স্বতন্ত্রেও ভোটার আসবে না বিশ্বাস বিএনপির

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৩৬ এএম

বিএনপি না গেলেও দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে উৎসবমুখর হয়, ভোটার কেন্দ্রে আসে, সে জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থী রাখার কৌশল অবলম্বন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও দলছুটদের নিয়ে গড়া দলগুলোর প্রার্থীদের পক্ষে বিএনপির ভোটাররা মাঠে নামতে পারে, এমন ধারণা করছে আওয়ামী লীগ। ভোটাররা কেন্দ্রে আসবে, যা নির্বাচনকে উৎসবমুখর করবে।

তবে আওয়ামী লীগের এমন কৌশল কাজে আসবে না বলে মনে করছে বিএনপি। সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রাজপথে থাকা দলটির নেতারা বলছেন, স্থানীয় নির্বাচনে এই কৌশল খাটলেও জাতীয় নির্বাচনে তা হবে না; বরং এই কৌশল আওয়ামী লীগের জন্য বুমেরাং হতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপিসহ কিছু রাজনৈতিক দল না আসায় সরকারের দিক থেকে নতুন কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। নতুন এই কৌশল তারা কীভাবে কাজে লাগাবে তা সময়ই বলে দেবে।’

১৫ নভেম্বর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। তফসিল অনুযায়ী আগামী ৭ জানুয়ারি ভোট হবে। প্রার্থী হতে হলে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল করতে হবে।

এই তফসিল ঘোষণার পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করেছে বিএনপি।

দলটির একাধিক দায়িত্বশীল নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইতিপূর্বে উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থকরা নির্বাচনমুখী হলেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা ভোটকেন্দ্রে যাবে না। কারণ বর্তমানে যে আন্দোলন কর্মসূচি চলছে তা সফল করার পেছনে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বড় অবদান। তারা নিজ বাসা-বাড়িতে থাকতে পারছে না। তাই নির্বাচনের দিন প্রকাশ্যে আসার কোনো সুযোগ নেই। তা ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী রাখায় ভোটের আগে থেকেই আওয়ামী লীগ নিজেরা নিজেরা যে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে, তাতে খোদ দলটির নেতাকর্মীরাই ভোটকেন্দ্রে যাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

জানতে চাইলে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত দলের নেতাকর্মীরা নিজ নিজ এলাকায় থাকতে পারে না। কেউ ধানক্ষেতে, কেউ পাটক্ষেতে কেউবা বনেবাদাড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে। বিএনপির মিছিল কিংবা সমাবেশে গেছে এমন কর্মী-সমর্থকরাও এলাকায় থাকতে পারছে না। এ অবস্থায় সরকার নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণ দেখাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের টানতে পারবে না।’ তিনি বলেন, গত দুটি সংসদ নির্বাচনে সাধারণ ভোটার তো দূরে থাক, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের ভোটই কেন্দ্রে আনতে পারেনি।

বর্তমান সরকারের অধীনে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কেউ কেউ ভোটকেন্দ্রে গেছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যেতে পারেন তৃণমূল নেতাকর্মী ও সমর্থকদের কেউ। কেননা বিএনপির রাজনীতি করলেও স্থানীয় রাজনীতির বাইরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ব্যবসায়িক কিংবা পারিবারিক বন্ধন থেকে থাকে। এ কারণে কেউ কেউ নির্বাচনের দিন ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিএনপির কেউ কেউ। এ অবস্থায় আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সতর্ক থাকবে দলটি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সরকার ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দুটি সংসদ নির্বাচন করেছে। একটিতে ১৫১ জন বিনা প্রতিন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। অন্যটিতে দিনের ভোট রাতে হয়েছে। সারা দেশের কোথাও কোনো কেন্দ্রে ভোটার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। যেখানে সরকারবিরোধী অধিকাংশ রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করছে না, সেখানে ভোটকেন্দ্রে কারা যাবে?’ তিনি বলেন, স্থানীয় নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। তাই সে নির্বাচনে দলের কর্মী-সমর্থকদের কেউ কেউ ভোট দিতে গেছেন। তবে সংসদ নির্বাচনে কেউ ভোট দিতে যাবেন না বলে তিনি মনে করেন।  

স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের কেউ কেউ যে ভোট দিয়েছে তা স্বীকার করে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহধর্মবিষয়ক সম্পাদক এটিএম আব্দুল বারী ড্যানী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয় না। তাই সে নির্বাচনে আত্মীয় সম্পর্কের পাশাপাশি অন্যান্য কারণে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে ভোট দিতে গিয়ে থাকতে পারে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনে সরকার পরিবর্তন হয়। কেন্দ্র থেকে সারা দেশের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যেভাবে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে তাতে ভোটকেন্দ্রে বিএনপির কারও যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।’

তিনি বলেন, তার নির্বাচনী এলাকা নেত্রকোনা-২। এই আসনে আওয়ামী লীগ মনোনয়ন দিয়েছে বর্তমান এমপি আশ্রাফ আলী খান খসরুকে। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হবেন সাবেক মন্ত্রী আরিফ খান জয় ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুর রহমান লিটন। তাদের তিনজনের পক্ষে পৃথক পৃথক মিছিল হয়েছে। এ নিয়ে এলাকায় আতঙ্ক আছে দাবি করে ড্যানী বলেন, এতে করে ভোটকেন্দ্রে সাধারণ ভোটার তো দূরে থাক খোদ আওয়ামী লীগের সাধারণ নেতাকর্মীরাই যাবেন কি না তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক করতে সরকার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু তাতে সফল হচ্ছে না। ছোটখাটো দু-চারটি দল যাদের নির্বাচনে নিতে পারছে তাদের ভোট নেই। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলনসহ যাদের ভোট আছে তাদের নিতে পারছে না। তাই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ও নির্বাচনের দিন ভোটারের উপস্থিতি বাড়াতে স্বতন্ত্র প্রার্থীর যে কৌশল সরকার নিয়েছে তা কাজে আসবে না বলে মনে করেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত