২০০০ সালে এই গল্পের শুরু। দেখতে দেখতে ২৩টি বসন্ত পার হয়েছে বাংলাদেশের টেস্ট অধ্যায়ের। ক্রিকেটের কুলীন সংস্করণটিতে খুব একটা সুবিধা কখনোই করে উঠতে পারেনি টাইগাররা। তবুও ক্ষণিক দখিনা বাতাসের মতো কালেভদ্রে এসেছে স্বস্তি, অর্থাৎ জয়। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সিলেট টেস্ট যার মধ্যে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি। ১৩৯টি টেস্টের মধ্যে যেটি ১৯তম। নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে এটি দ্বিতীয় জয়। বাংলাদেশের সবশেষ জয়ও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে। তবে সেটা তাদের ঘরের মাঠ মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে। এমন কিছু স্মরণীয় মুহূর্তগুলো ফিরে দেখা যাক।
প্রথম জয়
বাংলাদেশে প্রথম জয়ের সুবাস পায় বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে হাবিবুল বাশারের দল জিম্বাবুয়েকে হারায় ২২৬ রানের ব্যবধানে। অধিনায়ক বাশারের ৯৪ ও রাজিন সালেহর ৮৯ রানের ইনিংসের পর জাভেদ ওমরের ৫৬, মোহাম্মদ রফিকের ৬৯, খালেদ মাসুদ পাইলটের ৪৯, মাশরাফী মোর্ত্তুজার ৪৮ রানের সুবাদে প্রথম ইনিংসে ৪৮৮ রান করে বাংলাদেশ। দ্বিতীয় ইনিংসেও ফিফটি করেন বাশার। রফিক ও এনামুল হক জুনিয়রের স্পিন ঘূর্ণিতে জিম্বাবুয়ে হার মানতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় ইনিংসে ৬ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হন এনামুল।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ৪৮৮ ও ২০৪/৯ (ডি.), জিম্বাবুয়ে ৩১২ ও ১৫৪ (লক্ষ্য ৩৮১); বাংলাদেশ ২২৬ রানে জয়ী।
বিদেশের মাটিতে প্রথম জয়
২০০৯ সালে মাশরাফীর নেতৃত্বে উইন্ডিজ সফরে আসে সেই কাঙ্খিত মুহূর্ত। বিদেশের মাটিতে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের স্বাদ পায় বাংলাদেশ। সেন্ট ভিনসেন্টের আর্নস ভেল গ্রাউন্ডে উইন্ডিজকে ৯৫ রানে হারায় বাংলাদেশ। বোর্ডের সঙ্গে দ্বন্দ্ব থাকায় উইন্ডিজের দল ছিল খর্বশক্তির। তবুও টেস্ট জয় বলে কথা। দ্বিতীয় ইনিংসে ১২৮ রানের ইনিংস খেলে বাংলাদেশকে চালকের আসনে বসিয়েছিলেন তামিম ইকবাল। দুই ইনিংসে ৮ উইকেট নিয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সাকিব নিয়েছিলেন ৫টি। গ্রেনাডায় দ্বিতীয় টেস্টও বাংলাদেশ জিতে নেয় ৪ উইকেটে। ম্যাচে ৮ উইকেট ও অপরাজিত ৯৬ রানের ইনিংস খেলে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন সাকিব।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ২৩৮ ও ৩৪৫, উইন্ডিজ ৩০৭ ও ১৮১ (লক্ষ্য ২৭৭); বাংলাদেশ ৯৫ রানে জয়ী।
মিরপুরে ইংল্যান্ডবধ
২০১৬ সালের ঘটনা। বাংলাদেশ সফরে আসে ই্ংল্যান্ড। ওই সিরিজে অভিষেক হয় মেহেদী হাসান মিরাজের। সিরিজের প্রথম টেস্টে চট্টগ্রামে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েও হেরে যেতে হয় বাংলাদেশকে। তবে ফিরতি টেস্টে ঢাকার মিরপুরে ইংলিশদের কাঁদিয়ে ছাড়েন মিরাজ। দুই ইনিংসে ১২ উইকেট নিয়ে এনে দেন বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত। ইংল্যান্ডকে ১০৮ রানে হারায় বাংলাদেশ। ম্যাচ ও সিরিজসেরার খেতাব জেতেন মিরাজ। ওই ম্যাচ জিতে ইংলিশদের সঙ্গে সিরিজ ড্র করে বাংলাদেশ। সেই টেস্টে বাংলার অধিনায়ক ছিলেন মুশফিকুর রহিম।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ২২০ ও ২৯৬, অস্ট্রেলিয়া ২৪৪ ও ১৬৪ (লক্ষ্য ২৭৩); বাংলাদেশ ১০৮ রানে জয়ী।
লঙ্কায় শততম টেস্ট জয়
পরের বছর বাংলাদেশ সফরে যায় প্রতিবেশি দেশ শ্রীলঙ্কায়। সেখানে কলম্বো টেস্টটি ছিল বাংলাদেশের শততম টেস্ট। টেস্ট ইতিহাসের চতুর্থ দেশ হিসেবে মুশফিকুর রহিমের নেতৃত্বে শততম টেস্টে জয় তুলে নেয় বাংলাদেশ। প্রথম ইনিংসে ৪৯ আর দ্বিতীয় ইনিংসে ৮২ রান করে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন তামিম ইকবাল। সাকিব আল হাসানের অবদানও কম ছিল না। প্রথম ইনিংসে সেঞ্চুরির পর বল হাতে ৬ উইকেট নেন সাকিব।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: শ্রীলঙ্কা ৩৩৮ ও ৩১৯, বাংলাদেশ ৪৬৭ ও ১৯১/৬ (লক্ষ্য ১৯১); বাংলাদেশ ৪ উইকেটে জয়ী।
অজিদের লজ্জায় ঢোবানো
একই বছর আগস্টে পূর্ণশক্তির স্কোয়াড নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসে অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্টেই তাদেরকে স্বাগত জানাতে কোনো কমতি রাখেনি বাংলাদেশ। সাকিব আল হাসানের অনবদ্য অলরাউন্ড নৈপুণ্যে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২০ রানের জয় পায় বাংলাদেশ। দুই ইনিংসে ১০ উইকেট শিকারের পর ব্যাট হাতে ৮৯ রান করেন সাকিব। তামিমও করেন দুই ইনিংসে অসাধারণ দুটো ফিফটি। এ জয়টিও আসে মুশফিকের অধিনায়কত্বে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ২৬০ ও ২২১, অস্ট্রেলিয়া ২১৭ ও ২৪৪ (লক্ষ্য ২৬৫); বাংলাদেশ ২০ রানে জয়ী।
ইনিংস ব্যবধানে প্রথম জয়
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস ব্যবধানে জয়টি আসে মিরপুর, উইন্ডিজের বিপক্ষে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। দলকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তখন সাকিব আল হাসান। টস জিতে শুরুতে ব্যাট করতে নেমে ৫০৮ রান করে বাংলাদেশ। ১৩৬ রানের অসাধারণ সেঞ্চুরি করেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সাকিব ৮০, সাদমান ৭৬ ও লিটন ৫৪ রানের ইনিংস খেলেন। জবাবে প্রথম ইনিংসে ১১১ রানে গুটিয়ে ফলোঅনে পড়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ২১৩ রানে অলআউট হয় উইন্ডিজ। মিরাজ প্রথম ইনিংসে ৭টি ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৫ উইকেট শিকার করে হন ম্যাচসেরা। বাংলাদেশ জয় পায় ইনিংস ও ১৮৪ রানের ব্যবধানে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: বাংলাদেশ ৫০৮, উইন্ডিজ ১১১ ও ২১৩ (ফলোঅন); বাংলাদেশ ইনিংস ও ১৮৪ রানে জয়ী।
মাউন্ট মঙ্গানুই জয়
জিম্বাবুয়ে-উইন্ডিজ ছাড়া বড় দলের বিপক্ষে বাংলাদেশ বিদেশের মাটিতে টেস্ট জিততে পারে, সেই বিশ্বাস জন্মায় নিউজিল্যান্ডকে বে ওভালে ৮ উইকেটে হারিয়ে। অবিস্মরণীয় এ জয়ে বাংলার অধিনায়ক ছিলেন মুমিনুল হক। প্রথম ইনিংসে ৮৮ রান করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে ১৩ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জিতিয়ে ফেরেন। তবে ম্যাচের নায়ক ৪৬ রানে ৬ উইকেট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের ব্যাটিং লাইন আপ গুঁড়িয়ে দেওয়া ইবাদত। গতবছরের পহেলা জানুয়ারি শুরু হওয়া ওই টেস্ট জয় আনন্দে ভাসায় গোটা জাতিকে।
সংক্ষিপ্ত স্কোর: নিউজিল্যান্ড ৩২৮ ও ১৬৯, বাংলাদেশ ৪৫৮ ও ৪২/২ (লক্ষ্য ৪০); বাংলাদেশ ৮ উইকেটে জয়ী।
