ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগও চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পুলিশের গ্রেপ্তার অভিযানে উদ্বিগ্ন। গ্রেপ্তার অভিযানে লাগাম টানতে বলেছে দলটি। এ বিষয়ে পুলিশের অতি তৎপরতায় দেশি-বিদেশি চাপে, বিশেষ করে বিদেশিদের চাপে পড়তে পারে সরকার এমন আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে আওয়ামী লীগে।
ক্ষমতাসীন দলের নীতিনির্ধারকরা বলেন, পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার অভিযান চালাবে; সেটা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত কাজ। কিন্তু আমরা চাই, সুনির্দিষ্ট অপরাধে দায়ী ব্যক্তিকেই যেন ধরা হয়। মূল অপরাধীদের না ধরে তাদের পরিবারের কোনো সদস্যকে বা অন্য কাউকে গ্রেপ্তার করা ঠিক হবে না। এতে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে বা হচ্ছে বলে মনে করে সরকারি দল। গ্রেপ্তার অভিযানে সাধারণ মানুষ যেন ভীত না হয়, সেদিকেও পুলিশকে খেয়াল রাখতে হবে। বিএনপি অপরাধ করেও পুলিশি তৎপরতার কারণে মানুষের সহানুভূতি পাক, তা সরকারের কাম্য নয়।
গতকাল সোমবার সকালে ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে কয়েকজন সাবেক আমলার গুরুত্বপূর্র্ণ এক সভায় গ্রেপ্তারবিষয়ক আলোচনা শেষে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দলীয় এ সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে অবহিত করা হয়েছে বলে দেশ রূপান্তরকে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
ওই সভায় প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব আবুল কালাম আজাদ ও কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, বাংলাদেশ কর্ম কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ সাদিক, সাবেক রাষ্ট্রদূত সোহরাব হোসেন, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার ও ঢাকা মেট্রোপলিটান পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া উপস্থিত ছিলেন। বাড়ি বাড়ি গিয়ে পুলিশের তল্লাশি শিথিল করার সুপারিশ করেছে আওয়ামী লীগের সমর্থক সাবেক সরকারি কর্মকর্তারা। সভায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার সুপারিশও করা হয়।
সূত্র জানায়, গ্রেপ্তার করে বন্দির সংখ্যা বাড়াতে চায় না সরকার। ফলে করিমকে ধরতে গিয়ে করিমকেই ধরতে হবে। রহিমকে ধরে আনা যাবে না। ইতিমধ্যে এ ধরনের একাধিক ঘটনার নজির তৈরি হয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। বৈঠকে আরও আলোচনা হয়, বন্দিসংখ্যা বাড়ানোর গ্রেপ্তার অভিযান সরকারকে বিশ্বনেতাদের কাছে সমালোচিত করবে।
গত ২৮ অক্টোবরের বিএনপির মহাসমাবেশ পণ্ড হওয়ার পর পুলিশ সদস্য হত্যা ও নাশকতায় জড়িত বিএনপির নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার অভিযান শুরু হয়। এ গ্রেপ্তার অভিযান নিয়ে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এমনটা চলতে থাকলে একপর্যায়ে সরকারের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি হবে।
সূত্র আরও জানায়, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিএনপি নেতা আলতাফ হোসেনকে গ্রেপ্তারের সমালোচনা হয়েছে। ওই সভায় বলা হয়, আলতাফ হোসেন রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় বেশ আগে থেকেই। যাচাই-বাছাই না করে কাউকে গ্রেপ্তার করা পুলিশের উচিত হবে না। পুলিশের অত্যুৎসাহী কর্মকর্তাদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকার সিদ্ধান্ত হয়। এ কার্যক্রমের ফলে বিএনপির প্রতি সহানুভূতি তৈরি হতে পারে বলে সভায় উল্লেখ করা হয়।
বৈঠকে উপস্থিত থাকা আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও দলের পরামর্শক মোহাম্মদ এ আরাফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারের ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। আমাদের অবস্থান হলো, যারা নাশকতা করছে, সরাসরি এর সঙ্গে যুক্ত (নাশকতায় অর্থ সহায়তা করছে বা নাশকতা পরিচালনা করছে) শুধু তাদেরই আইনের আওতায় আনতে হবে। একজনকে ধরতে গিয়ে আরেকজনকে ধরে আনা যাবে না। এটা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান, সরকারের অবস্থান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অবস্থান। এ সিদ্ধান্ত আমরা নিলাম যাতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে এ বার্তা পৌঁছে যায়।’
তিনি বলেন, ‘নিরপরাধী যেন হয়রানির শিকার না হয়। অপরাধীকে ধরতে গিয়ে নিরপরাধীকে ধরে নিয়ে এলে তাতে বিএনপিকেই ফেভার করা হবে। এ কাজ যে করবে সে আমাদের শুভাকাক্সক্ষী নয়। অপরাধের সঙ্গে জড়িত নয় কিন্তু হয়রানির শিকার হবে, তা আমরা টলারেট করব না।’
