মনোনয়ন পেতে গিয়ে প্রতারণার ফাঁদে

আপডেট : ১১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:২৮ পিএম

সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র নির্বাচনসহ বিভিন্ন উপলক্ষে টাকা আত্মসাতের জন্য প্রতারণার ফাঁদ পাতে। ইতোমধ্যে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার নামে ফাঁদ পেতে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে অনেকেই। এ ধরনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বেশ কয়েকটি প্রতারক চক্রকে গ্রেপ্তার করেছে। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ে এক নেতা মনোনয়ন পাওয়ার আশায় প্রতারক চক্রের পাল্লায় পরে ৫০ লাখ টাকা খোয়ান।

এই প্রতারক চক্রগুলো নিজেদের কখনও প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়, তার কার্যালয়ের সচিব, প্রটোকল অফিসার, পিএস-২, জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে এ কাজগুলো করে থাকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষমতার আশায় গোপনে অবৈধভাবে লেনদেন করতে গিয়ে তারা (মনোনয়নপ্রত্যাশীরা) আসলে প্রলোভনে পরেন এবং প্রতারণার শিকার হন। পরে অনেকে মানসম্মানের ভয়ে আর অভিযোগ করেন না।

মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন কেন্দ্র করে অনেকের ক্ষমতা ও অর্থনৈতিক প্রবণতা বেশি পরিমাণ থাকে। যাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে বা দুর্বল চিত্তের যে মনোনয়ন পেতেও পারে আবার নাও পারে তারাই কিন্তু এমন ফাঁদে পা দেয়।

তিনি আরও বলেন, এ ধরনের কাজে গোপনীয়তার বিষয় থাকে। মনোনয়নপ্রত্যাশীরা গোপনে যাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাদের বিষয়ে খোঁজ নিতে দ্বিধাবোধ করেন। এ থেকেও প্রতারণার শিকার হয়। ক্ষমতার লোভ-লালসা থেকে এ ধরনের কাজ হয়ে থাকে। এটা এক ধরনের দুর্বৃত্তায়ন।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাইয়ে দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সচিব, পিএস টু ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ডেপুটি ডাইরেক্টর (ডিডি) পরিচয়ে যোগাযোগ করলে ৫০ লাখ টাকা দেন ঠাকুরগাঁও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক দীপক কুমার রায়। কিন্তু মনোনয়ন না পাওয়ায় পরে বুঝতে পারেন তিনি প্রতারকের খপ্পরে পড়েছেন। এরপর তিনি পুলিশের দারস্ত হলে ঠাকুরগাঁওয়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল এবং ঢাকায় অভিযান চালিয়ে তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ বিষয়ে গত ৯ ডিসেম্বর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) প্রধান ও অতিরিক্ত কমিশনার হারুন অর রশীদ বলেন, মনোনয়নপ্রত্যাশী দীপক কুমার রায়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এনএসআই-এর ডিডি মাহমুদুল হাসান পরিচয়ে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করছেন এবং অনেকের মনোনয়ন নিশ্চিত করেছেন। তার (দীপক কুমার রায়) মনোনয়ন নিশ্চিত করার জন্য ৫০ লাখ দাবি করেন। ওই সময় মোবাইল ফোনে অপর প্রান্ত থেকে একজন নারী কণ্ঠে বলেন, আপনার মনোনয়ন ঠিক হয়ে গেছে, সমস্যা নাই। তার পরিচয় জানতে চাইলে দীপক কুমার রায়কে জানানো হয়, ওই নারী প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে ‘সায়মা ওয়াজেদ পুতুল’। আসলে ওই নারীও ছিল প্রতারকদের একজন। চক্রটি তার কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়।

শুধু এ ঘটনা নয়, গত ২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল অফিসার আবু জাফর রাজুর পরিচয়ে বিভিন্ন প্রার্থীকে কোটি টাকায়  মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার প্রতারণার অভিযোগে মনিরুল ইসলাম ভুট্টো (৩৫) নামে এক প্রতারককে গ্রেপ্তার করে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগ।

গত ২৩ নভেম্বর নোয়াখালীতে অভিযান চালিয়ে প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন পরিচয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মো. ইয়াসিন (৪৬) ও তার মেয়ে সুরাইয়া ইয়াসমিনকে (২২) গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পরে তাদের মোবাইল ফোনে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের রেকর্ড পাওয়া যায়।

মনোনয়ন দেওয়ার আশ্বাসে টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে মো. ইয়াসিন এবং তার মেয়ে সুরাইয়া ইয়াসমিন। ছবি : সংগৃহীত

অন্য ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের নিকটাত্মীয় পরিচয়ে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মনোনয়নপত্র পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে  দর-কষাকষি করতেন আবু হানিফ তুষার ওরফে হানিফ মিয়া (৩৯)। কারো কাছে ৫০ কোটি, কারো কাছে ১০০ কোটি, আবার কারো কাছে ৩০০ কোটি টাকা দাবি করতেন তিনি। কিন্তু গত ১৭ অক্টোবর র‌্যাবের জালে ধরা পরেন তিনি।

ওই সময় র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক খন্দকার আল মঈন বলেছিলেন, বিভিন্ন তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় তারা জানতে পারেন ১০/১২ জনকে মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে প্রতারক হানিফ। ২০১৫ সালে হানিফ যে ব্যক্তির পিএস হিসেবে কাজ করতেন তাকেও মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলেন তিনি। এভাবে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।

জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান কলিমল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্ষমতায় যেতে  মনোনয়ন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকে মরিয়া হয়ে থাকেন। আর নির্বাচন বা কোনো উপলক্ষে কিছু সুযোগ-সন্ধানী লোক প্রতারণা করার চেষ্টা চালায়। দিন দিন এর প্রবণতা বাড়ছে। কিন্তু মনোনয়নপ্রত্যাশীরা যখন গোপনে বিভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ করে তখনই প্রতারকের শিকারে পরেন। এছাড়া অনেক সময় ঝড়ে বক মরে ফকিরের কেরামতি বাড়ার মতো লেগে গেলে আবার ওই চক্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং তাদের রেটও বাড়ে। তবে দিন শেষে এসব ক্ষেত্রে নিজেদের সচেতন হতে হবে।

এ বিষয়ে ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ জানান, যারা এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগের বিষয়ে পুলিশকে জানিয়েছেন তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রতারকদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এমন প্রতারণার শিকার আরও কেউ থাকলে পুলিশকে জানাতে বলেন তিনি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত