বিজয়কেতন উড়ল কিংস অ্যারেনায়

আপডেট : ১৭ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৩৫ পিএম

বাহরাইনের রেফারির শেষ বাঁশি বেজে উঠতেই শুরু বুনো উল্লাস। কিংস অ্যারেনার গ্যালারির সাত হাজার দর্শকের সঙ্গে একাকার হয়ে গেলেন বাংলাদেশের ফুটবলাররা। মালদ্বীপের বিপক্ষে ২-১ গোলে জয়ের মাহাত্ম্য যে অনেক। ঘরের মাঠে চেনা পরিবেশে এই জয়ে বাংলাদেশ পেয়েছে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের দ্বিতীয়পর্বের ছাড়পত্র। কাল মালদ্বীপ চ্যালেঞ্জের সামনে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলল লাল-সবুজের সৈনিকরা। দুই ফরোয়ার্ড রাকিব হোসেন ও ফয়সাল আহমেদ ফাহিম সুযোগ কাজে লাগিয়ে দেশকে দিলেন লাইফলাইন। ১৭ নভেম্বর দ্বিতীয়পর্বের অভিযান শুরু হবে মেলবোর্নে শক্তিশালী অস্ট্রেলিয়ার মোকাবিলায়।

বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে ঢিমেতালে চলা সংস্কারের সুযোগে এখন দেশের ফুটবলের তীর্থক্ষেত্র কিংস অ্যারেনা। বসুন্ধরা কিংসের হোম ভেন্যুটা এখন বাংলাদেশেরও। আর এই ভেন্যুতে না হারার রেকর্ড অক্ষুণœ রাখতে বাংলাদেশ খেলেছে চাপ জয় করা ফুটবল। অথচ এই ম্যাচ নিয়ে কতই না শঙ্কা ছিল। ‘মদকা-ে’ দলের তিন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় জায়গা হারিয়েছেন। তাদের বাদ দিয়ে ১২ অক্টোবর মালেতে বাংলাদেশের খেলায় অস্বস্তি ছিল স্পষ্ট। ‘সুপার সাব’ সাদউদ্দিন দ্বিতীয়ার্ধের যোগ করা সময়ে গোল না করলে হারের হতাশা নিয়ে ফিরতে হতো। তখন কিংস অ্যারেনায় কাজটাও আরও কঠিন হতো। তবে কাল সেই অস্বস্তি মুছে দিয়ে হাভিয়ের কাবরেরার দল খেলেছে ছকে বাঁধা ফুটবল।

এই ম্যাচে বাংলাদেশের একাদশে একটা পরিবর্তন আনেন কাবরেরা। আগের ম্যাচের নায়ক সাদউদ্দিনকে একাদশে রাখতে লেফটব্যাক ইশা ফয়সালকে বেঞ্চে পাঠান কোচ। সিদ্ধান্তটা কাজে দিয়েছে দারুণভাবে। পুরোটা ম্যাচ সাদউদ্দিন খেলেছেন নির্ভুল ফুটবল। নির্ভুল ছিলেন বাকি তিন ডিফেন্ডার তারিক কাজী, বিশ্বনাথ ঘোষ ও তরুণ শাকিল হোসেনও। তবে আলাদা করে বলতে হবে দুই ফরোয়ার্ড রাকিব ও ফাহিমের কথা। মালেতে গোল মিসের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন ফাহিম। কাল তাই গোলের মূল দায়িত্বটা নেন রাকিব। ছন্দে থাকা এই ফরোয়ার্ড ১১ মিনিটে গোল করে স্বাগতিকদের এগিয়ে নেন। ডান দিক থেকে সাদের থ্রু অনেকটা দৌড়ে গিয়ে বাইলাইন থেকে কাটব্যাক করেন ফাহিম। চলন্ত বলে রাকিবের ডান পায়ের প্লেসিং জালে জড়ালে নেচে ওঠে গ্যালারি। চার মিনিট পর অবশ্য বাংলাদেশকে হতাশ করেন মালদ্বীপ কিপার হুসেইন শরিফ। ডান দিক থেকে জামালের ক্রসে ফাহিমের শট এক ড্রপে জালে জড়ানোর আগ মুহূর্তে ফিস্ট করেন সফরকারী দলের কাস্টডিয়ান। ম্যাচে ফিরতে মালদ্বীপও চেষ্টা চালায় আক্রমণে ওঠার। তবে সেগুলো সেভাবে দানা বাঁধেনি বাংলাদেশের ডিফেন্সের দৃঢ়তায়। ২৯ মিনিটে ব্যবধান বাড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগাতে পারেননি রাকিব। নিজেদের অর্ধ থেকে হৃদয়ের লম্বা বল মালদ্বীপের এক ডিফেন্ডারের মাথা ছুঁয়ে বক্সে এলে রাকিব অপ্রস্তুত মালদ্বীপ কিপারকে একা পেয়ে গিয়েছিলেন। তবে তার বাঁ পায়ের প্লেসিং কোনোমতে পা দিয়ে ঠেকিয়ে দেন হুসেইন শরিফ। এর চার মিনিট পর ডান দিক দিয়ে ভীতি ছড়ানো মালদ্বীপ তারকা হামজা মোহাম্মদ মিতুল মারমার পরীক্ষা নেন কোনাকুনি শটে। তবে জিকোর জায়গায় খেলতে নামা মিতুল দারুণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন। তবে ৩৬ মিনিটে পারেননি মিতুল। ডিফেন্সের মুহূর্তের অসতর্কতায় ম্যাচে ফেরে মালদ্বীপ। হামজার কর্নার হেড করে ক্লিয়ার করতে গিয়ে গোলমুখের জটলায় ফেলেন ফাহিম। বাংলাদেশের ডিফেন্ডারদের চোখ এড়িয়ে তাতে আইসাম ইব্রাহিম হেড করে গোল করেন।

বিরতি থেকে ফিরেই লিড পুনরুদ্ধার করে বাংলাদেশ। বাঁ দিক দিয়ে আক্রমণে উঠে সাদের কোনাকুনি শট কোনোমতে ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন হুসেইন শরিফ। তবে ফিরতি বল সোহেল রানার পা হয়ে ফাহিমের কাছে এলে বাঁ পায়ের প্লেসিংয়ে ২-১ করেন। এই গোলের পরও আক্রমণে এগিয়ে ছিল বাংলাদেশ। তবে ম্যাচটা নাটকীয় মোড় নেয় বাংলাদেশ মিডফিল্ডার ছোট সোহেল রানার ভুলে। ৫৯ মিনিটে দলকে বিপদে ফেলে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন সোহেল। মালদ্বীপের অর্ধে এসে অহেতুক বিপজ্জনক সøাইডিং ট্যাকল করে সোহেল দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখলে বাংলাদেশ দশজনের দলে পরিণত হয়। তবে বাকি সময়টা ভালোভাবেই সামলেছেন দশে মিলে। উল্টো ৬১ মিনিটে আরও এগিয়ে যেতে পারত বাংলাদেশ। ডান দিক থেকে জামালের নিচু ক্রস ফাহিমকে খুঁজে পাওয়ার আগেই বদলি সিফাউ ইউসুফ কর্নারের বিনিময়ে ক্লিয়ার করলে সে যাত্রায় বেঁচে যায় মালদ্বীপ। বাকি সময়টায় মালদ্বীপ বাংলাদেশের রক্ষণ চেপে ধরলেও কাক্সিক্ষত গোলের দেখা পায়নি। তাতে দীর্ঘদিন পর দেশের ফুটবলে দারুণ এক জয় উদযাপনের উপলক্ষ পায় ফুটবলপ্রেমীরা।

জয়টা দলের হলেও দারুণ একটা বাজি জিতে নিয়েছেন কোচ কাবরেরা। এই ম্যাচে তার ওপর চাপ ছিল শেখ মোরসালিনকে ফেরানোর। প্রথম ম্যাচে ফাহিমের অবিশ্বাস্য ভুলগুলো বারবার মোরসালিনের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিল। তরুণ ফরোয়ার্ডকে ফেরানোর চাপটা ছিল নানামুখী। তবে কোচ ছিলেন অটল। যারা আছে, তাদের ওপরই রেখেছিলেন আস্থা। তার প্রতিদান খেলোয়াড়রা দিয়েছেন দারুণ জয়ে।

২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে এই মালদ্বীপকে হারিয়েই শিরোপা উল্লাস করেছিল বাংলাদেশ। কুড়ি বছর পর এই জয়ের গুরুত্বটাও নেহাত কম নয়। দুই লেগের প্রথমপর্ব ৩-২-এ জিতে বাংলাদেশ জায়গা পেয়েছে দ্বিতীয়পর্বে ‘আই’ গ্রুপে। যেখানে আগে থেকেই আছে তিন শক্তিশালী প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ফিলিস্তিন ও লেবানন।

স্মরণীয় জয়ের পর বাংলাদেশের ফুটবলাররা ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে উদযাপনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে কাল। সেই ফিলিস্তিনের সঙ্গেই ঘরের মাঠে ২১ মার্চ খেলতে হবে তাদের। তার আগে ১৭ নভেম্বর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে অ্যাওয়ে ম্যাচের পর ২১ নভেম্বর নিজেদের মাঠে লেবাননের কাছে পরীক্ষা দিতে হবে বাংলাদেশকে। গ্রুপপর্বে তিনটি দলই র‌্যাংকিংয়ে অনেক এগিয়ে বাংলাদেশের। তাই খুব বড় স্বপ্ন দেখার সুযোগ নেই। তবে কাবরেরার এই দলটা যে ভয়ডরহীন ফুটবল খেলতে শিখে গেছে, তার প্রমাণ আরেকবার মিলল কিংস অ্যারেনায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত