দেশের কল কারখানাগুলো ধীরে ধীরে সবুজায়নের দিকে গেলেও শ্রমিকদের ঝুঁঁকি কমেনি। কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত শ্রমিকদের শব্দদূষণ, ধুলো, ধোঁয়া, কম্পন তাদের সবে চেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। তাদের কাছে দ্বিতীয় ঝুঁকিপূর্ণ কাজ হচ্ছে অতিরিক্ত গরম অথবা অতিরিক্ত ঠাণ্ডার পরিবেশ। এ ছাড়া তৃতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক শ্রমিক ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি নিয়ে কাজ করেন। সব মিলিয়ে ৭৮ দশমিক ৩ শতাংশ শ্রমিক এমন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ এর পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বিবিএস বলছে, জরিপের সময় শ্রমিকদের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল তাদের কাজের পরিবেশ কেমন। এতে বেশ কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর নেওয়া হয়েছিল তাদের কাছ থেকে। এতে দেখা যায়, ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ ধুলো, শব্দ দূষণ ও ধোঁয়ায়, ৩০ শতাংশ অতিরিক্ত গরম কিংবা ঠাণ্ডায় এবং ১৬ দশমিক ৬ শতাংশকে ঝুঁকিপূর্ণ যন্ত্রপাতি ব্যবহার করতে হয়।
জরিপে দেখা যায়, শব্দ দূষণ, ধুলো, ধোঁয়া, কম্পনের কাজ তাদের কাছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজের পরিবেশে শহরের শ্রমিকরাই বেশি, ৩৯ দশমিক ৯ শতাংশ। গ্রামের ২৯ দশমিক ৪ শতাংশ শ্রমিক এমন ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন বলে উঠে এসেছে জরিপে।
দেশের বিভিন্ন কারখানায় অতিরিক্ত গরম বা ঠা-ার মধ্যে সবেচেয়ে বেশি কাজ করেন নারীরা, ২৩ শতাংশ, বাকি ১৫ দশমিক ৭ শতাংশ পুরুষ এমন পরিবেশে কাজ করছেন।
শ্রম আইন ২০০৬ এর ৫১ হতে ৯৯ ধারাসমূহে শ্রমিকের পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। শ্রম আইনের উক্ত ধারাসমূহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শ্রমিকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কলকারখানা পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, শ্রমিকদের যাতে স্বাস্থ্যহানি না ঘটে পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল ও যথাযথ তাপমাত্রা বজায় রাখা, প্রত্যেক শ্রমিকের জন্য অন্তত ৯ দশমিক ৫ কিউবিক মিটার পরিমাণ জায়গার ব্যবস্থা করা, পান করার জন্য বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা, মহিলা এবং পুরুষ শ্রমিকদের জন্য পৃথকভাবে শৌচাগার ও প্রক্ষালন কক্ষের ব্যবস্থা করা মালিকের দায়িত্ব। একই সঙ্গে শ্রমিকের ক্ষতি হতে পারে এমন কোনো ভারী জিনিস উত্তোলন, বহন অথবা নাড়াচাড়া করতে না দেওয়ার ব্যাপারেও শ্রম আইনে উল্লেখ রয়েছে।
শ্রমিকের কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অগ্নি দুর্ঘটনার কারণে অথবা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে বহির্গমনের জন্য প্রত্যেক তলার সঙ্গে সংযোগ রক্ষাকারী অন্তত একটি বিকল্প সিঁড়িসহ বহির্গমনের উপায় এবং প্রত্যেক তলায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা উচিত।
কাজ চলাকালীন প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে কোনো কক্ষ হতে বহির্গমনের পথ তালাবদ্ধ বা আটকে রাখা যাবে না। কোনো দরজা স্ল্যাইডিং টাইপের না হলে এমনভাবে তৈরি করতে হবে যেন তা বাইরের দিকে খোলা যায় অথবা যদি কোনো দরজা দুটি কক্ষের মাঝখানে হয়, তাহলে তা ভবনের নিকটতম বহির্গমন পথের কাছাকাছি দিকে খোলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। বহির্গমনের পথ বাধাগ্রস্ত কিংবা পথে কোনো প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করা যাবে না।
প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে সাধারণ বহির্গমনের জন্য ব্যবহৃত পথ ছাড়া অগ্নিকাণ্ডকালে বহির্গমনের জন্য ব্যবহার করা যাবে এরূপ প্রত্যেক জানালা, দরজা বা অন্য কোনো বহির্গমন পথ স্পষ্টভাবে লাল রং দ্বারা বাংলা অক্ষরে অথবা অন্য কোনো সহজবোধ্য প্রকারে চিহ্নিত করতে হবে। প্রত্যেক প্রতিষ্ঠানে, এতে কর্মরত প্রত্যেক শ্রমিককে অগ্নিকাণ্ডের বা বিপদের সময় তৎসম্পর্কে হুঁশিয়ার করার জন্য, স্পষ্টভাবে শ্রবণযোগ্য হুঁশিয়ারি সংকেতের ব্যবস্থা থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কক্ষে কর্মরত শ্রমিকরা অগ্নিকাণ্ডের সময় বিভিন্ন বহির্গমন পথে পৌঁছার সহায়ক একটি অবাধ পথের ব্যবস্থা রাখতে হবে। পঞ্চাশ বা ততধিক শ্রমিক/কর্মচারী সংবলিত কারখানা ও প্রতিষ্ঠানে প্রতি ছয় মাসে অন্তত একবার অগ্নিনির্বাপণ মহড়ার আয়োজন করতে হবে এবং এই বিষয়ে মালিক কর্তৃক নির্ধারিত পন্থায় একটি রেকর্ড বুক সংরক্ষণ করতে হবে।
কোনো প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক যদি দেখতে পান যে, উহার কোনো ভবন বা যন্ত্রপাতি বিপজ্জনক অবস্থায় আছে এবং তা যেকোনো সময় কোনো শ্রমিকের শারীরিক জখম প্রাপ্তির কারণ হতে পারে, সে ক্ষেত্রে তিনি অবিলম্বে লিখিতভাবে মালিককে অবহিত করবেন। মালিক অবহিত হওয়ার তিন দিনের মধ্যে তৎসম্পর্কে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হলে এবং ওই ভবন বা যন্ত্রপাতি ব্যবহার করার কারণে কোনো শ্রমিক যদি জখম প্রাপ্ত হন তাহলে মালিক, অনুরূপ জখম প্রাপ্ত শ্রমিককে দ্বাদশ অধ্যায়ের অধীন উক্ত রূপ জখমের জন্য প্রদেয় ক্ষতিপূরণের দ্বিগুণ হারে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য থাকবেন।
