এ অবস্থায় নির্বাচনে গেলে স্যাংশন আসতে পারে

রাষ্ট্রপতিকে উদ্যোগের অনুরোধ

আপডেট : ১৫ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:৫১ এএম

সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রশ্নে সরকার সংলাপে না বসলে ভবিষ্যতে স্যাংশন আসতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জাতীয় পার্টি (জাপা)। পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, ‘নির্বাচনে যাওয়ার এখনো পরিবেশ তৈরি হয়নি। সুষ্ঠু পরিবেশ না হওয়ার আগে নির্বাচনে গেলে আমাদের ওপর স্যাংশন আসার শঙ্কা রয়েছে। সরকার সংলাপে না বসলেও বড় স্যাংশন আসতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতীয় পার্টি বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নেবে।’

গতকাল মঙ্গলবার দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় সমাপনী বক্তব্যে জিএম কাদের এ কথা বলেন। রাজধানীর কাকরাইলে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে এ সভা হয়। পরে রাত ৮টায় জিএম কাদের বঙ্গভবনে যান। রাত সোয়া ৯টার দিকে তিনি বঙ্গভবন থেকে বেরিয়ে আসেন। রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কী আলোচনা হয়েছে, সে বিষয়ে আজ সংবাদ সম্মেলনে জানানো হবে বলে জাতীয় পার্টির নেতারা জানিয়েছেন।

এর আগে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার এক নেতা জানান, সেখানে তার (জিএম কাদের) রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের সঙ্গে জাতীয় নির্বাচন, সংলাপ ও জাতীয় রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করার কথা রয়েছে।

পরে যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জাপার একটি সূত্র জানিয়েছে, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতিকে সংলাপের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন জিএম কাদের। তিনি দেশীয় ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেশের এ সংকট নিরসন করতে রাষ্ট্রপতিকে ভূমিকা নিতে অনুরোধ করেছেন। তিনি রাষ্ট্রপতিকে বলেছেন, দেশের ওপর কোনো স্যাংশন বা নিষেধাজ্ঞা এলে অর্থনীতি একদম পঙ্গু হয়ে যেতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সংকট দেখা দিতে পারে।

জাতীয় পার্টির বিশেষ দূত মাশরুর মাওলা জানান, এটা একটা সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল। এর বাইরে কিছু নয়।

দলের একটি সূত্র জানায়, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সাক্ষাতের সময় জিএম কাদের তার লেখা একটি বই রাষ্ট্রপতির হাতে তুলে দেন। তাদের মধ্যে সংলাপের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সংলাপ হলে ভালো হবে, এমন মত ব্যক্ত করেছেন জিএম কাদের।

নির্বাহী কমিটির সভায় জিএম কাদের বলেন, ‘এখন বাংলাদেশের নির্বাচনের অবস্থা এমন পর্যায়ে গেছে, বুঝেশুনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় পার্টিসহ বড় রাজনৈতিক দলকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আমরা খাদের কিনারে রয়েছি। ভবিষ্যতে কোনো ভুল সিদ্ধান্ত নিলে গভীর খাদে পড়ে যাব। আমরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারি তাহলে আমাদের পার্টি অনেক দূর যাবে। যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারি, তাহলে পার্টি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।’

গত সোমবার পাওয়া যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লুর চিঠি প্রসঙ্গে জিএম কাদের বলেন, ‘অল্প কথায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এতে বলা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সুষ্ঠু নির্বাচন আমরা চাই। সেখানে নিঃশর্ত সংলাপে বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভিসা রেসট্র্রিকশন অ্যাপ্লাই করার কথা বলা হয়েছে। তার মানে হলো, সুষ্ঠু নির্বাচন যদি না হয়, সরকার যদি সংলাপ না করে, তাহলে নির্বাচনে আমরা গেলে আমাদের ওপর স্যাংশন আসতে পারে। যদি আলাপ-আলোচনা না করে, সরকারের ওপর সুনির্দিষ্টভাবে বড় ধরনের স্যাংশন আসতে পারে। তারা দেশের ওপর স্যাংশন দেবে না, ব্যক্তিগতভাবে দেবে। সরকার চিঠিটা গুরুত্ব দিয়ে পড়লে সংলাপের ব্যবস্থা করতেও পারে।’

তিনি আরও বলেন, ‘অক্টোবর চলে গেল, নভেম্বর যাচ্ছে। আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারিনি। যেহেতু পরিস্থিতি এখনো অস্পষ্ট। আমরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। যেহেতু পরিস্থিতি এখনো অস্পষ্ট। কোথায় পা দিলে আমি পড়ে যাব অন্ধকারে, কোথায় পা দিলে শক্ত অবস্থানে যাব, এটা এখনো বোঝা সম্ভব হচ্ছে না।’

বর্তমান পরিস্থিতি নির্বাচনের জন্য সুষ্ঠু নয় জানিয়ে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, ‘ধরে নিলাম আমরা নির্বাচন করলাম। কী হতে পারে, এটার একটা ধারণা আমাকে করতে হবে। যেহেতু সবকিছু স্পষ্ট নয়। নির্বাচন আমরা বর্জন করলাম, কী হতে পারে? ইমিডিয়েট যেটি হতে পারে, আমাদের ওপর একটা চাপ সৃষ্টি হতে পারে। দল ভাঙার চেষ্টা, নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন, অনেক কিছু হতে পারে। দলকে নিশ্চিহ্ন, দুর্বল করতে বড় আঘাত আসতে পারে। সেটা আপনাদের জানিয়ে রাখলাম।’

এ সময় জিএম কাদের বলেন, ‘সারা দেশের মানুষ জাতীয় পার্টির দিকে তাকিয়ে আছে। দীর্ঘদিন ধরে দল ক্ষমতায় নেই। অত্যাচার-নিপীড়নের শিকার হয়েছি। নানাভাবে বঞ্চনার শিকার হয়েছি। নেতাকর্মীদের কোনো সুযোগ-সুবিধা তো দূরের কথা, সাধারণ সম্মানটাও দেয়নি। তবু জাপার ওপর সবার আস্থা রয়েছে।’

সভায় অংশ নেওয়া নেতাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা আমাকে দায়িত্ব দিয়েছেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নানা বিষয়ে আমাকে ভেবে দেখতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের চিঠি এসেছে আমাদের কাছে। এই চিঠির গুরুত্ব অনেক। এটা যুক্তরাষ্ট্রের অফিশিয়াল চিঠি। তারা সংলাপ চাচ্ছে। আমরাও সংলাপের কথা বলে আসছি। আমরা আর কোনো দলের মুখাপেক্ষী থাকতে চাই না। এখন দলগতভাবে আমরা অনেক শক্তিশালী। আমাদের ইউনিটি অন্য সময়ের থেকে অনেক বেশি এখন। সুতরাং ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

জিএম কাদের বলেন, ‘দল এখনো পর্যন্ত নির্বাচনে যাবে কি না বা আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বাঁধবে কি না এসব বিষয়ে অবস্থার প্রেক্ষাপটে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এর আগে দলের মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘শুধু জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে রাজনীতি নয়, ক্ষমতার রাজনীতিতে কিছু কৌশলও অবলম্বন করতে হয়। এখানে দাবার ঘুঁটি যে চতুরভাবে চালতে পারবে সে-ই সফল হবে। দলের প্রয়োজনে হয়তো আমাদের আদর্শনীতির সঙ্গে আপস করতে হতে পারে। যদি তা করতে হয়, তবে আমরা চেয়ারম্যানকে ব্লাইন্ড সাপোর্ট দেব।’

এ সময় আরও বক্তব্য রাখেন জাপার সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, কো-চেয়ারম্যান এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সালমা ইসলাম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত