রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ঘোষণা দিয়ে জামায়াত পুলিশকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল। পুলিশ অনুমতি দেয়নি। কিন্তু জামায়াত তাদের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। তাদের মহাসমাবেশ করতে দেবে না বলে পুলিশ সাফ জানিয়ে দেয়।
কিন্তু গতকাল শনিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে হঠাৎ করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা মতিঝিল শাপলা চত্বরে জড়ো হওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর পুলিশের ধাওয়া খেয়ে তারা আরামবাগে জড়ো হন। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মতিঝিল কালভার্ট রোড দিয়ে জামায়াতের আরও নেতাকর্মী ব্যারিকেড সরিয়ে পুলিশের সামনে দিয়ে আরামবাগে যায়। পুলিশ বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও পরে সরে আসে। দুপুর ১টার দিকে রাস্তায় নামাজ আদায় করে জামায়াতের নেতাকর্মীরা দেড়টার দিকে মহাসমাবেশের কার্যক্রম শুরু করেন। বিকেল সোয়া ৩টার দিকে তারা সমাবেশ শেষ করে মিছিল করতে করতে শাহজাহানপুর হয়ে চলে যান।
আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমতি না পাওয়া ও শান্তিপূর্ণভাবে কর্মসূচি পালন করে দলটির সমাবেশস্থল ত্যাগ করা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা।
রাজনৈতিক-সংশ্লিষ্টদের ধারণা ছিল, অনুমতি না পাওয়ায় জামায়াতে ইসলামী হয়তো রাজধানীতে কোনো ধরনের সমাবেশ করতে পারবে না। দলটি জোর করে মহাসমাবেশের চেষ্টা করলে পুলিশের বাধার সম্মুখীন হবে এবং পরিস্থিতি হয়তো ভিন্নদিকে মোড় নেবে। কিন্তু গতকাল সেসবের কিছুই হয়নি। অন্যদিকে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো অনুমতি নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করেছে। ওই সমাবেশ প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে সহিংসতা হয়।
সূত্রগুলো বলছে, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অনুমতি না থাকার পরও যথাসময়ে শুরুর পর বিকেল সোয়া ৩টার মধ্যে মহাসমাবেশ শেষ করে জামায়াতে ইসলামী। পরে কেন্দ্রীয় জামায়াতে ইসলামীর নির্দেশে আরামবাগ থেকে বেরিয়ে কমলাপুর হয়ে শাহজাহানপুরের দিকে মিছিল নিয়ে বের হয়ে যান দলটির নেতাকর্মীরা। এদিন অনেকটা তড়িঘড়ি করেই মহাসমাবেশ শেষ করে জামায়াত। সমাবেশে কেন্দ্রীয় নেতাদের বাইরে অন্য কাউকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়নি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে রাজনীতির আড়ালে যে হিসাবনিকাশ হচ্ছে, জামায়াতের এই মহাসমাবেশ হয়তো তারই অংশ। সেটি না হলে কেন পুলিশ জামায়াতকে কোনোভাবেই সমাবেশ করতে দেবে না বলে জানানোর পর তারা কোনো ধরনের প্রতিরোধ ছাড়া মহাসমাবেশ করতে পারল।
তাদের পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ বলছে, যে দলটিকে এত বছর সভা-সমাবেশের অনুমতিই দেওয়া হয়নি, নিজেদের কার্যালয়ে সভা করতে গেলেও গ্রেপ্তার-হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে, তারা কীভাবে রাজধানীতে সমাবেশ করতে পারল।
জামায়াতের মহাসমাবেশ ও দলটির সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এত দিন তারা (আওয়ামী লীগ) কেন অনুমতি দেয়নি? এখন কেন দিল তা পরিষ্কার নয়। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অনেক কিছুই ধীরে ধীরে পরিষ্কার হবে।’
গণতন্ত্র মঞ্চের সমন্বয়ক ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটা জায়গায় আসতে হয়তো সরকার জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। এমন অনুমান অযৌক্তিক নয়।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জামায়াতের এক নেতা জানান, তারা সরকারবিরোধী আন্দোলনে রয়েছেন। আর সভা-সমাবেশ তাদের রাজনৈতিক অধিকার। সরকারের হয়তো বোধদয় হয়েছে, তাই তাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও দেবে। এর বাইরে অন্য কোনো কারণ আছে বলে তারা মনে করেন না।
সূত্রগুলো বলছে, দুদিন ধরে ডিএমপির একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেছেন, জামায়াতকে ঢাকায় সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। শুক্রবার পুলিশের অনুমতি না পাওয়ার পরও ভার্চুয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমির মুজিবুর রহমান ঘোষিত কর্মসূচি সফল করতে দেশবাসীকে আহ্বান জানান।
জামায়াতের মহাসমাবেশের আগেও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অতিরিক্ত কমিশনার মো. আসাদুজ্জামান বলেন, জামায়াতকে সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি, তারপরও সমাবেশের চেষ্টা করলে বেআইনি সমাবেশ করার অপরাধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জানা গেছে, গতকাল শনিবার রাতে দলটির একজন দায়িত্বশীল নেতা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একজন মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেন। তারা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির ব্যাপারে মন্ত্রীকে আশ্বস্ত করলে মন্ত্রী ইতিবাচক মনোভাব দেখান। ফলে তাদের মৌখিকভাবে অনুমতি দেওয়া হয়।
সর্বশেষ গত ১০ জুন পুলিশের মৌখিক অনুমতি পেয়ে রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সমাবেশ করেছিল জামায়াত। এরপর তাদের আর কোথাও সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হয়নি। তবে পুলিশের অনুমতি ছাড়া সম্প্রতি জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ মিছিল করেছে তারা।
বেলা সাড়ে ১১টার দিকে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতা দাবি করা এস এম মোবারক হোসেন কয়েকজন সাংবাদিককে জানান, তাদের প্রতিনিধিদল পুলিশের সঙ্গে বৈঠক করেছে। পুলিশ তাদের জায়গা পরিবর্তন ও বিশৃঙ্খলা না করতে বলেছে। তারা কোনো বিশৃঙ্খলা করছেন না বলে জানান। তারা আশা করছেন তারা সমাবেশ করতে পারবেন।
দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আরামবাগে জড়ো হওয়া নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য মতিঝিল কালভার্ট রোড হয়ে আসা জামায়াতের নেতাকর্মীরা ব্যারিকেড সরিয়ে দৌড় দেন। সে সময় মো. নওয়াব আলী শেখ (৬০) নামে একজন গুলিবিদ্ধ হন। পরে জানা গেছে তিনি জামায়াতের কর্মী।
ওই এলাকায় সরেজমিনে সকাল থেকে সমাবেশ উপলক্ষে জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের ছোট ছোট ভাগে জড়ো হয়ে টিকাটুলি, কমলাপুর, মতিঝিলের বিভিন্ন গলি, ফকিরাপুলের বিভিন্ন গলিসহ টিকাটুলি মোড় পর্যন্ত ঘোরাঘুরি করতে দেখা গেছে। ওইসময় গলিসহ পুরো এলাকায় মোতায়েন ছিল আনসার, র্যাব ও পুলিশ সদস্যও।
এদিকে বিএনপির হরতাল সমর্থন করে গতকাল জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার বিভাগ থেকে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে দলের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার এবং জামায়াত ঘোষিত ২৮ অক্টোবরের মহাসমাবেশে পুলিশের বাধাদান ও মহাসমাবেশে যোগ দিতে আসা নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হয়।
