আশপাশের সব বাড়ি ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে ইসরায়েলের বোমা। আগ্রাসী ইসরায়েলের অবিরাম বোমা বৃষ্টি এড়িয়ে এখনো প্রাণে বেঁচে আছে গাজা সিটির আহমেদ আল সাদি ও তার পরিবার। গত ৭ অক্টোবর থেকে চলা হামলায় এ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার লোক প্রাণ হারিয়েছে গাজায়।
আহমেদ সাদির পরিবারের সদস্যরা প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিলেন জাতিসংঘ পরিচালিত একটি স্কুলে। ভেবেছিলেন সেখানে হানাদারের মৃত্যুদূত তেড়ে আসবে না। কিন্তু তাদের ভাবনা মিথ্যা প্রমাণ করে একাধিকবার বোমা পড়েছে সেখানে। মারা গেছেন বেশ কয়েকজন। ‘স্কুলেও যদি বোমা হামলা হয়, তাহলে আমরা কোথায় যাব?’ বলছিলেন সাদি।
সাদির মতো এই প্রশ্ন অবরুদ্ধ উপকূলীয় এই ছিটমহলের হতাশ আর নিরুপায় মানুষের মুখে মুখে। ইসরায়েল গাজার উত্তরাঞ্চল ও কেন্দ্রস্থলকে ‘সন্ত্রাসীদের অঞ্চল’ হিসেবে আখ্যায়িত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে খালি করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছে। হামাস ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিশানা করে অভিযান চালাতে তারা সাধারণ মানুষকে সরে যাওয়ার জন্য বিমান থেকে প্রচারপত্র বিলি করেছে এবং রেকর্ড করা ফোনকলে সতর্ক করে দিয়েছে। ওই ২৪ ঘণ্টা শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলি বাহিনী গত শুক্রবার রাত থেকে ওই অঞ্চলে অভিযান শুরু করেছে। তার আগেই দলে দলে লোকজন পরিবারসহ ঘরবাড়ি ছেড়ে অনিশ্চিত যাত্রায় রাস্তায় নেমে আসে। তবু মৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পায়নি। তিনটি স্থানে সাধারণ মানুষকে বহন করা দুটি ট্রাক ও একটি কারে বোমা হামলায় ৭০ জনের মতো নিহত হয়েছে। তাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু বলে গাজার সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আরও ভয়ংকর যে, ওই অঞ্চলের হাসপাতালগুলো দুই ঘণ্টার মধ্যে খালি করার ফরমান জারি করেছে ইসরায়েল। তাদের এমন পদক্ষেপকে ‘অসম্ভব’ আখ্যায়িত করে জাতিসংঘ বলেছে, এর পরিণতি ‘ভয়াবহ বিপর্যয়’ ডেকে আনবে। এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ইসরায়েল তার ‘দাগি চেহারাটা’ উন্মোচন করেছে।
শুক্রবার দলে দলে গাজাবাসীকে পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ১৯৪৮ সালে তাদের পূর্বপুরুষদের দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। ওই সময় নবগঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের সেনাবাহিনী ফিলিস্তিনের ৫০০ গ্রাম ও শহর ধ্বংস করে দিয়েছিল। হাজার হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা করা হয়েছিল। নিজেদের জন্মভূমি থেকে উৎখাত হয়েছিল সাড়ে ৭ লাখ মানুষ। সেটা যদি হয় ফিলিস্তিনিদের ওপর নেমে আসা প্রথম ধ্বংসযজ্ঞ, তাহলে এবারের ঘটনাটি তাদের জন্য দ্বিতীয় বিপর্যয়। আরবি ভাষায় এমন দুর্যোগকে নাকবা বলা হয়। প্রথম নাকবার সময় নারী, শিশু ও বৃদ্ধ কেউ ইসরায়েলি বাহিনীর হাত থেকে রেহাই পায়নি। যারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল তারা আর ফিরতে পারেনি। এবারও কেউ ফিরতে পারবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
একটি সংবাদ সম্মেলনে গরবায় পরিবারের এক সদস্য বলছিলেন, তিনি তার ২০ জনের বেশি স্বজন এবং আবু আলি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দক্ষিণ গাজার দিকে রওনা হয়েছিলেন। পথে তাদের ওপর ইসরায়েলি বাহিনীর বিমান হামলা হয়। তিনি অচেতন হয়ে পড়েছিলেন। যখন জ্ঞান ফিরল তখন আবার হামলা হলো। চারদিকে তাকিয়ে তিনি দেখেন তার পরিবারের সদস্যদের কেউ মারা গেছেন, কেউ আহত হয়েছেন। একটি মেয়ের মাথা চুরমার হয়ে মগজ ছিটকে গেছে। তাদের উদ্ধারের জন্য যখন অ্যাম্বুলেন্স এলো তখন আবার বিমান থেকে বোমা ফেলা হলো। মনে হলো নারী-শিশুদের সবাইকে হত্যা করতে চায় তারা।
হাজার হাজার লোক ঘরবাড়ি ছাড়লেও অনেকে পালাতে চান না এবং তারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। শুক্রবার গাজার বিভিন্ন স্থানে বহু লোক রাস্তায় ভিড় করে স্লোগান দিচ্ছিল, তারা বলছিল জীবন গেলেও ঘরবাড়ি ছাড়বে না। দক্ষিণ গাজামুখী গাড়িবহরে বোমা হামলা তাদের ক্ষোভকে আরও উসকে দিয়েছে।
কারাম আবু কুতা নামে একজন আলজাজিরা টিভিকে বলছিলেন, যদি এমন হয় যে ইসরায়েলের সেনারা তাদের ওপর যেখানে হোক যেভাবে হোক বোমা মারবে তাহলে বাড়িতেই থাকবেন এবং বাড়িতে মরাই ভালো। সূত্র আলজাজিরা
ইসরায়েল গতকাল শনিবার পর্যন্ত অষ্টম দিনের মতো গাজাকে পুরোপুরি অবরোধ করে রাখে। তারা জরুরি চিকিৎসা উপকরণ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ বন্ধ করে দিয়ে মানবিক বিপর্যয়কে আরও অবনতির দিকে ঠেলে দিয়েছে।
গাজাবাসীর হতাশা ও তাদের প্রতি চরম অন্যায়ের অনুভূতি জানিয়ে গাজা সিটির একজন বাসিন্দা বলছিলেন, ‘ইসরায়েল পানি, বিদ্যুৎ ও খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে। তারপর আমাদের ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য করছে। তারা কেন আমাদের সঙ্গে এমন করছে? আমরা গাজায় বসবাসকারী ফিলিস্তিনি বলে?’ তিনি বলছিলেন, ‘এটা দ্বিতীয় নাকবা। কিন্তু দখলদার ইসরায়েলের বোঝা উচিত, এ ভূমি থেকে আমাদের নিশ্চিহ্ন করা যাবে। এই মাটিতে আমাদের শিকড় রয়েই যাবে। স্বাধীনতার ন্যায্য অধিকার, শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আমরা লড়াই চালিয়ে যাব।’
