উচ্চ মাধ্যমিকের ধাপ পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য একজন নবীন শিক্ষার্থী ভর্তি হন বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রবেশ করেন একটি নতুন ভুবনে। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত পরিবারের সঙ্গে বসবাস করেন। এদের অনেককেই উচ্চশিক্ষার জন্য পরিবার, বাসস্থান ত্যাগ করতে হয়। শুরু হয় এক নতুন পথে চলা। কিন্তু ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা এই শিক্ষার্থীদের অনেকেই এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারেন না। সৃষ্টি হয় নানা ধরনের সমস্যা। নতুন পরিবেশে নবীন শিক্ষার্থী কীভাবে মানিয়ে নেবেন সে বিষয়ে লিখেছেন এনাম-উজ-জামান
উচ্চশিক্ষার জন্য আমাদের দেশের সব শিক্ষার্থীকেই প্রথম যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তা হলো, পরিবার, বাসস্থান, পরিচিতজন, কিছু কিছু ক্ষেত্রে দেশও। বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন, চেনাজানা পরিবেশ ফেলে একজন নবীন শিক্ষার্থী হয়ে পড়েন একদম একা। তবে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীই দ্রুত সামলে নিতে পারেন। যারা পারেন না তারা ভুগতে থাকেন হীনম্মন্যতায়। কেউ নিজের বাচনভঙ্গি নিয়ে, কেউ নিজের ও পরিবারের আর্থিক অবস্থা নিয়ে, কেউ শহুরে সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পেরে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। সিনিয়রদের বা চটপটেদের র্যাগিং, বুলিং তো আছেই। এসব নানা উপদ্রবে কাক্সিক্ষত বিশ্ববিদ্যালয়কেও মনে হয় ঝামেলা।
উত্তরণের উপায়
এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজীর আহম্মেদ তুষারের পরামর্শ, ‘সবার আগে একজন শিক্ষার্থীর সব ধরনের হীনম্মন্যতা কাটিয়ে উঠতে হবে। নিজের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলতে হবে, নিজের সমস্যা চিহ্নিত করতে হবে। নিজের ভালো দিকগুলো খুঁজে বের করুন। মনে রাখবেন ক্যাম্পাসের এই বড় পরিধিতে একা চলা যায় না। তাই চেষ্টা করুন অন্যদের সঙ্গে মানিয়ে চলতে। এর ফলে অনেক কিছু আপনি জানতে ও বুঝতে পারবেন। নিজের ছোটখাটো দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে মনোযোগী হন।’
পড়াশোনায় মনোযোগী হোন : কঠোর শাসনের ঘেরাটোপ থেকে শিক্ষার্থীরা অপেক্ষাকৃত স্বাধীন জীবনের স্বাদ পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। তা ছাড়া আমাদের অভিভাবকরা বলে থাকেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার চাপ নেই। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে থাকাকালীন শিক্ষার্থীরা মনে করেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো পড়ালেখাই নেই। তারা আবেগের আতিশয্যে ভুলেই যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের প্রবেশ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য। কিন্তু ক্যাম্পাস জীবন শুধু স্বাধীনতাই দেয় না, দেয় কিছু দায়িত্বও। তা হলো, নিজেকে গঠনের দায়িত্ব। নিয়মিত পড়াশোনা করা ও দেশের ভবিষ্যতে নাগরিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার দায়িত্ব। এর জন্য প্রয়োজন নিয়মিত পড়াশোনা ও পাঠ্যক্রমবহির্ভূত বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা। পরিকল্পিত রুটিনবদ্ধ জীবনযাপন করতে না পারলে উচ্চশিক্ষার সোনার হরিণ মেলে না।
শিক্ষার্থীদের আরেকটা ভুল ধারণা হলো, সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা ঠিক না। যে কোনো চাকরির জন্য একটি সিজিপিএ নির্ধারিত থাকে, যার নিচে ফলাফল থাকলে আবেদন করা যায় না। তা ছাড়া ভাইভার সময়ও কিন্তু জানতে চাওয়া হয় সিজিপিএ কত। তাই সিজিপিএ কমপক্ষে ৩.৫ থাকলে ভালো হয়, ন্যূনতম ৩.০ তো থাকতেই হবে। সিজিপিএ গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটা বুঝতে বুঝতে সময় চলে যায়, অনার্স মাস্টার্স শেষ হয়ে যায়। হা-হুতাশ করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। তাই শুরু থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী হোন।
বন্ধুত্ব করতে সময় নিন : নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নিতে হলে আপনাকে প্রথমে জানতে হবে এই পরিবেশের নিয়মনীতি। তাই প্রথম কয়েক মাস বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা, শিক্ষকদের প্রত্যাশা ও সহপাঠীদের মনোভাব ইত্যাদি বোঝার চেষ্টা করুন। আপনার মতো আপনার সহপাঠীরাও নতুন। তারাও বন্ধুত্ব করতে চাইবে। কিন্তু কাউকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণের আগে সময় নিন। জানা-বোঝা পড়া হোক। কারণ বন্ধুত্ব হওয়ার পর কোনো অনাকাক্সিক্ষত কারণে তা ভেঙে পড়লে সামনের বড় সময়টি বারবার বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হবে দুজনকেই। তবে সবার সঙ্গে খোলামন নিয়েই মিশতে পারেন। কারণ এদের মধ্য থেকেই আপনি পেতে পারেন আপনার বিশ্বস্ত বন্ধু।
খাপ খাইয়ে নিতে চেষ্টা করুন : একটি নতুন পরিবেশে সবই নতুন। পোশাক, আচার-আচরণ, নীতি, প্রথা এমনকি শিষ্টাচারও। মাধ্যমিকে বা উচ্চ মাধ্যমিকে একজন শিক্ষার্থী যেখানে শিক্ষককে প্রশ্ন করতে সাহস করত না, সেখানে ক্লাসের বাইরে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর প্রাণবন্ত আড্ডা খুবই সাধারণ ও প্রত্যাশিত ঘটনা। ক্যাম্পাসে সম্পর্ক, আচরণ, পোশাক, ক্লাসের সময়, নিয়ম-কানুন, ছুটি সবই নতুন। এসব বিষয়ে খেয়াল রাখুন ও নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা করুন।
ক্যাম্পাস আপনার একে আপন করে নিন : ভর্তির পর আপনিও ক্যাম্পাস নামের পরিবারের একজন সদস্য। তাই পরিবারের একজন সদস্য হিসেবে অন্য সদস্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে মুখর না হয়ে অস্বস্তির জায়গাগুলো ভারসাম্যমূলক আচরণের অভ্যাস করুন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি অন্যদের পড়াশোনাও মনোযোগ দিয়ে দেখুন। অন্যরা ভালো কোনো পাঠবহির্ভূত কার্যক্রমে অংশ নিলে চেষ্টা করুন নিজেও অংশ নিতে। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে যে আড্ডা হয় তাতেও উপস্থিত থাকুন। কোনো সহপাঠীর অগোচরে তার দুর্বলতা বা সমালোচনা করবেন না। পারিবারিক বা অতিব্যক্তিগত বিষয় সবাইকে না বলাই ভালো। ক্যাম্পাস আপনার, একে আপন করে নিন।
নতুন অভিজ্ঞতার নামে ‘নেশা’ নয় : ক্যাম্পাসে প্রবেশ করেই অনেকে স্বাধীনতা উদযাপনের জন্য এবং নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য মাদক গ্রহণ করে থাকে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, জীবনে সবকিছুর অভিজ্ঞতা নেওয়ার দরকারও নেই। নেতিবাচক কোনো জিনিসের অভিজ্ঞতার দরকার নেই। ইতিবাচক বিষয়গুলোতে মনোযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ। পড়াশোনা ঠিক রাখতে হবে, ক্যারিয়ারের জন্য নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। নিয়মতান্ত্রিক ও রুটিনবদ্ধ জীবনযাপন করতে হবে। শর্ট টার্মে কী লাভ, লং টার্মে কী লাভ, এগুলো বিচার-বিবেচনা করে তারপর এগোতে হবে।
কাউন্সেলিং সেবা : সবসময় নিজের ভালোমন্দ বিচার না করে নতুন কিছু গ্রহণ করার মানসিকতা রাখুন। সহপাঠীদের মতামতকে গুরুত্ব দিন। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লিনিক্যাল কাউন্সিলর থাকেন। প্রয়োজন মনে করলে কাউন্সেলিং সেবাগ্রহণ করতে পারেন।
