বাংলাদেশ শ্রম আইন ২০০৬ এর ২১টি অধ্যায়, ৩৫৪টি ধারা আছে। এর অনেকগুলো নিয়ে বিতর্ক ও সংশোধন প্রক্রিয়া চলছে। বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮, ২০১৩, ২০১৮ সালে শ্রম আইন সংশোধন করা হয়েছে। এরপর আবার সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রায় ৩৫১টি সংশোধনী প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আলাপ-আলোচনা বিতর্ক করে শ্রম আইন সংশোধন করার কাজ চলছিল। কিন্তু এ বছরের শেষের দিকে যতটা দ্রুতগতিতে শ্রম আইন সংসদে উত্থাপন করে পাস করানো হয়েছিল তাতে সন্দেহ করার যথেষ্ট কারণ থাকতে পারে যে, সংসদ সদস্যরা মনোযোগ দিয়ে আইনের সংশোধনীগুলো পড়তে পারেননি। অত্যন্ত তড়িঘড়ি করে সংসদের শেষ অধিবেশনে পাস করা হয়েছিল ‘বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) বিল-২০২৩’। গত ২৯ অক্টোবর ২০২৩ শ্রম আইন সংশোধনের বিল সংসদে উত্থাপন করা হয়। এরপর তা যাচাই-বাছাই ও পরীক্ষার জন্য তিন দিন সময় দিয়ে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। দ্রুততম সময়ে পরীক্ষা করে গত ২ নভেম্বর বিলটি পাস করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির সম্মতির জন্য ৮ নভেম্বর তার কাছে পেশ করা হয়।
কিন্তু সম্মতি দেননি রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ফলে বিলটি আইনে পরিণত হচ্ছে না। বিলে সম্মতি না দিয়ে তিনি পুনর্বিবেচনার জন্য সংসদে ফেরত পাঠিয়েছেন। বর্তমান একাদশ সংসদের অধিবেশনের আর কোনো সম্ভাবনা না থাকায় বিলটি তামাদি হয়ে যাবে বলে সংসদ সচিবালয় জানিয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কাছে কোনো বিল পেশ করার ১৫ দিনের মধ্যে তিনি তাতে সম্মতি দেবেন অথবা অর্থবিল ছাড়া অন্য কোনো বিলের ক্ষেত্রে বিলটি বা তার কোনো বিশেষ বিধান পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করে বার্তাসহ সেটি সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। সেই নিয়ম অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি গত ২০ নভেম্বর শ্রম আইন সংশোধনের বিল ফেরত পাঠান। শ্রম আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে যে দফাটি পুনর্বিবেচনা করতে বলা হয়েছে, তা বেআইনি ধর্মঘট বা লকআউটের দণ্ডসংক্রান্ত। এটি মূল আইনের ২৯৪ ধারা। এই ধারার ১ উপধারায় শ্রমিকদের বেআইনি ধর্মঘটের দণ্ডের কথা বলা আছে। আর ২ উপধারায় মালিকপক্ষের বেআইনি লকআউটের দণ্ডের বিধান আছে। উভয় ক্ষেত্রে অর্থদণ্ড একই পরিমাণ ছিল। কিন্তু বিলটি পাস করার পর দেখা যায়, শ্রমিকদের বেআইনি ধর্মঘটের জরিমানা ৫ হাজার থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে মালিকদের দণ্ড আগের মতোই রয়ে গেছে। কারণ উপধারা-২ সংশোধন হয়নি। এতে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা আছে। তাই বিলটি পুনর্বিবেচনার জন্য ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বলা হচ্ছে, শাস্তির ক্ষেত্রে বৈষম্য দূর করার জন্য বিলটি ফেরত পাঠানো হয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি তা নয় বলেই মনে করেন অনেকে। এমনকি বাণিজ্য সচিব বলেছেন, সম্প্রতি শ্রম আইনে বেশ কিছু সংশোধনী আনা হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্র্তৃপক্ষ (বেজা) আইনেও অনেক সংশোধনী আনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের কিছু চাওয়া ছিল। সেগুলো পূরণ করার জন্যই সংস্কার বা আইনের পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে। শ্রম আইনের সংশোধন চেয়ে আসছিল জাতিসংঘের শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা দেশগুলো। বিশেষ করে ট্রেড ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া সহজ করা, রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকায় শ্রম আইন কার্যকর করাসহ শ্রম অধিকার-সংক্রান্ত কয়েকটি বিষয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই তাদের পর্যবেক্ষণ ও মতামত দিয়ে যাচ্ছিল তারা।
বাংলাদেশের ৭ কোটি ৩৬ লাখ শ্রম শক্তির মধ্যে তৈরি পোশাক খাতে কর্মরত ৩৫ লাখের মতো শ্রমিক। কিন্তু এ খাত যেহেতু রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি অবদান রাখে তাই আলোচনায় বারবার তৈরি পোশাকের ইস্যুটাই চলে আসে। আর তৈরি পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে প্রধান বাজার ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো। ২০২২ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের ২৭টি দেশে ১৩৩ কোটি কেজি পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যার মূল্যমান ২ হাজার ২৮৯ কোটি ডলার। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন জোটে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ২১ শতাংশ। আর যুক্তরাষ্ট্রে ২০২২ সালে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৯৭২ কোটি ডলার। অর্থাৎ ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে রপ্তানি ৩২ বিলিয়ন ডলারের বেশি। ফলে তারা কোনো চাপ দিলে তার প্রভাব কতটুকু পড়তে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখতে হলে তাদের পরামর্শ গুরুত্বের সঙ্গেই দেখতে হবে। ফলে এখানে শ্রমিকের গণতান্ত্রিক অধিকার কিংবা মানসম্পন্ন মজুরি বড় কথা নয়, রপ্তানি এবং মুনাফা বৃদ্ধিই মূল কথা।
বাংলাদেশের শ্রমিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে আইএলও কনভেনশন ৮৭ ও ৯৮ অনুযায়ী বাধাহীনভাবে ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার এবং দরকষাকষি করে নিজেদের পাওনা ঠিক করার অধিকারের কথা বলে আসছে। গৃহকর্মী, হালকা যানবাহনের চালক, প্ল্যাটফর্ম ইকোনমি ও গিগ ইকোনমির সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকসহ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার, হয়রানিমুক্ত কর্মপরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুতে আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ, চিরস্থায়ী পঙ্গু হলে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা, সব শ্রমিকের গ্র্যাচুইটি, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা, যখন-তখন ছাঁটাই বন্ধ, মাতৃত্বকালীন ছুটির বৈষম্য বাতিল, কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি বন্ধ করাসহ গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের দাবি করে আসছে। এক দেশে এক শ্রম আইন এ কথা বলে রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) শ্রমিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করতে না দেওয়ার বিধান বাতিল দাবি করেছে। কিন্তু সেসব যথাযথ গুরুত্ব পায়নি মালিক এবং সরকারের কাছে।
রাষ্ট্রপতি বিল ফেরত পাঠিয়েছেন ২০ নভেম্বর কিন্তু ব্যাপক প্রচার পেল ডিসেম্বরের ৪ তারিখে। এ নীরবতাও প্রশ্নের উদ্রেক করে। বিষয়টা শ্রম আইন নিয়ে হলেও বাস্তবতার গভীরতা অনেক বেশি। কিন্তু শ্রমজীবীরা তো চাইবেন আমাদের শ্রম আইন গণতান্ত্রিক হোক। ১১ কোটি ৯১ লাখ ভোটারের মধ্যে ৭ কোটি ৩৬ লাখ শ্রমজীবী। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার না থাকলে দেশের গণতান্ত্রিক অধিকারও বিপন্ন হয়ে পড়তে বাধ্য। তাই শুধু টাকার অঙ্ক, রপ্তানির পরিমাণ, বিদেশি মুদ্রার সঙ্গে যেন শ্রমিকদের জীবন বাধা পড়ে না থাকে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি, বৈষম্য দূর করাতে হলে গণতান্ত্রিক শ্রম আইন, ন্যায্য মজুরি, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতেই হবে। সেটা বাইরের চাপে নয়, শ্রমিকদের প্রতি দায়িত্বের অংশ হিসেবেই করতে হবে।
লেখক : রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
