মারদাঙ্গা ম্যাক্সিতে ইতিহাস অজিদের

আপডেট : ২৬ অক্টোবর ২০২৩, ১২:২৩ এএম

বিশ্বকাপ নিয়ে দেশের মানুষের মন ভার। কারণ আসরে বাংলাদেশ নেই খুব একটা সুবিধার জায়গায়। তাই বলে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ আসর তো থেমে থাকবে না। জৌলুশ ছড়ানো বন্ধ করবে না। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে গতকাল এমনই একটি দিনের সাক্ষী হলো পৃথিবী। রেকর্ডময় এই দিনে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ৩০৯ রানের ধুন্ধুমার জয় তুলে নিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রানের ব্যবধানে জয়ের রেকর্ড এটিই।

মারকাটারি ব্যাটিংয়ে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের মাত্র ৪০ বলে বিশ্বকাপে দ্রুততম আর ডেভিড ওয়ার্নারের ৬ষ্ঠ বিশ্বকাপ সেঞ্চুরির সুবাদে এই বিশ্বকাপে নিজেদের সর্বোচ্চ দলীয় সংগ্রহ দাঁড় করায় অজিরা। তাদের ৮ উইকেটে ৩৯৯ রানের জবাব দিতে নেমে মুখ থুবড়ে পড়ে ডাচরা। গুটিয়ে যায় মাত্র ৯০ রানে।

আফগানদের ইংলিশ বধের পদাঙ্ক অনুসরণ করে দক্ষিণ আফ্রিকাকে মাটিতে নামিয়ে এনেছিল ডাচরা। সোমবার পাকিস্তানের বিপক্ষে আবারও তাদের অবিস্মরণীয় জয়ের পর বিশ্ববাসীর তীক্ষè দৃষ্টি পড়ে এডওয়ার্ডস বাহিনীর দিকে। তবে গতকাল টসভাগ্যও পাশে ছিল না ডাচদের। দিল্লির ছোট মাঠে টস জিতে শুরুতে ব্যাট করার সুযোগ হাতছাড়া করেননি অজি দলপতি প্যাট কামিন্স।

এদিন খুব বেশি বড় হয়নি অজিদের উদ্বোধনী জুটি। মিচেল মার্শ ১৫ বলে ৯ রান করে লোগান ফন বিকের বলে ফিরে যান। শেষ দুই ম্যাচে রান খরায় থাকা স্টিভেন স্মিথ এদিন ফর্মে ফেরেন। ওয়ার্নার-স্মিথের ওই জুটি থেকে আসে ১১৮ বলে ১৩২ রান। ৬৮ বলে ৭১ রান করেন স্মিথ। লাবুশেনের ব্যাট থেকেও আসে ৪৭ বলে ৬২ রানের ইনিংস। তবে অজি ইনিংসের লাগাম ধরে রাখেন ডেভিড ওয়ার্নার। ১১ চার ও ৩ ছক্কায় ৯১ বলে নিজের ২২তম ওয়ানডে সেঞ্চুরি পূর্ণ করে স্বদেশি রিকি পন্টিংকে টপকে শচিন টেন্ডুলকারের পাশে বসেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বিশ্বকাপে এককভাবে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিক বনেন ওয়ার্নার। বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরি করা ব্যাটারদের তালিকায় শচিন টেন্ডুলকারের সঙ্গে যৌথভাবে দুইয়ে অবস্থান তার। সামনে আছেন কেবল ৭ সেঞ্চুরি করা রোহিত শর্মা।

এর আগের ম্যাচেই পাকিস্তানের বিপক্ষে ১৬৩ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেন ওয়ার্নার। বিশ্বকাপে টানা দুই সেঞ্চুরি করে নিজ দেশের মার্ক ওয়াহ, রিকি পন্টিং ও ম্যাথু হেইডেনের পাশেও নিজের নামটি লিখিয়ে নেন। তবে গতকাল সেঞ্চুরির পর আর বেশিদূর এগোতে পারেননি। ৯৩ বলে ১০৪ রান করে তিনিও ফেরেন ফন বিকের বলে। অস্ট্রেলিয়ার সংগ্রহ তখন ৩৯.১ ওভারে ৫ উইকেটে ২৬৭ রান।

ওয়ার্নারের ছাড়া লাগাম হাতে তুলে নেন গ্লেন ম্যাক্সওয়েল। নিয়েই পাগলা ছুট দেন। শেষ দশ ওভারে অজিরা সংগ্রহ করে ১৩১ রান। আর তার পুরো কৃতিত্ব গ্লেনের। বিশ্বকাপের দ্রুততম ও ওয়ানডে ইতিহাসের চতুর্থ দ্রুততম সেঞ্চুরি করতে খরচ করেন মাত্র ৪০ বল। এই বিধ্বংসী ইনিংসের পথে ৮টা করে চার ও ছক্কা হাঁকান। ভাঙেন কদিন আগেই করা এইডেন মার্করামের রেকর্ড। এই বিশ্বকাপেই শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৪৯ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন মার্করাম। সেই দিল্লির মাঠেই তার রেকর্ড ভাঙলেন ম্যাক্সওয়েল। এর আগে ম্যাক্সির দ্রুত সেঞ্চুরিটি ছিল ৫১ বলে। ২০১৫ আসরে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে। ক্যারিয়ারে এটি তৃতীয় সেঞ্চুরি তার। ইনিংসের তিন বল বাকি থাকতে ৪৪ বলে ১০৬ রান করে তবেই থামেন তিনি।

