অব্যাহত রেখেছে। গতকাল বুধবার বিকেলেও তারা ইসরায়েলের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য করে রকেট হামলা চালিয়েছে। শনিবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষাব্যুহ ভেদ করে আকস্মিক হামলা চালিয়ে দেশটিকে হতভম্ব করে দেওয়ার পর এখনো তা অব্যাহত রাখার নেপথ্য কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা দুটি বিষয়কে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন; এর একটি হলো হামাসের হাতে আসা বিপুল অস্ত্র এবং আরেকটি হামলার পরিকল্পনা ও দৃঢ় মনোবল।
হামাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকটি সূত্রের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ যা দাঁড়ায় তা হলো এ হামলার মাস্টারমাইন্ড মোহাম্মদ দাইফ যিনি ছায়ামানব নামেও পরিচিত। হামাসের সামরিক শাখা আল কাসাম ব্রিগেডের এই প্রধান দুই বছরের বেশি সময় ধরে এ হামলার প্রস্তুতি নিয়েছে এবং ইরান, সিরিয়া, লেবানন এমনকি তালেবানদের থেকেও অস্ত্র সংগ্রহ করেছেন। তার পরিকল্পনা ও কৌশলেই ইসরায়েলের কড়া নজরদারি ফাঁকি দিয়ে গাজায় প্রবেশ করেছে।
রয়টার্স হামাস ঘনিষ্ঠ একটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, জেরুজালেমে ইসলামের তৃতীয় পবিত্র স্থানে ইসরায়েলের অভিযান আরব ও মুসলিম বিশ্বকে ক্ষুব্ধ করলে ২০২১ সালের মে মাসে দাইফ পাল্টা জবাব দেওয়ার পরিকল্পনা করেন। সূত্রটি বলছে, হামাসের এ হামলার পরিকল্পনা দীর্ঘদিনের। দুই বছর আগে রমজান মাসে আল আকসা মসজিদে ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতা, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মারধর, তরুণ ও বয়স্কদের টেনেহিঁচড়ে মসজিদের বাইরে বের করে দেওয়ার ঘটনা থেকে পরিকল্পনার শুরু। ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানের সেসব দৃশ্য থেকেই হামাসের মধ্যে ক্রোধ জমাট বাঁধতে থাকে আর এটি বিস্ফোরিত হয় শনিবার ভোরে। রয়টার্স বলছে, আল আকসা মসজিদ প্রাঙ্গণে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযানই জেরুজালেমে সার্বভৌমত্ব ও ধর্ম নিয়ে সহিংসতার কারণ হিসেবে কাজ করেছে। এ কারণেই হামাস নেতা দাইফ হামলাকে ‘আল আকসার বন্যা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আর সেটি সাধারণ ফিলিস্তিনিরাও দারুণভাবে গ্রহণ করেছে।
অবশ্য দাইফ সাধারণ ফিলিস্তিনিদের কাছে এত বেশি গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার পেছনে কারণও রয়েছে। ব্যক্তি হিসেবে দাইফ কথা বলেন কম, প্রকাশ্যেও আসেন না। এজন্য তাকে ‘অধরা’ বা ‘ছায়ার মানুষ’ আখ্যা দেয় হামাস। রয়টার্স জানাচ্ছে, দাইফের ছবি আছে মাত্র তিনটি। একটি তার ২০ বছর বয়সের, অন্যটি মুখোশ পরা। তৃতীয়টি হচ্ছে তার ছায়াচিত্র। কোনো অডিও টেপ সম্প্রচারের সময় ব্যবহার করা হয় সেটি। দাইফের অবস্থানও কেউ জানে না। যদিও ধারণা করা হয়, সম্ভবত তিনি গাজার সুড়ঙ্গের গোলকধাঁধায় থাকতে পারেন। হামাসের ঘনিষ্ঠ সূত্রটি রয়টার্সকে বলেছে, হামাসের আল কাসাম ব্রিগেড পরিচালনা করেন দাইফ। গাজায় হামাসের নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ারের সঙ্গে যৌথভাবে ইসরায়েলের হামলার পরিকল্পনা করেছেন তিনি। তবে হামলার মূল কারিগর তিনিই ছিলেন। ইসরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্রও বলছে, দাইফ হামলার পরিকল্পনা ও পরিচালনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।
১৯৪৮ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর তৈরি করা খান ইউনিস শরণার্থী শিবিরে ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন মোহাম্মদ মাসরি। যিনি পরে ১৯৮৭ সালে ফিলিস্তিনিদের প্রথম ইন্তিফাদার সময়ে হামাসে যোগ দিয়ে হয়ে যান মোহাম্মদ দাইফ। হামাসের একটি সূত্র বলছে, ১৯৮৯ সালে ইসরায়েল তাকে আটক করেছিল। সে সময় তিনি প্রায় ১৬ মাস আটক ছিলেন। গাজার ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে বিজ্ঞানের ওপর ডিগ্রি নেন দাইফ। সেখানে তিনি পদার্থ, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। শিল্পকলার প্রতি তার অনুরাগ ছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদন কমিটির প্রধান ছিলেন তিনি। মঞ্চে কমেডিয়ান হিসেবে অভিনয়ও করেছিলেন। হামাসের পদে এসে এ সংগঠনের নেটওয়ার্ক বৃদ্ধি এবং বোমা তৈরির দক্ষতার উন্নয়ন ঘটান। কয়েক দশক ধরে ইসরায়েলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকার শীর্ষে রয়েছেন দাইফ। হামাসের সূত্র বলছে, তাকে হত্যাচেষ্টায় ইসরায়েলের চালানো এক হামলায় একটি চোখ হারান তিনি। এ ছাড়া এক পায়ে গুরুতর আঘাত পান। ২০১৪ সালে ইসরায়েলের বিমান হামলায় নিহত হন দাইফের স্ত্রী, সাত মাস বয়সী ছেলে ও তিন বছরের মেয়ে। রয়টার্স বলছে, হামাসের সশস্ত্র শাখা চালানোর মুহূর্তে ইসরায়েলে বিরুদ্ধে তার টিকে থাকা তাকে ফিলিস্তিনি জনগণের মধ্যে বীরের মর্যাদা এনে দিয়েছে। সে কারণেই শনিবার হামাসের টিভি চ্যানেল হামলার ঘোষণা তিনিই দেন। একটি ধারণ করা বক্তৃতায় তিনি বলেন, আজ আল আকসার ক্রোধ, আমাদের জনগণ ও জাতির ক্রোধ বিস্ফোরিত হচ্ছে। আমাদের মুজাহিদীন (যোদ্ধা), আজ তোমাদের দিন অপরাধীকে বোঝানো যে, তার শেষ সময় এসেছে।
এদিকে শুধু দাইফের কৌশল ও নেতৃত্ব দিয়ে ইসরায়েলই হতভম্ব করা সম্ভব হয়নি বলে মনে করছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি। ইসরায়েলের কড়া পাহারা এড়িয়ে কী করে হামাস যোদ্ধাদের হাতে অস্ত্র পৌঁছেছে, সংবাদমাধ্যমটি এক বিশ্লেষণে এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে।
এনডিটিভি বলছে, গাজার আয়তন মাত্র ৩৬৫ বর্গকিলোমিটার। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী পুরো অঞ্চলের দখল নিয়েছিল। সেই থেকে ফিলিস্তিনের মুক্তিকামী জনগণ তাদের লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। ইতিহাসের নানান ঘটনার পথ পেরিয়ে ইসরায়েলের সেনারা গাজা ছেড়ে চলে যায় ২০০৫ সালে। পরের বছর নির্বাচনে গাজার ক্ষমতায় আসে ফিলিস্তিনিদের সশস্ত্র সংগঠন হামাস। তারা ক্ষমতায় আসায় এ ভূখণ্ডে নজরদারি কঠোর করে ইসরায়েল, যাতে বাইরে থেকে হামাসের হাতে কোনো অস্ত্র পৌঁছতে না পারে।
গাজার দুদিকে ইসরায়েল ও একদিকে মিসর। অন্যদিকে ভূমধ্যসাগর। মিসর বরাবরই এ সীমান্ত কঠোর পাহারায় রেখেছে। পশ্চিমে ভূমধ্যসাগরে রয়েছে ইসরায়েলি নৌবাহিনীর কঠোর অবস্থান। তারা গাজার বাসিন্দাদের সমুদ্রে সর্বোচ্চ ১২ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত স্বাধীনভাবে চলাচল করতে দেয়; এর বেশি যাওয়ার অনুমতি নেই।
এর মধ্যেও সব নজরদারি এড়িয়ে হামলার প্রস্তুতিতে অস্ত্রের জোগান পাওয়া এবং হামলা চালানোর বিষয়ক এ বিশ্লেষণে এনডিটিভি জানায়, অস্ত্র পাচারকারীরা ভূমধ্যসাগর উপকূলে অস্ত্র ফেলে যায়। তারপর সেগুলো সুযোগ-বুঝে হামাসের কাছে সরবরাহ করা হয়। ইসরায়েলের কড়া পাহারার মধ্যেও তারা যে এ কাজে সফল হয়, তার প্রমাণ গত শনিবার হামাসের ছোড়া রকেটগুলো।
মাটির নিচে সুড়ঙ্গ পথ দিয়েও হামাসের কাছে অস্ত্র পৌঁছে দেয় অস্ত্র চোরাকারবারিরা। গাজার সঙ্গে মিসরের যে সীমান্ত আছে, মূলত সেই সীমান্ত ব্যবহার করে সুড়ঙ্গ পথে গাজায় অস্ত্র আসে।
অন্যদিকে হামাসের হাতে থাকা ফজর-৩, ফজর-৫ এবং এম-৩০২ রকেটগুলো আসে ইরান ও সিরিয়া থেকে। ফজর-৩ ইরানের তৈরি ভূমি থেকে ভূমিতে উৎক্ষেপণযোগ্য আর্টিলারি রকেট। ৪৩ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত উড়ে যেতে পারে ফজর-৩।
আরেক সশস্ত্র বাহিনী হিজবুল্লাহর হাতে প্রচুর ফজর-৩ রকেট রয়েছে। ফজর-৫ রকেট ৭৫ কিলোমিটার পর্যন্ত উড়ে গিয়ে প্রচণ্ড বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। এম-৩০২ রকেট বা খাইবার-১ রকেটও ইরানের তৈরি। দীর্ঘপাল্লার এ রকেটও ব্যবহার করেছে হামাস। হিজবুল্লাহ যার জোগান দিয়েছে বলে অনেকের ভাষ্য।
গত শনিবার ভোরে মাত্র ২০ মিনিটে ইসরায়েলে পাঁচ হাজারের বেশি রকেট ছুড়েছে হামাস। মূলত ব্যাপক এবং দ্রুতগতির এ হামলা ইসরায়েলকে কয়েক ঘণ্টার জন্য সেদিন দিশাহীন করে দিয়েছিল।
এনডিটিভি বলছে, বছরের পর বছর ধরে হামাস নিজেদের রকেট প্রযুক্তিতেও একটু একটু করে উন্নতি করেছে। তবে ইসরায়েলের প্রায় দুর্ভেদ্য আয়রন ডোম আকাশ সুরক্ষা ব্যবস্থাকে তীব্র হামলায় চমকে দিতে মূলত ইরানের তৈরি অস্ত্রগুলোর ব্যবহার করেছে হামাস। যদিও ইরান হামাসের এ হামলার সঙ্গে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এমনকি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামাসকে তহবিল জোগান দেওয়ার অভিযোগও তারা উড়িয়ে দিয়েছে।
২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, হামাস ইরানের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ, তহবিল ও অস্ত্র পায়। হামাসের তহবিলের ৭০ শতাংশের জোগানদাতা ইরান বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
এদিকে এমন খবরও শোনা যাচ্ছে যে, ইসরায়েলের বিরুদ্ধে হামলায় হামাস যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি অস্ত্রও ব্যবহার করেছে এবং তার জোগান দিয়েছে আফগানিস্তানের তালেবান। ২০২১ সালে আফগানিস্তান অভিযান সমাপ্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরপরই পুনরায় দেশটির নিয়ন্ত্রণ নেয় তালেবান। তখন দেশটিতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রচুর অস্ত্র তাদের হাতে চলে যায়। সেগুলোর কিছু এসেছে হামাসের কাছে।
