রাজনীতিতে ঝড় তুলে ‘হারিয়ে যাওয়া’ তরুণরা

আপডেট : ২২ অক্টোবর ২০২৩, ০২:১৯ এএম

রাজনীতিতে এসে ঝড় তুলেছেন কিংবা ঝড়ের আভাস দিয়েছেন এমন তরুণদের অনেকেই রাজনীতি থেকে হারিয়ে গেছেন। তাদের মধ্যে যে কয়জনকে নিয়ে আলোচনা হয় তাদের অন্যতম মাহী বি চৌধুরী, ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, ডা. ইমরান এইচ সরকার ও ববি হাজ্জাজ।

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর ছেলে মাহী বি চৌধুরী। বাবার হাত ধরেই রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছিলেন তিনি। শুরুতে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও, ২০০৪ সালে বাবা ছেলের নেতৃত্বে বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করেন। বর্তমানে তিনি দলটির যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্বে রয়েছেন।

বিকল্পধারা বাংলাদেশ দেশের রাজনীতিতে খুব একটা শক্ত অবস্থানে না থাকলেও বরাবরই আলোচনায় ছিলেন মাহী বি. চৌধুরী। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘প্লান-বি’ নামের একটি উদ্যোগ নিয়ে তরুণ রাজনীতিক হিসেবে আলোচনায় আসেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল এর মাধ্যমে তরুণদের দলে ঐক্যবদ্ধ করা। সে অনুযায়ী ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সভা সেমিনার আয়োজন করতে থাকেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। এতে রাজনীতির প্রতি আগ্রহী থাকা তরুণদের মধ্যেও বেশ সাড়া ফেলে। তবে বেশিদূর এগোয়নি ওই প্লাটফর্ম। বিশেষ করে ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর তা  মুখ থুবড়ে পড়ে।

২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন মাহী। নিজ নির্বাচনী এলাকায়ও খুব একটা দেখা যায়নি তাকে। এমন অবস্থায় তরুণ রাজনীতিক হিসেবে আলোচনায় আসা মাহী বি চৌধুরী সক্রিয় রাজনীতি থেকে দূরে সরে গেলেন কি না সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। এমনকি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলেও কোনো তৎপরতা নেই।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপির সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কথা ছিল বিকল্পধারা বাংলাদেশের। পরবর্তী সময়ে আসন ভাগাভাগি নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় বিএনপি জোটে ঠাঁই হয়নি তার। পরে যুক্তফ্রন্ট নামে আলাদা জোট করেন বদরুদ্দোজা চৌধুরী। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে নির্বাচনে অংশ নেয় এই জোট। মুন্সীগঞ্জ-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিয়ে জয়ী হন মাহী বি চৌধুরী।

মাহী বি চৌধুরীর ঘনিষ্ঠ এক নেতা দেশ রূপান্তরকে জানান, জাতীয় রাজনীতি নিয়ে তিনি এখন আর বেশি সক্রিয় হবেন না। আপাতত নিজ আসন ধরে রাখতেই চেষ্টা করছেন। স্থানীয়ভাবে কিছু কর্মসূচি নিয়েছেন। চলতি মাসেই এসব কর্মসূচিতে যোগ দেবেন।

একই অবস্থা আরেক তরুণ রাজনীতিক ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের। রাজনৈতিক ক্যারিয়ার খুব বেশি লম্বা না হলেও সংসদ এবং রাজনীতির মাঠে সুবক্তা হিসেবে বিপুল পরিচিতি পেয়েছেন। বাবা নাজিউর রহমান মঞ্জুর হাত ধরে রাজনীতিতে এসেছেন তিনি। নাজিউর রহমান মঞ্জু ছিলেন হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সরকারের মন্ত্রী। ছিলেন ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র। জাতীয় পার্টির মহাসচিবও ছিলেন তিনি। পরে মঞ্জুর জাতীয় পার্টি থেকে বেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) নামে দল গঠন করেন। তার মৃত্যুর পর ওই দলের চেয়ারম্যান হন পার্থ।

১৯৯৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করলেও ২০০৮ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের ব্যানারে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। ভোলা-১ আসন থেকে নির্বাচিত হন তিনি। ওই সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের কড়া সমালোচক ছিলেন পার্থ। সংসদ ও টক শোতে বিভিন্ন ইস্যুতে বক্তব্য দিয়ে দারুণ আলোচিত হয়ে ওঠেন নতুন প্রজন্মের এ রাজনীতিক।

এরপর একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের ব্যানারে ঢাকা-১৮ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেন। কিন্তু পরাজিত হন। বিএনপির সংসদে যোগ না দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে ২০ দলীয় জোট ত্যাগ করে পার্থের দল বিজেপি। এর পর  থেকে মাঝেমধ্যে টিভি টকশোতে দেখা গেলেও রাজনীতিতে সক্রিয় নন এই রাজনীতিবিদ। যদিও দলটির নেতাদের মতে, সরাসরি বিএনপির সঙ্গে জোটে না থাকলেও ছায়াসঙ্গী হয়ে এখন তিনি বিএনপির সঙ্গেই রয়েছেন।

জানতে চাইলে ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এখন দলীয় কার্যক্রম নিয়ে আমাদের মতো করে কাজ চলছে। জোটের সঙ্গে নেই বলে হয়তো ফোকাসটা কম হচ্ছে। তবে আমরা নিষ্ক্রিয় নই।’

বিএনপির সঙ্গে আবার ফিরবেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘তারা তো আমাকে ডাকছে না। তাহলে কীভাবে যাব।’

সরাসরি রাজনৈতিক দলে সক্রিয় না হলেও যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের ব্যানারে আলোচনায় আসেন ইমরান এইচ সরকার। ওই সময় গণজাগরণ মঞ্চের নামে লাখ লাখ মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত টানা বিক্ষোভের সবচেয়ে পরিচিত মুখ হয়ে ওঠেন এক তরুণ চিকিৎসক ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট। ।

গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন ইমরান এইচ সরকার ‘নিজের রাজনৈতিক দল হতে পারে’ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ সংসদ নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-৪ আসনে মোটরগাড়ি প্রতীকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ২ হাজার ৭৭৫ ভোট পেয়েছেন। যদিও ফলাফল প্রকাশের আগে আগে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ইমরান এইচ সরকার ওই নির্বাচনের সমালোচনা করে একে ‘ভোট ডাকাতির নির্বাচন’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন আড়ালে চলে গেছেন তিনি। মাঝে মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় থাকলেও প্রকাশ্যে তাকে খুব একটা দেখা যায় না। তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইমরান এইচ সরকারের ঘনিষ্ঠ গণজাগরণ মঞ্চ কর্মী বলেন, তিনি আর এখন রাজনীতিতে সক্রিয় হতে চাচ্ছেন না। নিজেকে সব কিছু থেকে অনেকটা গুটিয়ে নিয়েছেন। আপাতত নিজের মতো করেই আছেন।

অন্যদিকে ২০১৭  সালের আগে দল গঠন করে আলোচনায় আসেন আরেক তরুণ ববি হাজ্জাজ। যদি শুরু থেকেই তাকে নিয়ে রয়েছে নানা বিতর্ক। তবে গত কয়েক বছরে রাজনীতির মাঠে না থাকলেও সম্প্রতি তার দলের তৎপরতা কিছুটা বেড়েছে। 

ববি হাজ্জাজ ২০১৩ সালে জাতীয় পার্টির রিসার্চ অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি উইংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির দশম সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আলোচনায় আসেন তিনি।

ওই নির্বাচনের আগে এরশাদ ‘রহস্যময়’ অসুস্থতা নিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভর্তি হলে ববি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের মুখপাত্র হিসেবে আবির্ভূত হন। কয়েক দিনের মাথায় চলে যান যুক্তরাজ্যে। সেখানে বসে গণমাধ্যমে অভিযোগ করেন, নির্বাচনে অংশ নিতে চান না বলে এরশাদকে সরকার জোর করে সিএমএইচে ভর্তি করে রেখেছে। অভিযোগ করেন, তাকে জোর করে দেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। তার এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দেয়।

২০১৫ সালে ঢাকা সিটির নির্বাচনের সময় জাতীয় পার্টি প্রার্থী ঠিক করার পর তার বিপরীতে মেয়র পদে প্রার্থিতা ঘোষণা করায় ববি হাজ্জাজকে বিশেষ উপদেষ্টার দায়িত্ব থেকে বাদ দেন এরশাদ। এর মধ্য দিয়ে জাতীয় পার্টির সঙ্গে তার চূড়ান্ত বিচ্ছেদ ঘটে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ২০১৭ সালের এপ্রিলে ববি হাজ্জাজ নতুন দল ন্যাশনালিস্ট ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট (এনডিএম) গঠনের ঘোষণা দেন। এরপর ঢাকা-৬ আসন থেকে তিনি নির্বাচনে অংশ নেন বাংলাদেশ মুসলিম লীগের ‘হারিকেন’ প্রতীক নিয়ে। ভোট পেয়েছিলেন ৭৫০টি। এরপর ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি এনডিএমকে নিবন্ধন দিয়ে নির্বাচন কমিশন প্রজ্ঞাপন জারি করে। নিবন্ধন পাওয়ার পর আবার আড়ালে চলে যান।

তবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সক্রিয় হয়েছেন। আগামী নির্বাচনে ৩০০ আসনেই প্রার্থী দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।

ববি হাজ্জাজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুরু থেকে চেষ্টা করেছি তরুণদের নিয়ে একটি রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গড়ে তোলার। সে হিসেবে আমরা কাজ করছি। মাঝখানে করোনাকালে কিছুটা স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল। এখন আবার পুরোদমে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা তরুণ প্রজন্মকে একটি সুস্থধারার রাজনীতি উপহার দিতে চাই। কিন্তু আমাদের যে কার্যক্রম তা গণমাধ্যমে তেমন প্রচারিত হয় না। ফলে আমাদের কর্মকা- অনেকেই জানে না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত