বন্দিদের স্বজনের মানববন্ধন

‘আমরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছি, একটু চিন্তা করুন’

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০২:০৫ এএম

‘ছোটবেলা থেকেই প্রতি নির্বাচনের আগে বাবাকে ধরে নিয়ে যেতে দেখেছি। তিনি প্রচ- অসুস্থ। ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছেন। তাকে কেমো দিতে হচ্ছে। আদালতে অসুস্থতার সব প্রমাণ দেখানোর পরও তাকে জামিন দেওয়া হচ্ছে না।’ কথাগুলো বলছিলেন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলুর মেয়ে ব্যারিস্টার তাবাসসুম। ‘গায়েবি মামলায় কারাবন্দি বিরোধী দলগুলোর নেতাকর্মীদের মুক্তির দাবিতে ‘রাজবন্দিদের স্বজন’ ব্যানারে গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন কারাবন্দি নেতাদের স্বজনরা। মানববন্ধনে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

শুধু ব্যারিস্টার তাবাসসুম নন, এভাবে মানববন্ধনে কারাবন্দি নেতাদের স্বজনরা আবেগঘন বক্তব্য দেন। কেউ কেউ কান্নায় ভেঙে পড়েন। ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা আবদুল হাই ভূঁইয়া বলেন, ‘আমার তিন ছেলে ও এক ছেলের বউ পুতুল হাপসাকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গ্রেপ্তার করে জেলে নিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করছে, যারা গ্রেপ্তার হয়েছে তাদের দেখতে গেলেও আত্মীয়স্বজনকে আটকে থানায় হয়রানি করছে পুলিশ। আমি দেশ-বিদেশের বিবেকবান মানুষকে বলতে চাই; আমরা কীভাবে দিন কাটাচ্ছি, একটু চিন্তা করুন।’ মানববন্ধনে আবদুল হাই ভূঁইয়ার স্ত্রীর সঙ্গে এসেছিল তাদের দুই নাতি বর্ষা ও নূরী। এ সময় তারা তাদের মায়ের মুক্তির দাবিতে আর্তনাদ করতে থাকে।

কারাবন্দি ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতা লিয়ন হক ও রাজিব হাসানের বোন আফরোজা পারভীন জেবা বলেন, ‘আমার দুই ভাইকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ, এক ভাইকে পুলিশ এক মাস আগে গুম করে পরে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে। আমার পরিবার সদস্যদের গ্রেপ্তার-গুম-খুন করে সরকার তছনছ করে দিয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এক বছর আগে আমার ভগ্নিপতি লক্ষ্মীপুরে র‌্যাব গুলি করে মেরে ফেলেছে, তিনি বিএনপি করতেন, পরে আমরা ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিলে র‌্যাব আমাদের মৃত লাশটা দেয়। তারা প্রথমে লাশ পর্যন্ত দিতে চায়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলব; যদি আমার এবং আমার পরিবারের বাঁচার অধিকার না থাকে তাহলে আমাদের সবাইকে একসঙ্গে মেরে ফেলুন, একজন একজন করে কষ্ট দিয়ে মারবেন না। আমরা বিএনপির রাজনীতি করে অপরাধ করেছি আমরা পুরো পরিবার এখন মরতে চাই।’

ছাত্রদল নেতা আমান উল্লাহ আমানের বড় ভাইয়ের মেয়ে বলেন, ‘চাচাকে না পেয়ে পুলিশ আমার বাবাকে নিয়ে নির্যাতন করেছে। রিমান্ডে নিয়েছে। তারপর আমার চাচাকে গ্রেপ্তার করে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছে, অনেক দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাদের কী অপরাধ? তাদের অপরাধ তারা ভোটের অধিকার ফেরত চেয়েছিল। এটাই তাদের অপরাধ।’

ঢাকা মহানগর বিএনপি নেতা মুক্তিযোদ্ধা শেখ মনিরুজ্জামানের স্ত্রী বলেন, ‘রাত ২টার সময় বাসার দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পুলিশকে কত কাকুতি-মিনতি করলাম যে বয়স্ক অসুস্থ নির্দোষ লোকটাকে না নিয়ে যেতে কিন্তু পুলিশ বাসায় ভাঙচুর করে নির্দয়ভাবে তাকে তুলে নিয়ে যায়।’

যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেনের স্ত্রী বলেন, ‘আমরা কোথায় যাব! আমার স্বামীর মামলার বাদী পুলিশ, মামলা করলও পুলিশ, সাক্ষী দিলও পুলিশ এটা কেমন বিচার! আদালতে বিচারকের সামনে এমন অবিচারের প্রতিবাদ করেছি।’

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের স্ত্রী বিএনপি নেত্রী শিরিন সুলতানা বলেন, ‘আমার স্বামী অসুস্থ, তাকে কারাগারে ডিভিশন দেয়নি। তবে বলব এ সরকারের পরিণতি ভালো হবে না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহজাহানের স্ত্রী রহিমা শাহজাহান মায়া বলেন, ‘আমার স্বামীকে দুই বছরের জন্য জেল দিয়েছে, তার কোনো দোষ নেই, আমাদের পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হোক।’

২০১৩ সালে গুম হওয়া বিএনপি নেতা কাউসার হোসেনের স্ত্রী মিনা হক বলেন, ‘আমার সন্তানের বয়স ১৩ বছর, বুঝ হওয়ার পর সে এখনো বাবাকে দেখেনি। যখন সে বলে “মা আমার বাবার মুখ কি আর দেখতে পারব না” তখন আমার বুকটা ফেটে যায়।’

মহানগর বিএনপির নেতা মনিরুজ্জামানের সহধর্মিণী সায়েলা জেসমিন অভিযোগ করে বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দরজা ভেঙে আমার স্বামীকে নিয়ে গেছে। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা। এজন্যই কি দেশ স্বাধীন করেছেন। স্বামীর সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না আমাকে।’

মানববন্ধনে সভাপতির বক্তব্যে মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস অভিযোগ করে বলেন, ‘ছাত্রলীগ-যুবলীগের হাতে হাতকড়া দিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারা ধরে পুলিশের হাতে দিচ্ছে। অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে দেওয়া হচ্ছে না।’

মানববন্ধন কর্মসূচি শেষে প্রধান বিচারপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ করতে যাত্রা শুরু করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাসসহ নেতাকর্মীরা। এ সময় প্রেস ক্লাবের সামনেই তাদের আটকে দেয় পুলিশ। পরে দলের একটি প্রতিনিধিদল স্মারকলিপি পৌঁছে দেয়। মানববন্ধন ও প্রধান বিচারপতি বরাবর স্মারকলিপি পেশ কর্মসূচিতে সংহতি জানিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা।

বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের সদস্য সচিব ও সাংবাদিক নেতা কাদের গণি চৌধুরীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত সমাবেশে বক্তব্য দেন নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল হাই সিকদার, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক, গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, গণ অধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের হাসনাত কাইয়ুম, এলডিপির শাহাদাৎ হোসেন সেলিম, সাংবাদিক নেতা আবদাল আহমেদ, আমিরুল ইসলাম কাগজী, খুরশেদ আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আ ফ ম ইউসূফ হায়দার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শামসুল আলম সেলিম প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত