দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে আওয়ামী লীগ। দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন। এ ছাড়া ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করেছে।
পাশাপাশি বিএনপি যেন নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতে না পারে, সেজন্য ক্ষমতাসীনরা নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে বলেও আওয়ামী লীগের একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।
আওয়ামী লীগের শীর্ষসারির ওই নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তারকৃত বিএনপির শীর্ষ নেতাদের জামিনে ধীরগতি অনুসরণ করা তাদের অন্যতম পরিকল্পনা। পাশাপাশি নির্বাচন পর্যন্ত বিএনপির তৃণমূলের কর্মীদের বড় অংশকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে আটকে রাখার চিন্তাও করছেন তারা। যেকোনো মূল্যে নির্বাচনী পরিবেশ স্বাভাবিক রাখা ও বিএনপির বিরুদ্ধে দমননীতি অব্যাহত রাখতে চায় আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা আরও বলেন, বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন নেতা কারাগারে রয়েছেন, তাতে দুর্বল হয়ে গেছে দলটি। এখন সারা দেশে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তার হলে নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নয়ছয় করার শক্তিও থাকবে না।
গতকাল বুধবার আওয়ামী লীগের অন্তত ১০ জন নেতার সঙ্গে এ প্রতিবেদকের আলাপ হয়। সবাই বলছেন, আগের চেয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়ে মাঠে থাকবেন আওয়ামী লীগের সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা। এ সময় কেন্দ্রীয় একাধিক নেতা নিজ নিজ এলাকার নেতাকর্মীদের মিছিল করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। একই সঙ্গে আত্মরক্ষায় নিজেদের হাতে অন্তত লাঠি রাখার নির্দেশনাও দিয়েছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।
তফসিল ঘোষণাকে কেন্দ্র করে গত দুদিন ধরে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ে মোবাইল ফোনে বার্তা পাঠিয়েছে। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এ খুদে বার্তা পাঠান বলে জানা গেছে। ওই খুদে বার্তায় জানানো হয়, তফসিল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে একে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করতে হবে। গতকাল সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণের মধ্য দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল তফসিল ঘোষণা করেন। এরপরই ঢাকাসহ সারা দেশে আনন্দ মিছিল করে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন সংগঠন।
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের ওই নেতারা বলেন, তফসিলকে স্বাগত জানানোর এ খুদে বার্তাই নয়, নির্বাচন প্রতিহত করার জন্য বিএনপির যেকোনো কর্মকা- মোকাবিলা করতে আরও কঠোর হতে সারা দেশে নির্দেশনা পাঠিয়েছে আওয়ামী লীগ। তারা বলেন, তফসিল-পরবর্তী বিএনপির আন্দোলন কর্মসূচিকে নির্বাচন প্রতিহত করার চক্রান্ত হিসেবে তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে আওয়ামী লীগের।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যতটা সতর্ক অবস্থান নিয়ে মাঠে থেকেছে, তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে মাঠে থাকতে বলা হয়েছে। আন্দোলন দুর্বল হলেও বিএনপির নির্বাচন প্রতিহত করার চক্রান্ত দুর্বল হয়নি।’
দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘বিএনপির প্রতি দেশের জনগণের আস্থা চলে গেছে। তারা দেশের মানুষের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ আগে করেনি, এখনো করে না। বিএনপি এখনো বিদেশি শক্তি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। ফলে তাদের চক্রান্তও অব্যাহত রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করি বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। তবে নির্বাচন প্রতিহত করার চেষ্টা করা হলে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে বিএনপিকে। আওয়ামী লীগ যেভাবে বিএনপির আন্দোলন মোকাবিলা করছে, ঠিক একইভাবে নির্বাচন প্রতিহত করার ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত প্রতিহত করার সর্বাত্মক প্রস্তুতি আওয়ামী লীগ গ্রহণ করেছে।’
১৭ নভেম্বর থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি : ১৭ নভেম্বর থেকে দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করবে আওয়ামী লীগ। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হবে।
তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, আগামী ১৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা জেলা অফিসে। সেখানেই মনোনয়ন ফরম বিক্রির কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এর পরপরই ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা যাবে।
জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে কাদের বলেন, ‘জাতীয় পার্টি নির্বাচনে আসবে কি না বা কে কার সঙ্গে যাবে, এটা তাদের সিদ্ধান্তের ব্যাপার। জাতীয় পার্টি সম্পর্কে শেষ বিষয়টা শুনতে আরও সময় লাগবে। একটু অপেক্ষা করেন, ভেতরের অনেক খবর আছে।’
বিএনপির তফসিল প্রত্যাখ্যান ও হরতাল নিয়ে একাধিক প্রশ্নের জবাবে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘হরতাল এখন ভয়তাল হয়ে গেছে। এটা মরচে ধরা হাতিয়ার। যে ট্রেন ছেড়ে গেল, সে ট্রেন থামানোর কোনো ক্ষমতা তাদের নেই। তবে সে ট্রেনে তারা না উঠলে আমরা কী করব? নির্বাচনী ট্রেন কারও জন্য অপেক্ষা করবে না। নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী হচ্ছে, আমাদের এর বিকল্প কী করার আছে?’
সংলাপ নিয়ে সিইসির প্রস্তাবের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘নির্বাচন সামনে, তফসিল ঘোষণা হয়ে গেছে। এ সময়ে কবে আপনি বাংলাদেশের শতাধিক দলের সঙ্গে সংলাপ করবেন? কবে নির্বাচন করবেন? ডোনাল্ড লু আর প্রধান নির্বাচন কমিশনারের (সিইসি) সংলাপের কথা এক নয়।’
তিনি বলেন, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে, গণতন্ত্রকামী বাঙালির জন্য আজকের (গতকাল) দিনটি অত্যন্ত আনন্দের একটি ঐতিহাসিক দিন। এর মধ্যে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দেশের গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং চলমান অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার জন্য সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বচানের কোনো বিকল্প নেই। আমরা দেশের সব ভোটারকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং উৎসবমুখর পরিবেশে এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে ভোট দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’
আ.লীগের স্বাগত মিছিল : তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে মিছিল করতে গতকাল সন্ধ্যার আগ থেকে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও থানার নেতাকর্মীরা বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে জড়ো হতে শুরু করেন। মহানগর দক্ষিণের সভাপতি আবু আহমেদ মন্নাফী ও সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরের নেতৃত্বে নেতাকর্মীরা অবস্থান নেন সড়কে।
মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগ ছাড়াও স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত হন। সেখানে তারা আওয়ামী লীগের সরকারের উন্নয়ন তুলে ধরে নানান স্লোগান দেন।
তফসিল ঘোষণা করতে বুধবার সন্ধ্যা ৭টায় জাতির উদ্দেশ ভাষণ দেওয়া শুরু করেন সিইসি। তার এ ভাষণ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে মাইকে প্রচার করা হয়। তিনি যখনই নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন, তখনই আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্বাগত জানিয়ে হর্ষধ্বনি দেন।
পরে প্রথমে ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতাদের নেতৃত্বে মিছিল শুরু হয়। এরপর স্বেচ্ছাসেবক লীগ, কৃষক লীগ, শ্রমিক লীগসহ অন্যান্য সংগঠন মিছিল করে। মিছিলগুলো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, পীর ইয়ামেনী মার্কেট, জিরো পয়েন্ট হয়ে আবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে গিয়ে শেষ হয়। এদিকে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা উত্তরা, ফার্মগেট, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মিছিল করেন। এ ছাড়া সারা দেশের জেলা-উপজেলায় তফসিলকে স্বাগত জানিয়ে আনন্দ মিছিল করে আওয়ামী লীগ। চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, বাগেরহাট, গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আনন্দ মিছিল করেছে আওয়ামী লীগ।
স্বাগত জানিয়েছে জাসদ : তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ। তাৎক্ষণিক এক প্রতিক্রিয়ায় জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু এমপি ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার এমপি এক বিবৃতিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন।
বিবৃতিতে বলা হয়, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান সমুন্নত থাকল, সংবিধানের প্রাধান্য সংরক্ষিত হলো, নির্বাচনবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ও সন্ত্রাসবাদী শক্তি পরাজিত হলো।
এ ছাড়া জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে দলের নেতাকর্মীরা একটি মিছিল বের করে গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, তোপখানা, পল্টন, বায়তুল মোকাররম এলাকা প্রদক্ষিণ করে।
