আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা না দিলেও গাজায় স্থল অভিযান শুরু করে দিয়েছে ইসরায়েল। গত শুক্রবার রাতে অভিযানের পরিসর বাড়ানোর ঘোষণা দেওয়ার পর বিমান হামলা বাড়িয়ে দেয় ভয়ংকর রূপে। এর মধ্যে স্থলপথে একে একে ঢুকতে শুরু করে অসংখ্য ট্যাংক। অবশ্য গাজার উত্তরাঞ্চলের বেশ কিছু জায়গায় ইসরায়েলি সৈন্যদের সঙ্গে তীব্র লড়াই হয়েছে বলে দাবি করেছে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী গোষ্ঠী হামাসের সামরিক শাখা আল কাসাম ব্রিগেডস। সীমান্ত পেরিয়ে ইসরায়েলি সৈন্য ও ট্যাংক গাজায় প্রবেশ করলে উত্তর গাজার বেইত হানুন এবং মধ্য গাজার বুরেজের কাছে ভয়াবহ যুদ্ধ হয় বলে হামাসের এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে উত্থাপিত একটি প্রস্তাব বিপুল ভোটে পাস হয়েছে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে। শুক্রবার সাধারণ পরিষদের বৈঠকে প্রস্তাবটি তোলে জর্ডান। জর্ডান প্রস্তাবটি পেশ করার পর সেটির ওপর ভোটগ্রহণ হয়। এই পর্ব শেষ হওয়ার পর দেখা যায়, জাতিসংঘের ১২০টি সদস্যরাষ্ট্র প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দিয়েছে, বিপক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রসহ ১৪টি সদস্যরাষ্ট্র এবং ভোটদান থেকে বিরত থেকেছে ভারতসহ ৪৫ সদস্যরাষ্ট্র। বাংলাদেশ প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে বলে জানিয়েছে সেখানে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন।
বিবিসি জানাচ্ছে, ইসরায়েলের বিমান বাহিনীর মুহুর্মুহু গোলাবর্ষণে গত ২৪ ঘণ্টায় ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় জাতিসংঘের অন্তত ১৪ জন কর্মী নিহত হয়েছেন। এই নিয়ে গত তিন সপ্তাহে গাজায় জাতিসংঘের নিহত কর্মকর্তা ও কর্মীদের মোট সংখ্যা পৌঁছাল ৫৩ জনে। গতকাল সাধারণ মানুষের হতাহত হওয়ার তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায়নি।
গত ৭ অক্টোবর গাজার উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত ইরেজ ক্রসিংয়ে অতর্কিত হামলা চালিয়ে ইসরায়েলের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে কয়েকশ প্রশিক্ষিত হামাস যোদ্ধা। ঢোকার পর সেখানে কয়েকশ বেসামরিক মানুষকে হত্যার পাশাপাশি ২২০ জন ইসরায়েলি ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জিম্মি হিসেবেও ধরে নিয়ে যায় তারা। এই হামলার জবাবে সেদিন থেকেই গাজায় বিমান অভিযান পরিচালনা শুরু করে ইসরায়েলের বিমান বাহিনী, যা এখনো চলছে। গত ২০ দিনের এই যুদ্ধে ইসরায়েলে নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জন ইসরায়েলি ও অন্যান্য দেশের নাগরিক এবং গাজায় নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়েছে ৭ হাজার।
এদিকে গতকাল হামাসের প্রতিরোধের দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি বিবিসি। তবে শুক্ররার রাতে কিছুক্ষণ পরপরই সেখানে বড় ধরনের বিস্ফোরণ হতে দেখা গেছে। এর আগে, গত শুক্রবার সন্ধ্যায় গাজায় হামলা জোরদার করার ঘোষণা দিয়েছিল ইসরায়েল। তখন নিরাপদে থাকার জন্য গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের বলা হয়েছিল দক্ষিণে সরে যেতে। তবে গত রাতের হামলার মাধ্যমে গাজায় স্থল অভিযান শুরু হয়েছে কি-না, সে বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি তেল আবিব।
ইসরায়েল জানিয়েছে, গাজায় তাদের স্থল অভিযান আরও বিস্তৃত করা হয়েছে। এ বিষয়ে ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র ইলন লেভির কাছে জানতে চাইলে তিনি বিবিসিকে বলেন, গাজা উপত্যকায় স্থল অভিযান আরও বড় করেছে ইসরায়েল। এর বাইরে, এই অভিযানের বিষয়ে আমি আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
এদিকে, গাজা উপত্যকায় কিছু সৈন্য ঢুকেছে বলে মার্কিন গণমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসকে নিশ্চিত করেছেন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র। তবে তিনিও স্থল অভিযান শুরুর বিষয়টি নিশ্চিত করেননি। মেজর নির দিনার বলেন, আমাদের সৈন্য এবং ট্যাংক গাজা উপত্যকার ভেতরে অবস্থান করছে এবং তারা যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, গতকালও আমাদের সৈন্য ও ট্যাংকগুলো গাজার ভেতরেই ছিল। এদিকে ইসরায়েল জানিয়েছে, ৭ অক্টোবর প্যারাগ্লাইডারে করে হামাসের যে সশস্ত্র যোদ্ধারা ইসরায়েলে প্রবেশ করেছিল, তাদের প্রধান আসেম আবু রাকাবাকে তারা হত্যা করেছে।
গাজায় নতুন করে হামলা চালানোর পর থেকে হামাসের হাতে জিম্মি ব্যক্তিদের মুক্তির বিষয়ে দু’পক্ষের মধ্যে আলোচনা বন্ধ হয়ে গেছে। বিবিসির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জেরেমি বোয়েন বলেছেন, গতকাল তিনি প্রায় সারা দিন ধরে শুনছিলেন যে, জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে দুপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছিল এবং বেশ অগ্রগতিও হয়েছিল। এছাড়া মানবিক দিক বিবেচনায় আগামী কয়েকদিনের জন্য একটি যুদ্ধবিরতির কথাও শোনা যাচ্ছিল। কিন্তু গতকাল সন্ধ্যায় ইসরায়েল নতুন করে হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে দুপক্ষের আলোচনা একেবারেই থমকে গেছে। ইসরায়েলি ট্যাংক ও সৈন্যরা ইতিমধ্যেই গাজায় ঢুকে গেছে বলে জানা যাচ্ছে। কাজেই এই অবস্থা চলতে থাকলে দুপক্ষ আবারও জিম্মিদের মুক্তির বিষয়ে কথা বলতে আলোচনায় বসার খুব আগ্রহ দেখাবে বলে মনে হচ্ছে না।
গাজায় এখন টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছেই বলা যায়। এই ব্ল্যাকআউটের কারণে গাজার গণনৃশংসতা ঢাকা পড়তে পারে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বেসরকারি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের জ্যেষ্ঠ গবেষক ডেবোরা ব্রাউন। এর আগে, দ্য কমিটি টু প্রোটেক্ট জার্নালিস্টম (সিপিজে) গাজার তথ্য যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছে। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলে যে, এটি করা না হলে ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধের সবটুকু চিত্র তুলে ধরা সম্ভব হবে না।
এর ফলে এই যুদ্ধকে ঘিরে নানান প্রোপাগান্ডা ও গুজব ছড়ানোর ঝুঁকি তৈরি হবে বলেও আশঙ্কা করছে সংগঠনটি। গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরুর পর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ২৯ জন সাংবাদিক প্রাণ হারিয়েছে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে সিপিজে।
