আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে রাজনীতিকদের সঙ্গে শামিল হয়েছেন জাতীয় দলের তারকা ক্রিকেটার সাকিব আল হাসান। মাগুরা-১, মাগুরা-২ ও ঢাকা-১০ আসনের মনোনয়ন ফরম কিনেছেন তিনি। তার মনোনয়ন ফরম কেনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।
সাকিব তারকা ক্রিকেটার হলেও রাজনীতিতে তার অভিজ্ঞতা নেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। মনোনয়ন ফরম কেনাকে নেতিবাচকভাবে দেখছেন তার জন্মস্থান মাগুরার সাধারণ মানুষ ও আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা বলছেন, সাকিবকে তারা কখনো স্থানীয় রাজনীতিতে দেখেননি; সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তার যোগাযোগ নেই। মাগুরা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা মনে করেন, সাকিবের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ একটি অনাকাক্সিক্ষত বিষয়।
মাগুরা সদর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান ৩৪ বছর ধরে রাজনীতি করছেন। তিনি বলেন, ‘সাকিব মনোনয়ন ফরম কিনছেন এটা আমি কিংবা উপজেলা আওয়ামী লীগের কেউ জানতেন না। গণমাধ্যম মারফত জেনেছি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে সাকিব বা তার পরিবারের কাউকে আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে দেখিনি।’
সাকিব মাগুরা-২ আসন থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এ আসনের বর্তমান এমপি বীরেন শিকদার এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যদি কেউ দাবি করেন তিনি আওয়ামী লীগ করেন তাহলে তিনি আওয়ামী লীগার হয়ে যান না। দেশের যে কেউ মনোনয়ন ফরম কিনতে পারেন কিন্তু সিদ্ধান্ত নেবেন আমাদের নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। তিনি খোঁজখবর নিয়েই মনোনয়ন দেবেন।’
শুধু সাকিব আল হাসান নন, প্রতিবার জাতীয় নির্বাচন এলেই নির্বাচনী দৌড়ে শামিল হন রাজনীতির বাইরের নানা পেশার মানুষ। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ব্যতিক্রম ঘটেনি। এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছেন খেলোয়াড়, সিনেমার তারকা, সংগীতশিল্পী, সাবেক আমলা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি), বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রাষ্ট্রপতির পুত্র, সংবাদপত্রের সম্পাদক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এবং ফেসবুক সেলিব্রিটিরা।
রাজনীতির বাইরের লোকজনের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় সংসদে কথা বলেছেন বর্ষীয়ান আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদসহ সংসদ সদস্যরা। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও এর সমালোচনা করেছেন এবং করছেন। তারা মনে করেন, রাজনীতিতে তাদেরই আসা উচিত যারা এলাকার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন, তাদের সমস্যা-সম্ভাবনার কথা জানেন।
এবার সুনামগঞ্জ-৪ আসন থেকে নৌকা প্রতীকের মনোনয়নপত্র কিনেছেন সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাদিক। তিনি শিক্ষাসচিব ও নির্বাচন কমিশনের সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কবিতায় অবদানের জন্য ২০১৭ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কারও তিনি পেয়েছেন। এত কিছু পাওয়ার পরও কেন নির্বাচন করতে চান এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সরকারি চাকরি করেছি, লেখালেখিও করেছি। আমি কৃষকের সন্তান। এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার গভীর যোগাযোগ, তাদের চাওয়াতেই আমি মনোনয়ন ফরম কিনেছি।’
তিনি বলেন, ‘এটা সত্য, আমার রাজনীতিতে সরাসরি অভিজ্ঞতা তেমন নেই। অবসরের পর আমি নিয়মিত এলাকায় যাতায়াত করছি। আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বিভিন্নভাবে অবধান রাখছি। আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র রাজনীতির বাইরে থাকা মানুষরা আগ্রহী হয়ে কিনছেন, কারণ তারা মনে করছেন বিএনপি নির্বাচনে আসছে না বলে সংসদ সদস্য হওয়া প্রায় নিশ্চিত। বেশি খরচও করতে হবে না। রাজনীতির বাইরের লোকজন ’৯১ থেকে শুরু করে ২০০৮ পর্যন্ত প্রার্থী হয়েছেন। ২০১৪-এর একতরফা নির্বাচনের পর এ প্রবণতা বাড়ছে। এখন চাকরিতে থাকার সময়েই নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। ফলে তারা দায়িত্ব পালনে দলনিরপেক্ষ হতে পারেন না।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য ও রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন বলেন, ‘এবার ৪০-৫০ জন নতুন মুখ আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে পারেন। তাদের বিচার-বিবেচনা করে দলনেত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন দেবেন। রাজনীতির বাইরের লোকজনের চেয়ে রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ড আছে এমন প্রার্থীরা মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন।’
খুলনা-১ আসনে মনোনয়ন পেতে ফরম জমা দিয়েছেন সাবেক সচিব ড. প্রশান্ত কুমার রায়। তার নির্বাচনী এলাকা বটিয়াঘাটা ও দাকোপ। দাকোপের বাসিন্দা জহির উদ্দিন বলেন, ‘প্রশান্ত কুমারকে কখনো দেখিনি, তবে নাম শুনেছি। এলাকার মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই। আমরা চাই এমন কেউ এমপি হোক যে মানুষকে চিনে, মানুষের সমস্যার কথা জানে।’
এবার বিনোদন জগতের একঝাঁক তারকা আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছেন। চিত্রনায়ক মাসুম পারভেজ রুবেল বরিশাল-৩, চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২, চিত্রনায়ক শাকিল খান বাগেরহাট-৩ ও অভিনেতা সিদ্দিকুর রহমান সিদ্দিক টাঙ্গাইল-১ আসনে মনোনয়ন চাইছেন।
চাঁপাইনবাগঞ্জ-২ ভোলাহাট, গোমাস্তাপুর ও নাচোল উপজেলা নিয়ে গঠিত। স্থানীয় সাংবাদিক অলক কুমার বলেন, ‘মাহিয়া মাহির বাড়ি যে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ কথা প্রথম শুনি গত উপনির্বাচনে, আগে জানতাম না। যাকে এলাকার মানুষ চিনে না, এলাকা নিয়ে যার জানাশোনা নেই তিনি যদি জনপ্রতিনিধি হন তাহলে নির্বাচনের পর তাকে এলাকায় পাওয়া যাবে কি না সন্দেহ। একই অবস্থা নায়ক রুবেলের ক্ষেত্রেও। তার আসন বরিশাল-৩ মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। স্থানীয় বাসিন্দা ফরিদ আহমেদ জানান, ‘রুবেল মাঝেমধ্যে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানাদিতে এলাকায় আসতেন। কখনো রাজনৈতিক বা সামাজিক অনুষ্ঠানে এলাকায় যেতেন না। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার যোগাযোগ নেই।’
চিত্রনায়ক রুবেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অভিনয় জগতের অন্যদের মতো আমি নতুন করে রাজনীতিতে আসিনি। আমার শেকড়ই আওয়ামী লীগের। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগে জড়িত ছিলাম, তখন থেকেই জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে আসছি। আমার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত।’
রাজনীতি দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে আছেন ব্যবসায়ীরাও। প্রতিটি সংসদেই তাদের উপস্থিতি দেখা যায়। এবার ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়নাকাক্সক্ষী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন। এফবিসিসিআইয়ের সাবেক এই সভাপতি এবার কুমিল্লা-৩ আসনে নির্বাচন করতে চান। তারও এলাকায় তেমন সংযোগ নেই। তবে কুমিল্লা-৩ থেকেই আগেরবার নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। গত পাঁচ বছরে ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন তিনি।
তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে। রাজনীতির বাইরে থেকে নির্বাচন করে সফল হয়েছেন এমন মানুষের সংখ্যাও কম নয়। সাবেক আমলা এম কে আনোয়ার বিএনপিতে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্য হয়ে বড় নেতায় পরিণত হন। আমলা থেকে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী হয়েছেন এম এ মান্নান। এলাকার মানুষের জন্য নানামুখী উন্নয়ন করে তিনি প্রশংসিত। ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা নড়াইল-২ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছেন এবং এলাকার মানুষের সঙ্গে জোরালো সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে বেশ কিছু যোগ্যতা লাগে। মানুষের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে সক্রিয় থাকা এবং পারিবারিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ও আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে যুক্ত থাকার ইতিহাস থাকতে হবে। বিভিন্ন অঙ্গনের খ্যাতিমানরা মনোনয়ন ফরম কিনতেই পারেন, কিন্তু তাদের মনোনয়ন পাওয়া অনিশ্চিত। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকবেন সংশ্লিষ্ট এলাকার পরীক্ষিত নেতাকর্মীরাই।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক বশির আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনীতির বাইরে থাকলে রাজনীতিতে আসা যাবে না, কিংবা মনোনয়নপত্র কেনা যাবে না বিষয়টি এমন নয়। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও অনেকেই রাজনীতির বাইরে থেকে এসে নির্বাচিত হন। আমাদের দেশেও বড় দুই দলে আমলা, সরকারি চাকরিজীবী ও তারকারা এসে সংসদ সদস্য হয়েছেন।’
তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি এ প্রবণতা বাড়ছে। অনেকেই চাকরিরত অবস্থায় দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। এতে তিনি দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ হতে পারেন না। তারা এমপি হতে চান কারণ অনেক কিছু পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে।’
