চেনা বামুনের পৈতা লাগে না কথাটা তার সঙ্গে ভীষণভাবে যায়। সর্বসাম্প্রতিক চলচ্চিত্র-সংগীতের এক অপরিহার্য নাম শওকত আলী ইমন। তিন দশকের ক্যারিয়ারে তার অনেক অর্জন। সম্প্রতি আবারও পেলেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। নানা বিষয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। সেই আলাপচারিতার চুম্বক অংশ শোনাবেন ইমরোজ বিন মশিউর।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সংগীতকে পেশা হিসেবে না নিতে পারার পেছনে অন্তত তিনটি যুক্তি বলুন না নিতে পারার পেছনে অক্ষমতা শিল্পীর, শিল্পের নয়। এখন তো আগের অবস্থা নেই। এ পেশায় কোয়ালিটি বাড়েনি, কোয়ান্টিটি বেড়েছে। আমাদের সময় এ কাজ করতেন ১০ জন, এখন করছেন পাঁচশজন। মান বা লগ্নি কোনোটাই বাড়েনি। তাই এখন আর এই শিল্পকে পেশা হিসেবে নিয়ে টিকে থাকা এক রকম কঠিনই।
জাতীয় পুরস্কার না পেলে কী কোনো আক্ষেপ থাকত?
আক্ষেপ তো একটু থাকতই। তবে আরও বড় আক্ষেপের জায়গা অন্যটি। আমি যে গানগুলোর জন্য পুরস্কার পেয়েছি তার চেয়েও অনেক ভালো গান আমি করেছি। অথচ সেগুলোর জন্য সম্মাননা জোটেনি। বড় আক্ষেপ আসলে এটা। আর একটা কথা পুরস্কার মানুষের দায়িত্ব বাড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে এটাও ঠিক, আমরা দায়িত্ব নিয়ে কাজ করি বলেই পুরস্কার পাই।
আপনার সংগীতজীবন কী পূর্ণ?
কোনো শিল্পস্রষ্টার আত্মতৃপ্তি শোভা পায় না। স্যাটিসফেকশন মানেই শিল্পীর জীবন শেষ। আমি আজীবন এক অতৃপ্ত সুরস্রষ্টা হিসেবে বাঁচতে চাই।
মিউজিশিয়ান না হলে কী হতেন?
পাইলট হতাম (মা চেয়েছিলেন, তাই)।
বড় সংগীত পরিচালক হওয়ার জন্য সংগীত পরিবার থেকে উঠে আসা কী খুব জরুরি?
শিল্প সৃষ্টিক্ষমতার অর্ধেকটা ঈশ্বরপ্রদত্ত। বাকি যা আছে তার কিছুটা পরিবারের, কিছুটা গুরুমুখী। সংগীতশিল্পী আর পরিচালকের মাঝে এই বিষয়ে বেশ পার্থক্য আছে। সংগীত পরিচালনার ক্ষেত্রে অ্যাসিস্ট্যান্সি খুব গুরুত্বপূর্ণ। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দিয়ে কিন্তু মিউজিক ডিরেক্টর হওয়া যায় না।
আপনি দারুণ কি-বোর্ড ও পিয়ানো বাজান। যদি শুধু যন্ত্রী হতেন, বাংলাদেশে সারভাইভ করতে পারতেন কী?
আমি আমার ক্যারিয়ারের প্রথম ১৫ বছর যন্ত্রী ছিলাম। আমি এ দেশের প্রায় সব বড় আর্টিস্টের সঙ্গেই বাজিয়েছি। বাজাতে বাজাতেই বুঝেছি এ দেশে যন্ত্রী হিসেবে টিকে থাকা যাবে না।
অবসরে কী করতে ভালো লাগে?
প্রকৃতি আমার ভীষণ পছন্দ। আমি অবসরে ঘুরতে দারুণ ভালোবাসি।
দুপার নিয়ে কাজ করেন এমন অনেক সংগীত পরিচালক অভিযোগ করেন এপারের চেয়ে ওপারের শিল্পীরা নানা বিষয়ে অনেক বেশি ডেডিকেটেড-প্রফেশনাল। আপনি তো দুপারেরই বহু লিজেন্ডারি শিল্পীকে নিয়ে কাজ করেছেন; এটা কী শুধু অভিযোগ না কি এর ভিত্তি আছে?
এটা অভিযোগ নয়, সত্য। ওদের ডেডিকেশন অনেক বেশি। সেই সঙ্গে ওদের চর্চা বেশি। আরও কিছু বিষয় আছে। সব মিলিয়ে ওদের ডেডিকেশন ও প্রফেশনালিজমের লেভেলটা আমাদের চেয়ে বেশি। এটা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।
আমাদের চলচ্চিত্রে আবহ সংগীতের মান নিম্নমুখী। এদিকে দৃষ্টি না দেওয়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
যতœ আর ভালোবাসার অভাব। সেই সঙ্গে আরেকটি বিষয় হলো আগে একটি সিনেমায় একজন সংগীত পরিচালক থাকতেন। তিনিই সব করতেন। এখন একেকটা গানে একেক জন কাজ করেন। এখানে সমন্বয়ের অভাব ঘটে। এটাই অন্যতম কারণ বলে মনে করি।
কতটা ডেভেলপ করল সিনেমা মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি?
আমরা টেকনিক্যালি অনেক উন্নতি করেছি। আরও করব। তবে একটা কথা প্রযুক্তি আমাদের বেগ দিয়েছে কাজের কিন্তু আবেগটা কেড়ে নিয়েছে। প্রচুর কাজ হচ্ছে কিন্তু ইমোশনটা আর আগের মতো নেই।
মিউজিশিয়ানরা অনেক শৌখিন হন, আপনার শখ কী?
এখন আর কোনো শখ নেই। এখন আছে প্রয়োজন। প্রয়োজন বলেন বা শখ বিকেলে সাইকেল চালাই। এটাকেই শখ বলতে পারেন। এটা আমি উপভোগ করি।
কোন প্ল্যাটফরমে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
সিনেমা সিনেমা এবং সিনেমা। এটাই আমার আলটিমেট গোল। আমি আর কোনো কিছুই হতে চাইনি সিনেমার সংগীত পরিচালক ছাড়া।
একজন গানের মানুষ হিসেবে সাফল্যের সব সিঁড়ি ভেঙেছেন। কোনো অপ্রাপ্তি আছে কী?
অপ্রাপ্তি বলতে এটুকুই; মনে হয় সেরা কাজটি এখনো করা বাকি আছে। জানি না সেটা করতে পারব কিনা।
একজন শওকত আলী ইমন হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা অনেক বড়, দেশ রূপান্তরের পাঠকদের জন্য চার লাইনে গল্পটা বলা যাবে?
একজন শওকত আলী ইমন হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা পুরোটাই স্ট্রাগল। অনেক কষ্ট আর ত্যাগের গল্প এটা।
