তফসিল দিয়েও সংলাপের তাগিদ সিইসির

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০২৩, ০২:৪৯ এএম

যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সংলাপের চিঠি, সকালে ঢাকায় দেশটির রাষ্ট্রদূতের সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদকের সঙ্গে সাক্ষাৎ এসবের দিকে চোখ ছিল মানুষের। পাশাপাশি সরকারবিরোধীদের কর্মসূচি নিয়ে উদ্বেগও ছিল। এর মধ্যেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ৭ জানুয়ারি ভোটগ্রহণ হবে।

গতকাল বুধবার রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন ভবন থেকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে প্রধান নির্বাচন কমিশন (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল এ তফসিল ঘোষণা করেন। ভাষণে তিনি চলমান সংকট কাটাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপে বসে সমাধান খোঁজার তাগিদ দিয়েছেন।

তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া যাবে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। মনোনয়নপত্র বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। আর ১৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা যাবে। প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর। প্রার্থীরা প্রতীক বরাদ্দের দিন থেকে ৫ জানুয়ারি সকাল ৮টা পর্যন্ত ভোটের প্রচার চালানোর সুযোগ পাবেন। এবার ৩০০ আসনেই ভোট হবে ব্যালট পেপারে।

বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতারে সরাসরি সম্প্রচার করা ভাষণে সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬৬ জন রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের সঙ্গে থাকবেন ৫৯২ জন সহকারী রিটার্নিং অফিসার। তাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, এবারের নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৯৬ লাখ ৯১ হাজার ৬৩৩ জন। আর ভোটকেন্দ্র হচ্ছে ৪২ হাজার ১০৩টি। ভোটের দিন ২ লাখ ৬২ হাজার বুথে ভোটগ্রহণ করা হবে।

সংলাপের তাগিদ দিয়ে সিইসি বলেন, ‘আগ্রহী সব রাজনৈতিক দল, বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষাবিদ, নাগরিক সমাজ, সিনিয়র সাংবাদিক এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে একাধিকবার সংলাপ ও মতবিনিময় করেছি। তাদের মতামত শুনেছি। সুপারিশ জেনেছি। আমাদের অবস্থানও ব্যাখ্যা করেছি। নিবন্ধিত অনাগ্রহী সব রাজনৈতিক দলকেও একাধিকবার আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তারা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করেছে।’

এ প্রসঙ্গে কাজী হাবিবুল আউয়াল আরও বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন নির্বাচনে সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে সর্বদা স্বাগত জানাবে। পারস্পরিক প্রতিহিংসা, অবিশ্বাস ও অনাস্থা পরিহার করে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা ও সমাধান অসাধ্য নয়। পরমতসহিষ্ণুতা, পারস্পরিক আস্থা, সহনশীলতা ও সহমর্মিতা টেকসই ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের জন্য আবশ্যকীয় নিয়ামক।’

রাজনৈতিক মতভেদ থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর নির্বাচনের জন্য কাক্সিক্ষত অনুকূল রাজনৈতিক পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কিন্তু নির্বাচন প্রশ্নে, বিশেষ করে নির্বাচনের প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির প্রশ্নে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক নেতৃত্বে মতভেদ পরিলক্ষিত হচ্ছে। বহুদলীয় রাজনীতিতে মতাদর্শগত বিভাজন থাকতেই পারে। কিন্তু মতভেদ থেকে সংঘাত ও সহিংতা হলে তা থেকে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বিরূপ প্রভাব বিস্তার করতে পারে।

মতৈক্য ও সমাধান প্রয়োজন উল্লেখ করে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমি নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে সব রাজনৈতিক দলকে বিনীতভাবে অনুরোধ করব, সংঘাত ও সহিংসতা পরিহার করে সদয় হয়ে সমাধান অন্বেষণ করতে।’

অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার আসন্ন সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ অংশগ্রহণমূলক এবং শান্তিপূর্ণ করার লক্ষ্যে সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি বারবার ব্যক্ত করেছে। কমিশনও তার আয়ত্তে থাকা সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে এবং সরকার থেকে আবশ্যক সব সহায়তা গ্রহণ করে কমিশন অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ করার বিষয়ে সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে তার দায়িত্ব পালন করবে। সংসদের মেয়াদ পূর্তির আগের ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নির্বাচন কমিশন সরকারের নির্বাহী বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকরী বাহিনীর সহায়তা নিয়ে সম্পন্ন করে থাকে।

গণমাধ্যম উদ্দেশে তিনি বলেন, ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার করে দায়িত্বশীল ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়াকে যতদূর সম্ভব দৃশ্যমান করে উপস্থাপন করা গেলে সৃষ্ট স্বচ্ছতার মধ্য দিয়ে নির্বাচনের বিশুদ্ধতা ও নিরপেক্ষতা প্রতিপাদিত হতে পারে। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনে গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় কমিশনের আন্তরিক সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। পক্ষান্তরে অসত্য, মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য সম্প্রচার করে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ও নির্বাচনকে প্রভাবিত করার যেকোনো অপপ্রয়াস প্রতিহত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।

কেন্দ্রে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়ে সিইসি বলেন, নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হতে পারে শুধু সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট সবার সমন্বিত সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের মাধ্যমেই। রাজনৈতিক দলগুলো গণতান্ত্রিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে কার্যকরভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে কেন্দ্রে কেন্দ্রে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়, নির্বাচন আরও পরিশুদ্ধ ও অর্থবহ হয়। তাতে জনমতেরও শুদ্ধতর প্রতিফলন ঘটে।

জনগণকে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘জনগণকে অনুরোধ করব, সব উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অস্বস্তি পরাভূত করে নির্ভয়ে আনন্দমুখর পরিবেশে ভোটকেন্দ্রে এসে অবাধে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে। ভোট আপনার। ভোট প্রদানে কারও হস্তক্ষেপ বা প্ররোচনায় প্রভাবিত হবেন না। কোনোরকম হস্তক্ষেপ বা বাধার সম্মুখীন হলে একক বা সামষ্টিকভাবে তা প্রতিহত করবেন।’

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সফল করতে সবার সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, নিজ নিজ অবস্থান থেকে সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্বশীল আচরণ ও আবশ্যক ভূমিকা পালনের মধ্য দিয়ে আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ হবে। দেশে ও বহির্বিশ্বে প্রশংসিত ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। দেশের জনশাসনে জনগণের জনপ্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতন্ত্র সুসংহত হবে।’

সিইসি বলেন, জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচন একটি বিশাল, কঠিন ও জটিল কর্মযজ্ঞ। নির্বাচন প্রক্রিয়ার সহজীকরণ ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন। আইন ও বিধিবিধানের প্রয়োজনীয় সংস্কারের পাশাপাশি নির্বাচন প্রক্রিয়াকে সার্বিকভাবে স্বচ্ছ, সহজ, দক্ষ ও সুশৃঙ্খল করার অভিপ্রায়ে যেকোনো স্থান থেকে অনলাইন পদ্ধতিতে নমিনেশন দাখিলের এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে ভোটার সাধারণ ও সর্বসাধারণের জন্য দিনব্যাপী কেন্দ্র ও কেন্দ্রের পোলিং সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহ ও পর্যবেক্ষণের সুবিধাসংবলিত দুটি ডিজিটাল অ্যাপ কমিশন সম্প্রতি চালু করেছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৩ দফা (৩) উপদফা (ক)-এর বরাতে এবং নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেক দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি ঘোষণা করেন সিইসি। জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার আগে বিকেল ৫টায় নির্বাচন ভবনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সভাপতিত্বে ২৬তম বৈঠক করেন নির্বাচন কমিশনাররা। সেখানে নির্বাচনের তফসিল চূড়ান্ত করা হয়। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সভাপতিত্বে এ সভায় চার নির্বাচন কমিশনার আহসান হাবিব খান, রাশেদা সুলতানা, মো. আলমগীর, মো. আনিছুর রহমান এবং ইসি সচিব জাহাংগীর আলম উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সকাল ১০টায় তফসিলের বিষয়ে অবহিত করেন নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাংগীর আলম। তার বক্তব্য শেষ হতেই নির্বাচন ভবনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। দুপুর নাগাদ ইসিতে আসেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার। এ সময় তিনি প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ডিএমপি কমিশনার চলে যাওয়ার পর ১০ প্লাটুন বিজিবি মোতায়েন করা হয়। সঙ্গে র‌্যাব ও পুলিশের উপস্থিতিও ছিল। বিকেল নাগাদ পুরো এলাকা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে ফেলা হয়। সাধারণ মানুষের চলাচল সীমিত করে দেওয়া হয়। এরপরই সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশে সিইসির ভাষণের মাধ্যমে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০১৯ সালের ৩০ জানুয়ারি। সংসদের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছর (২০২৪ সাল) ২৯ জানুয়ারি। সংবিধান অনুযায়ী, এর আগে ৯০ দিনের মধ্যে ভোট হতে হবে। সেই হিসাবে গত ১ নভেম্বর নির্বাচনের ক্ষণগণনা শুরু হয়েছে। ২৯ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা আছে।

এমন এক সময় সিইসি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন, যখন সরকারের পদত্যাগ এবং নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে রয়েছে বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সংবিধান অনুযায়ী বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন করার অবস্থানে অনড়। একই দাবিতে ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। ব্যাপক সহিংসতার মধ্যে সেই নির্বাচনে জিতে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ।

এরপর ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ভোটের ফলে ভরাডুবির পর ‘আগের রাতে’ ভোট হয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলে। সংসদের মেয়াদের শেষদিকে এসে তাদের নির্বাচিত এমপিরা সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এবার ২০১৪ সালের মতো একই দাবিতে আন্দোলন করছে বিএনপি। পাল্টাপাল্টি অবস্থানের মধ্যে ফিরে এসেছে সংঘাতের পরিবেশ। যানবাহনে অগ্নিসংযোগ আর নাশকতার ঘটনায় জনমনে বাড়ছে উদ্বেগ। যুক্তরাষ্ট্র দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে নিঃশর্ত সংলাপের আহ্বান জানালেও বিবদমান পক্ষগুলো তাতে সাড়া দেয়নি।

তফসিল ঘোষণা সামনে রেখে গতকাল সকাল থেকেই শেরেবাংলা নগরে নির্বাচন ভবন ও আশপাশ এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। তফসিল ঠেকাতে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতাকর্মীরা ইসি অভিমুখে গণমিছিল শুরু করলেও, তাদের শান্তিনগরেই আটকে দেয় পুলিশ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত