রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে ২০০ একর জায়গা জুড়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) নতুন ক্যাম্পাসের কাজ চলছে। কাজের গতি ধীর হলেও প্রকল্পকে ঘিরে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের টাকা হাতানোর কাজ চলছে সুপারসনিক গতিতে। টেন্ডারের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সুযোগে প্রকল্পের জমি চাষাবাদের জন্য ইজারা দেওয়া বা পুকুরে মাছ চাষ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশে এসব করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা টাকা লোপাট করছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের তেঘোরিয়া ইউনিয়নে ২০০ একর জায়গা জুড়ে চলছে নতুন ক্যাম্পাসের কাজ। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ ও বৃত্তাকার লেক নির্মাণের কাজ শেষের পথে। তবে প্রকল্পের প্রথম ধাপের কাজ ভূমি উন্নয়ন ও মাটি ভরাট এখনো শুরু হয়নি। এই সুযোগে পতিত জমিতে দেদার চলছে চাষাবাদ। বিঘার পর বিঘা জমি দখলে নিয়ে চাষ করা হয়েছে সরিষা, ঘাস, সবজি প্রভৃতি। নতুন ক্যাম্পাসের পুকুর দখলে নিয়ে চলছে মাছ চাষ। অনুমতি না থাকলেও দখলে নিয়ে চাষাবাদে মেতেছেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা। জমি জুড়ে ফসলের শোভা দেখা গেলেও ক্যাম্পাস-প্রকল্পের অগ্রগতি সামান্যই।
জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা প্রভাব খাটিয়ে এসব জমি স্থানীয়দের কাছে ইজারা দিয়েছেন। চাষাবাদ শেষে বিঘাপ্রতি একটি নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা ও ফসলের একটি অংশ নেন তারা। ক্যাম্পাসের পুকুরেও অনুমতি ছাড়াই চলে মাছ চাষ। স্থানীয় প্রভাবশালী কয়েকজন এসব চাষাবাদ ও মাছ চাষ নিয়ন্ত্রণ করেন, বিনিময়ে টাকা ও ফসলের ভাগ নেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা।
এসব কর্মকর্তার মধ্যে রয়েছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার ও কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আবদুল কাদের ওরফে কাজী মনির, বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পত্তি কর্মকর্তা কামাল হোসেন, আনোয়ার হোসেনসহ আরও কয়েকজন কর্মকর্তা। যারা স্থানীয় প্রভাবশালীদের এসব জমি চাষাবাদের ব্যবস্থা করে দিয়ে টাকা ও ফসলের ভাগ নেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরে অবৈধভাবে মাছ চাষ করছেন সিলেক মিয়া, আবদুর রহমানসহ কয়েকজন স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি। মাছ বিক্রির টাকার একটি অংশ ও চাষের মাছের ভাগ নেন কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক কাজী মনির ও অন্য কর্তারা।
চাষাবাদকারী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতি মৌসুমে জমির পানি শুকিয়ে গেলে নির্দিষ্ট কয়েকজনকে চাষাবাদের অনুমতি দেওয়া হয়। কর্মকর্তাদের টাকা ও ফসলের ভাগ দিলেই ক্যাম্পাসের জমিতে চাষাবাদের সুযোগ মেলে। কেউ ফসলের ভাগ না দিলে লোকজন দিয়ে জমি থেকেই ফসল তুলে নিয়ে যান অভিযুক্ত কর্মকর্তারা। ঠিকমতো ভাগ না পেলে পরের মৌসুমে তাদের চাষাবাদের সুযোগ দেওয়া হয় না।
জমি দখল করে সরিষা ও সবজি চাষ করা রিনা মল্লিক নামের এক মহিলা বলেন, ‘আমি কামাল আর আনোয়ারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে সবজি আর সরিষা চাষ করেছিলাম। কাজী মনির এসে জিজ্ঞাসা করেন এসব কে করেছে? আমি করেছি জানালে তিনি ফসলের ভাগ চান। অনেক টাকা খরচ হয়েছে জানালে তিনি লোকজন নিয়ে এসে সব সবজি আর শাক কেটে নিয়ে যান। ঠিকমতো ভাগ দিলেই তারা এখানে চাষ করতে দেন।’
প্রায় ১০ বিঘা জমিতে সরিষা চাষ করা সুধীর নামের এক ব্যক্তি সার দিচ্ছিলেন সরিষাক্ষেতে।
তার কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি কাজী মনিরের কাছ থেকে জমি নিয়ে সরিষা বুনেছি। তিনি আমার কাছে সরিষার ভাগ চেয়েছেন। ঠিকমতো ভাগ না দিলে পরেরবার আরেকজনকে দিয়ে দেবেন। তিনি টাকা নিয়ে এখানে চাষ করতে দেন।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পতিত এসব জমি অবৈধভাবে ইজারা দিয়ে ও চাষাবাদ করে ফায়দা লুটতে প্রভাব খাটিয়ে নতুন ক্যাম্পাসের ভূমি উন্নয়ন ও মাটি ভরাটের কাজের টেন্ডার প্রক্রিয়া আটকে রেখেছেন এসব কর্মকর্তা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৌশল দপ্তর, পরিকল্পনা ও ওয়ার্কস দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তাও এর সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় মাটি ভরাটের কাজও হচ্ছে না। দীর্ঘদিন ইজারা দিয়ে আর্থিক সুবিধা ভোগ করাই এ কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. আবদুল কাদের ওরফে কাজী মনির ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ‘আমি কিছু বলতে চাই না। আপনারা যা তথ্য-প্রমাণ পেয়েছেন লিখে দেন। এতে আমার কিছুই হবে না। আপনারা আমার কিছু করত পারবেন না।’
অভিযুক্ত সম্পত্তি কর্মকর্তা কামাল হোসেন বলেন, ‘অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। কেউ নিজের স্বার্থে আমার নাম বলেছে। আমি এমন কোনো কাজ করিনি।’
আরেক অভিযুক্ত কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমি কিছু জানি না। আমি এমন কোনো কাজ করিনি। আমার নামে কেউ মিথ্যা কথা ছড়িয়েছে।’
নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের তদারকি কমিটির সদস্য ও শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, ‘এমন চাষা-বাসের ঘটনা আগেও ঘটেছে। এবারের বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখব।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নতুন ক্যাম্পাস প্রকল্পের পরিচালক সৈয়দ আলী আহমেদ কোনো কথা না বলে এই প্রতিবেদককে তার সঙ্গে দেখা করতে বলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মো. ওহিদুজ্জামানকে বারবার কল দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত ভিসি ড. সাদেকা হালিমের সঙ্গে এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি সবে দায়িত্ব নিয়েছি। এখনো সবকিছু বুঝে নিতে পারিনি। আগে বুঝে নিই, তারপর ব্যবস্থা নেব।’