মারদাঙ্গা ইনিংসটিতে ম্যাচ সেরা গ্লেনের স্ট্রাইক রেট ছিল ২৪০.৯০। বিশ্বকাপে সেঞ্চুরি ইনিংসে এর চেয়ে বেশি স্ট্রাইক রেট আছে শুধু একজনের। ২০১৫ আসরে উইন্ডিজের বিপক্ষে ১৬২ রানের অপরাজিত ইনিংসে এবি ডি ভিলিয়ার্সের স্ট্রাইক রেট ছিল ২৪৫.৪৫। অজিদের গতকালের সংগ্রহ বিশ্বকাপে নিজেদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্কোর। আফগানিস্তানের বিপক্ষে পার্থে ২০১৫ বিশ্বকাপে ৬ উইকেটে ৪১৭ রান তাদের সর্বোচ্চ সংগ্রহ। বিশ্বকাপে কোনো দলের এর চেয়ে বেশি রানের স্কোর আছে আর ৬টি। লোগান ফন বিক ৪টি আর বাস ডি লিডি ২টি উইকেট শিকার করেন। তবে বাস ডি লিডির কপালে জোটে লজ্জাজনক এক রেকর্ড। ১০ ওভারের স্পেলে ১১৫ রান দিয়ে ওয়ানডেতে এক ইনিংসে সবচেয়ে খরুচে বোলার বনে যান তিনি। দায়মুক্ত করেন ১১৩ রান দেওয়া অ্যাডাম জাম্পাকে।

এই রেকর্ডের দায়মুক্ত হয়েই আরও বেশি জ্বলে ওঠেন জাম্পা। চারশ রানের লক্ষ্যে নামা ডাচ ব্যাটারদের চারজনকে সাজঘরে ফেরান তিনি। ডাচদের সর্বোচ্চ জুটি হয় ২৮ রানের, সেটিও প্রথম উইকেটে। আর ষষ্ঠ উইকেটে ২২ রানের জুটি গতকাল তাদের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। সর্বোচ্চ রান আসে বিক্রমজিত সিংয়ের ব্যাট থেকে, ২৫ রান। ডাচ দলপতি স্কট এডওয়ার্ডস নন-স্ট্রাইকে ১২ রানে অপরাজিত থাকাবস্থায় দেখেন ২১ ওভারে মাত্র ৯০ রানে নেদারল্যান্ডসের অলআউট হওয়ার দৃশ্য। জাম্পার পর মিচেল মার্শ ২টি আর স্টার্ক-কামিন্স হ্যাজেলউড পেসত্রয়ী একটি করে উইকেট শিকার করেন।

ম্যাচে এমন আত্মসমর্পণের পেছনে নিজেদের ব্যাটিং ব্যর্থতাকেই দায়ী করেন ডাচ অধিনায়ক স্কট এডওয়ার্ডস। তবে ম্যাচ শেষে মাইক্রোফোনের সামনে চওড়া হাসি নিয়ে হাজির হন প্যাট কামিন্স। বলেন, ‘এ পুরো ম্যাচ নিয়ে আমি দারুণ খুশি।’ ম্যাক্সওয়েলকে নিয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘এটা একটা পাগলামিতে ভরা ইনিংস।’

হাসতে হাসতে স্মিথ ও লাবুশেনের ইনিংস নিয়ে বলেন, ‘যদিও আমাদের শতরানের জুটিতে সমান অবদান ছিল। অবশেষে আমরা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি। যে ক্রিকেটটা আমরা খেলতে চাচ্ছি সেটা পারছি এখন। আমরা আরও একটি সুন্দর ব্যাটিং পাওয়ার প্লে পার করতে পেরেছি।’ নিজে মাত্র একটি উইকেট নিলেও অজিদের বোলিং ইউনিট নিয়ে স্বস্তি প্রকাশ করেন কামিন্স, ‘জাম্পা অসাধারণভাবে ফিরে এসেছে। আরও একবার ৪ উইকেট শিকার করেছে। ব্যাটে-বলে এই পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতাই রাখতে চাই।’

সংক্ষিপ্ত স্কোর

অস্ট্রেলিয়া : ৫০ ওভারে ৩৯৯/৮ (ওয়ার্নার ১০৪, ম্যাক্সওয়েল ১০৬, স্মিথ ৭১, লাবুশেন ৬২; ফন বিক ৪/৭৪, লিডি ২/১১৫)

নেদারল্যান্ডস : ২১ ওভারে ৯০/১০ (সিং ২৫, নিদামানুরু ১৪, এডওয়ার্ডস ১২*; জাম্পা ৪/৮, মার্শ ২/১৯)।

ফল : অস্ট্রেলিয়া ৩০৯ রানে জয়ী।

ম্যাচসেরা : গ্লেন ম্যাক্সওয়েল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত