মনোনয়ন যাচাইয়েও লাভ আ.লীগের

আপডেট : ০৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৪৬ এএম

বিএনপিবিহীন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন জমিয়ে তুলতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নির্বাচন করতে উৎসাহিত করে আওয়ামী লীগ। বিএনপি নির্বাচনে না আসায় নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনো সুযোগ তারা যাতে না পায়, সে জন্য স্বতন্ত্রে মনোযোগ দেয় ক্ষমতাসীনরা। কিন্তু শেষমেশ এত সংখ্যক স্বতন্ত্র প্রার্থী যে মনোনয়নপত্র জমা দেবেন, সেটা ভাবতে পারেনি আওয়ামী লীগ। ফলে স্বতন্ত্র উৎসাহিত করার বিষয়টি নিয়ে এখন কপালে ভাঁজ পড়েছে দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের। উল্টো এত এত স্বতন্ত্র প্রার্থী ভোটের মাঠে বেকায়দায় ফেলার আশঙ্কাও করছে আওয়ামী লীগ। তাই ভোটার টানার মতো জনপ্রিয় ও যোগ্যতাসম্পন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া বাকিরা নির্বাচনে থাকুন এখন তা চায় না ক্ষমতাসীনরা। যে কারণে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়াকে ভালো চোখেই দেখছেন তারা।

তবে নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক বাছাইয়ে স্বতন্ত্ররা বাদ যাওয়ার ঘটনা আওয়ামী লীগকে কাঠগড়ায়ও দাঁড় করাচ্ছে। বাদ পড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিভিন্ন মহল দাবি করছে, ইসির প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়ার ঘটনায় সরকারের ইশারা থাকতে পারে।   

নিজ দলের নেতারাও চাইলে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করতে পারবেন প্রকাশ্যে জানিয়ে দেওয়া আওয়ামী লীগ এখন চায় সবাই নির্বাচনে না থাকুক। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময় চলে যাওয়ায় এখন চাইলেও লাগাম টানা সম্ভব হচ্ছে না স্বতন্ত্র প্রার্থীর লম্বা লাইনে। ধারণা করা হচ্ছে, দুই হাজারের বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে নেমেছেন। কিন্তু ভোটার টানতে পারার মতো প্রার্থী কজন, সেই প্রশ্ন আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ে সবার মধ্যেই ঘুরেফিরে আসছে। ফলে প্রকৃত অর্থে ভোটার টানার মতো প্রার্থী থাকুন, বাকি প্রার্থী সরে যাকÑ এখন এমনটাই চাইছে আওয়ামী লীগ।

নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বেশিরভাগ দলকে নির্বাচনমুখী করে তুলতে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে ক্ষমতাসীনরা। এর মধ্যে ত্রিশটির মতো দল নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে কমিশনে। এখন তাদের নির্বাচনে ধরে রাখাও একধরনের জটিলতার সৃষ্টি করেছে। নৌকার প্রার্থী প্রত্যাহার করা, স্বতন্ত্র প্রার্থী তুলে নেওয়া এবং জোট ও জোটের বাইরের ছোট দল যেগুলো নির্বাচনে এসেছে, তাদের সঙ্গে আসন সমন্বয় করা বড় ধরনের জটিলতার মুখে ফেলেছে আওয়ামী লীগকে। দলটির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আজ সোমবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ১৪-দলীয় জোটের শরিক নেতাদের বৈঠক হবে। সেখানে জোটের আসন সমঝোতা নিয়ে সৃষ্ট সংকট দূর হয়ে যাবে। নানা আশায় যেসব ছোট দল নির্বাচনে এসেছে তাদের সঙ্গে আসন সমন্বয়ও শিগগিরই হয়ে যাবে। স্বতন্ত্রের সংখ্যা এতই বেড়েছে যে সমন্বয়ের বিষয়টি একটু জটিল হয়ে গেছে।      

নির্বাচনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী প্রার্থীদের যাচাই-বাছাইয়ের কাজ গত শুক্রবার থেকে শুরু করে নির্বাচন কমিশন। যাচাই-বাছাইয়ের শেষ দিন আজ সোমবার। গতকাল রবিবার যাচাই-বাছাইয়ে আওয়ামী লীগ ও স্বতন্ত্র প্রার্থী বাদ পড়েছে অনেক। অভিযোগ উঠেছে ছোট ছোট বিষয় গুরুত্ব দিয়ে সামনে এনে প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বাতিল করছে কমিশন। মনোনয়নপত্র বাতিলের ঘটনা নিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা অভিযোগ করছেন, এর সঙ্গে সরকারের যোগসূত্র রয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ দাবি করেছে, এতে দলের সম্পৃক্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কার মনোনয়নপত্র বাতিল হবে, কারটা বৈধতা পাবে, সেই এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনের।

কক্সবাজার-১ আসনে নৌকার প্রার্থী সালাহউদ্দীনের মনোনয়ন বাতিল হয়। সেখানে ভোটে অংশ নেওয়া কল্যাণ পার্টির মেজর জেনারেল ইব্রাহিমের মনোনয়নপত্র বৈধতা পেয়েছে। এতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভেতরেই সন্দেহের সৃষ্টি করেছে। জেলা আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ইব্রাহিমের দল কল্যাণ পার্টিকে নির্বাচনে রাখতে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয় প্রার্থীকে ছোট ভুল বড় করে দেখে মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। তিনি এ-ও বলেন, এটি প্রাথমিক বাছাই। শেষ পর্যন্ত নৌকার প্রার্থী বৈধতা পাবে বিশ্বাস করি। 

ঝালকাঠি-১ আসনে আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন পান বজলুর রহমান হারুন। তবে সেখানে বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমর আওয়ামী লীগে যোগদান করায় হারুনের নৌকা ওমরের হাতে চলে যায়। নৌকা উপহার দিয়েই শাহজাহান ওমরকে দলে ভেড়ানো হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ে হারুনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের দাবি, সাবেক বিএনপির নেতা ব্যারিস্টার শাহজাহান ওমরের মনোনয়নপত্র বৈধতা পাওয়ার কারণ তাকেই নৌকা দেওয়া হবেÑ এ সিদ্ধান্ত নেওয়ায়।

চট্টগ্রাম-১ আসনে নৌকার মনোনয়ন পান মাহাবুবুর রহমান রূহেল। মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন আওয়ামী লীগ নেতা গিয়াসউদ্দীন। গতকাল গিয়াসউদ্দীনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে যায়। রূহেল বৈধতা পান। এটি নিয়েও স্থানীয় আওয়ামী লীগের ভেতরে নানা গুঞ্জন চলছে। মিরসরাই থানা আওয়ামী লীগের এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, একদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে জনপ্রিয় স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রার্থিতা অবৈধ করা হচ্ছে। তাহলে কোনটা করব আমরা? এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খাচ্ছে তৃণমূল আওয়ামী লীগে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান ও দলটির সভাপতিম-লীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ-অবৈধ হওয়ার ব্যাপারটি প্রার্থীর নিজের ভুলত্রুটি ও নির্বাচন কমিশনের নিয়মের ওপর নির্ভর করে। তিনি বলেন, এখানে কারও কোনো হাত নেই। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের লক্ষ্য একটাই, অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও উৎসবমুখর পরিবেশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করা।

তৃতীয় দিনে ১২৪ আসনে ৩৪০ মনোনয়ন বাতিল : মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের তৃতীয় দিনে গতকাল দেশের বিভিন্ন জেলায় ১২৪টি আসনে অন্তত ৩৪০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিলের খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া এসব আসনে ১৮ জনের মনোনয়নপত্র স্থগিত রাখা হয়েছে। আরও বিশ্লেষণ করে আজ এসব প্রার্থীর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। গতকাল পাবনার ৩টি আসনে ৩ জনের প্রার্থিতা বাতিল ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে পাবনা-২ আসনে ক্রেডিট কার্ডসংক্রান্ত খেলাপি ঋণের কারণে বিএনএমের প্রার্থী সংগীতশিল্পী ডলি সায়ন্তনীর মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। চট্টগ্রামের ৭টি আসনে ১৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। নীলফামারীর চারটি আসনে বাতিল করা হয় ৮ জনের মনোনয়নপত্র। কুমিল্লার পাঁচ আসনে ২৬ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। মুন্সীগঞ্জে তিনটি আসনে বাতিল করা হয়েছে ৮ জনের মনোনয়নপত্র। এর মধ্যে মুন্সীগঞ্জ-১ (সিরাজদিখান-শ্রীনগর) আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য বিকল্পধারা বাংলাদেশের মুখপাত্র ও যুগ্ম মহাসচিব মাহী বি. চৌধুরীর মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। দিনাজপুরের ছয়টি আসনে ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। ময়মনসিংহের ১১ আসনে বাতিল করা হয় ২৪ জনের মনোনয়নপত্র। নোয়াখালীর ছয় আসনে ১৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে নোয়াখালী-৪ (সদর-সুবর্ণচর) আসনে ঋণখেলাপির কারণে বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান এবং নোয়াখালী-৩ (বেগমগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রাপ্ত ও বর্তমান সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কিরণের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। রাজশাহীর ছয় আসনে ২২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। এর মধ্যে রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনে চলচ্চিত্র নায়িকা শারমিন আক্তার নিপা ওরফে মাহিয়া মাহি বাদ পড়েছেন। কিশোরগঞ্জের তিন আসনে ৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ আশরাফের ভাই সৈয়দ শাফায়েতুল ইসলাম এবং কিশোরগঞ্জ-২ আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত ও আলোচিত নেতা মেজর (অব.) আখতারুজ্জামান রঞ্জন বাদ পড়েছেন। বগুড়ার চারটি আসনে ১১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। এর মধ্যে বগুড়া-৪ (কাহালু-নন্দীগ্রাম) আসনে বাদ পড়েছেন আলোচিত ইউটিউবার আশরাফুল হোসেন আলম ওরফে হিরো আলম। সিলেটের ছয় আসনে ১৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন সিলেট-২ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য গণফোরাম নেতা মোকাব্বির খান। ভোলার চারটি আসনে দুজনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। সুনামগঞ্জে চারটি আসনে ৯ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। শরীয়তপুরের দুটি আসনে ২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। জামালপুরের তিনটি আসনে বাতিল করা হয়েছে ৮ জনের মনোনয়নপত্র। লালমনিরহাটের তিনটি আসনে ৮ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। গোপালগঞ্জের একটি আসনে ১ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়। খুলনার তিনটি আসনে বাতিল করা হয়েছে ১৮ জনের মনোনয়নপত্র। ফরিদপুরের একটি আসেনে ২ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। গাজীপুরের তিন আসনে বাতিল হয়েছে ২৬ জনের মনোনয়নপত্র। যশোরের ছয় আসনে ১৮ জনের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে।  বরিশালের ছয় আসনে বাতিল হয়েছে ৬ জনের মনোনয়নপত্র। রংপুরের তিনটি আসনে ৬ জনের মনোনয়নপত্র অবৈধ ঘোষণা করা হয়। চাঁপাইনবাবগঞ্জের তিন আসনে বাতিল হয়েছে ৬ জনের মনোনয়নপত্র। কক্সবাজারের একটি আসনে ৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। সেখানে ঋণখেলাপির অভিযোগে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমেদের মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে। এই আসনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মোহাম্মদ ইবরাহিমের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা হয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পাঁচটি আসনে ১০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। বরগুনার দুটি আসনে ৫ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। বাগেরহাটের দুটি আসনে ৪ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে। ঝালকাঠির দুটি আসনে ৭ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল করা হয়েছে।

সিরাজগঞ্জের তিনটি আসনে ১০ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়েছে। পঞ্চগড়ের দুটি আসনে বাতিল হয়েছে ৫ জনের মনোনয়নপত্র। আর টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে অবৈধ ঘোষিত হয়েছে এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর মনোনয়নপত্র।  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত