বাণিজ্যিকভাবে পর্যটন শহরে ট্রেন চলাচল ডিসেম্বরে

আপডেট : ১২ নভেম্বর ২০২৩, ০২:২৫ এএম

দুপুর ১২টা ৫৮ মিনিট। কক্সবাজার সদর উপজেলার ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়া গ্রাম। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আইকনিক রেলস্টেশন উদ্বোধন করে কক্সবাজার-দোহাজারী রেলপথে ট্রেন চলাচল শুরু ঘোষণা দিলেন। প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণায় উচ্ছ্বাসের নানা রঙে বর্ণিল হয়ে ওঠে অনুষ্ঠানস্থল।

গতকাল শনিবার প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে সমুদ্রশহর কক্সবাজারের সঙ্গে চট্টগ্রামের রেলযোগাযোগের আনুষ্ঠানিক পর্ব শেষ হলো। বাণিজ্যিকভাবে ডিসেম্বর থেকে এই রেলপথে ট্রেন চলবে। এর মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে কক্সবাজারের সরাসরি রেলযোগাযোগের দুয়ার খুলল।

১০১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন প্রকল্প উদ্বোধনের ঘোষণা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কথা দিয়েছিলাম, কথা রাখলাম। রেলসংযোগে অন্তর্ভুক্ত হলো দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকতের শহর কক্সবাজার। তাতে আমিও আনন্দিত। রেলে কক্সবাজার আসার স্বপ্ন ছিল দেশের মানুষের। সেই স্বপ্ন পূরণ করা হলো।’

তিনি বলেন, পঞ্চগড় থেকে যেন কক্সবাজার রেলে আসতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হবে। তথা সারা দেশ থেকে যেন রেলে করে মানুষ কক্সবাজার আসতে পারে এবং কক্সবাজারের মানুষ যেন সারা দেশে যেতে পারে সেই ব্যবস্থা করা হবে। লাভ-লোকসান নয় মানুষের সেবাটাই বড়। তাই আলাদা রেলপথ মন্ত্রণালয় গঠন করে সারা দেশে রেলযোগাযোগ স্থাপনের কাজ শুরু করেন এবং সফলও হয়েছেন।

একই দিন মাতারবাড়ী গভীর সমদ্রবন্দরের চ্যানেল উদ্বোধনসহ মোট ১৮টি প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

এর মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার রেললাইন প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৫ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি শেখ হাসিনা আরও বলেন, দেশের সবচেয়ে আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন রেলস্টেশন হলো কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন। রেলে ওয়াই-ফাই সংযোগ দেওয়া হবে। চলাচলকারী ট্রেনগুলোর যতœ নিতে হবে সবার।

রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বিএনপি ধ্বংস বোঝে, সৃষ্টি বোঝে না। বিএনপি সরকারের উন্নয়ন চোখে দেখে না।’ ওই সময় চোখ থেকেও যারা অন্ধ তাদের ঢাকার আই হসপিটালে ১০ টাকা খরচ করে চোখ দেখানোর পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবশ্য এটা তাদের চোখের সমস্যা নয় মনের সমস্যা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে জেলার কৃষক, শ্রমিক, মৎস্যজীবী, ইমাম, লবণচাষিসহ নানা শ্রেণির ৩০০ মানুষকে নিজের সহযাত্রী করে ট্রেনে চড়ে ২২ কিলোমিটার দূরের রামু স্টেশনে যান প্রধানমন্ত্রী।

তিন দিন ধরে আইকনিক রেলস্টেশন ও রেলপথ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। সেখানে সর্বসাধারণের যাতায়াত নিষিদ্ধ করা হয়। তবু প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার জন্য আইকনিক রেলস্টেশন এবং রামু পর্যন্ত রেলপথের দুই পাশে দাঁড়িয়ে ছিল হাজারো নারী, পুরুষ ও শিশু-কিশোর। রামু জংশনে পৌঁছে সেখান থেকে সেনাবাহিনীর রামু ১০ পদাতিক ডিভিশন দপ্তরে যান শেখ হাসিনা। তারপর হেলিকপ্টারে করে জেলার সাগরদ্বীপ মাতারবাড়ী পৌঁছান। বিকেলে সেখানে দলীয় জনসভায় ভাষণ দিয়ে ঢাকায় ফেরেন।

এর আগে গতকাল সকাল ১০টার দিকে প্রধানমন্ত্রী ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে পৌঁছান। বেলা সাড়ে ১১টায় তিনি পৌঁছান আইকনিক রেলস্টেশনে। সেখানে রাখাইন শিল্পীরা নাচ-গানের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নেন। এরপর পাঁচ হাজার সুধীজনের উপস্থিতিতে শুরু হয় উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এরপর ভিডিও চিত্রের মাধ্যমে আইকনিক রেলস্টেশন ও দোহাজারী কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, ডিসেম্বর মাস থেকে বাণিজ্যিকভাবে যাত্রা শুরু করবে রেলপথটি।

কক্সবাজার আইকনিক রেলস্টেশন চত্বরে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন রেল সচিব ড. হুমায়ুন কবির, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক প্রতিনিধি রেলপথ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী, সংসদ সদস্য সাইমুম সরওয়ার কমলসহ অনেকেই।

এদিকে প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যাওয়া ট্রেনের চালকের দায়িত্বে ছিলেন লোকোমাস্টার সাজু কুমার দাশ ও সহকারী লোকোমাস্টার হিসেবে ছিলেন বেলায়েত হোসেন জাহিদ। এ ছাড়া ট্রেনে পরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন নুরুল আমিন লিটন। প্রধানমন্ত্রী যার হাত থেকে ট্রেন চালানোর পতাকা উড়িয়েছেন ও বাঁশি বাজালেন ট্রেন ছাড়ার তিনি হলেন রেলওয়ের যুগ্ম মহাপরিচালক (যান্ত্রিক) তাবাসসুম বিনতে ইসলাম। আর যার হাত থেকে প্রধানমন্ত্রী ট্রেনের টিকিট সংগ্রহ করেছেন তার নাম ফাতেমাতুজ জোহরা।

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের কলাতলী থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে ঝিলংজা ইউনিয়নের চান্দেরপাড়ায় ২৯ একর জমিতে নির্মিত হয়েছে ১ লাখ ৮৭ হাজার বর্গফুটের দৃষ্টিনন্দন ছয়তলা ভবনের এই রেলস্টেশন। যেখানে থাকছে তারকামানের হোটেল, শপিং মল, রেস্টুরেন্ট, শিশুযতœ কেন্দ্র, পোস্ট-অফিস, কনভেনশন সেন্টার, ইনফরমেশন বুথ, এটিএম বুথ, প্রার্থনার স্থান, লাগেজ রাখার লকারসহ অত্যাধুনিক সব সুবিধা।

দোহাজারী-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কাজ দুই ভাগে চারটি প্রতিষ্ঠান মিলে করেছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি), বাংলাদেশের তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি) ও বাংলাদেশের ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড।

এটি সরকারের অগ্রাধিকার (ফাস্ট ট্র্যাক) প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। এর মধ্যে আইকনিক রেলস্টেশন নির্মাণের বিপরীতে খরচ হচ্ছে ২১৫ কোটি টাকা।

মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উদ্বোধন : মাতারবাড়ীতে আওয়ামী লীগের জনসভার পর বিকেলে গভীর সমুদ্রবন্দরের চ্যানেল উদ্বোধন ও টার্মিনালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী। এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে শেখ হাসিনা বলেন, এই বন্দরের জন্য সবার আগে জাপান সরকারকে ধন্যবাদ দিতে হয়। এই এলাকা নিয়ে তারাই পরিকল্পনা করেছিল। বিগ-বির আওতায় এখানে উন্নয়ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়। বঙ্গোপসাগরের এই এলাকাটি ভৌগোলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘একসময় সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেখানে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য রয়েছে প্রচুর। তাই সোনাদিয়ার পরিবর্তে মাতারবাড়ীতে গভীর সমুদ্রবন্দর করা হচ্ছে। এই বন্দরের মাধ্যমে আমাদের পাশের দেশগুলো সুবিধা পাবে। নৌবাণিজ্যে আমরা আরও এগিয়ে যাব।’

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বন্দর কর্র্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ সোহায়েল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত