রহস্যজনক পোলিশ প্রস্তাব ভুট্টোর নাটক

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৪৭ এএম

৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সরগরম হয়ে ওঠে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। যুদ্ধ থামানো বা বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঠেকাতে পাকিস্তানের সঙ্গে জোর তৎপরতা শুরু করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। একের পর এক প্রস্তাবনা পেশ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, চীন, বেলজিয়াম-ইতালি-স্পেনসহ পাঁচ দেশ ও আর্জেন্টিনা-জাপান-নিকারাগুয়াসহ আটটি দেশ। সোভিয়েত রাশিয়ার ভেটোর কারণে যেগুলোর কোনোটিই পাস হয়নি। কিছু প্রস্তাব আবার আগেভাগেই প্রত্যাহার করা হয়। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের রাজনৈতিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া-সংবলিত সোভিয়েত রাশিয়ার প্রস্তাব নাকচ হয়ে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোর কারণে। নানা নাটকীয়তার সেই সময়ের দুটি ঘটনা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ৭২ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে ১৫ ডিসেম্বর দেওয়া পোলিশ প্রস্তাব ও ইয়াহিয়া খানের প্রতিনিধি জুলফিকার আলী ভুট্টোর অতি নাটকীয়তা। ঘটনা দুটো সে সময়ে জাতিসংঘে কিছু সময়ের জন্য ধূম্রজাল তৈরি করে। যদিও তাতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিলম্ব হয়নি।

মুক্তিযুদ্ধের শেষপর্যায়ে ১৫ ডিসেম্বর জাতিসংঘে পোল্যান্ড একটি প্রস্তাব তুলে ধরে। নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাবটির খসড়া তুলে ধরেন পোলিশ কূটনীতিক আইভান কুলাগা। প্রস্তাবে দুপক্ষকে ৭২ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হয়। তবে প্রথমদিকে শেখ মুজিবের মুক্তির কথা বলা হলেও, অধিবেশন কক্ষে খসড়া প্রস্তাবের যে কপি বিতরণ করা হয়েছিল, তাতে শেখ মুজিবের মুক্তির কথা উল্লেখ ছিল না। এই প্রস্তাব পাস হলে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষা করে ফেডারেল কাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হতো। একই সঙ্গে ঢাকায় অপমানজনক আত্মসমর্পণ থেকে রক্ষা পাওয়ারও সুযোগ ছিল পাকিস্তানিদের। পোল্যান্ডের এমন প্রস্তাবে উদ্বিগ্ন ছিল ভারত ও মুজিবনগর সরকার। ভারতীয় জেনারেল জে এফ আর জ্যাকব তার ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা : বার্থ অব এ ন্যাশন’ বইতে লিখেছেন, পোলিশ প্রস্তাব গৃহীত হলে ভারতের জন্য তা সর্বনাশের কারণ হতো। এর সবকিছু বিবেচনা করে বলা যায়, এই প্রস্তাব ছিল পাকিস্তানবান্ধব। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পোল্যান্ড কেন এই প্রস্তাব দিতে গেল? পোল্যান্ড তখন সোভিয়েত বলয়ভুক্ত একটি দেশ। এ কথা সহজেই অনুমেয় মস্কোর অনুমোদন বা সমর্থন ছাড়া পোল্যান্ডের পক্ষে এমন প্রস্তাব পেশ করা সম্ভব ছিল না। তাহলে কি এতে মস্কোর সমর্থন ছিল? কূটনীতির কূটচালের অংশ হিসেবে পর্দার আড়ালে যাই ঘটুক না কেন নিরাপত্তা পরিষদে এই প্রস্তাব বেশিদূর এগোয়নি। রাশিয়াকেও ভেটো দিতে হয়নি। কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপনের আগেই প্রস্তাবটি পুরোপুরি নাকচ করে দেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। এর বিরোধিতা করে পাকিস্তানের মিত্র চীনও। যদি সম্মান রক্ষার স্বার্থে ইয়াহিয়া খান এই প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পক্ষে ছিলেন বলে অনেকেই মনে করেন।

ডিসেম্বরে ইয়াহিয়ার পক্ষে কূটনীতিক যুদ্ধ চালাতে নিউ ইয়র্কে গিয়েছিলেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। ইয়াহিয়া তাকে তখন সহকারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পদোন্নতি দিয়েছিলেন। বাঙালি প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমিনের অধীনে সহকারী প্রধানমন্ত্রীর পদ নিয়ে ভুট্টো যে খুশি ছিলেন না, তা সহজেই অনুমান করা যায়। সে সময় ভুট্টোর সঙ্গে নিউ ইয়র্কে ছিলেন তার ১৮ বছর বয়সী মেয়ে বেনজির। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিলে তাদের তৎপরতা বেড়ে যায়। যেকোনো মূল্যে, যেকোনো পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে তৎপর ছিল ভুট্টো গং। কিন্তু পোলিশ প্রস্তাবের ক্ষেত্রে ভুট্টোর অবস্থান ছিল রহস্যজনক। পরাজয়ের ভয়ে শঙ্কিত ইয়াহিয়া যেকোনো মূল্যে ঢাকার পতন ঠেকাতে চেয়েছিলেন। মরিয়া ইয়াহিয়াকে আশ্বস্ত করতে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল নিক্সন-কিসিঞ্জার প্রশাসন। আশা ছিল চীনা সাহায্যের। কিন্তু এসব বিষয়ে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় শেষ মুহূর্তে পোলিশ প্রস্তাবে আশার আলো দেখিয়েছিলেন ইয়াহিয়া। প্রস্তাবটি মেনে নিয়ে অপমানজনক পরাজয় ঠেকাতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু বেঁকে বসেন ভুট্টো। ইয়াহিয়ার মনোভাবকে উপেক্ষা করে ভুট্টো নিরাপত্তা পরিষদে মঞ্চস্থ করেন এক নাটকের। যে নাটকের শেষ দৃশ্যে ভুট্টো ১৫ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে বাস্তবতা-বিবর্জিত আবেগী ভাষণ দেন। যদিও এর মধ্যেই ঢাকার পতন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছিলেন ভুট্টো। ভাষণে তিনি বলেন ‘তার দেশ যোদ্ধার দেশ। বিশ্বের সেরা পদাতিক সৈন্য রয়েছে পাকিস্তানে। আমরা যুদ্ধ করব। হাজার বছর ধরে যুদ্ধ করব।... পাকিস্তানের বিরুদ্ধে ভারতের আগ্রাসন হিটলারের নাৎসি বাহিনীর চেয়েও নগ্ন। সোভিয়েত প্রতিনিধির দিকে আঙুল নির্দেশ করে ভুট্টো বলেন,... আপনি কমরেড মালিকের মতো কথা বলছেন না, বলছেন জার মালিকের মতো... আমরা আপনার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই কিন্তু আপনারা আমাদের নিশ্চিহ্ন করতে চান। আপনাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সময় এখন নয়। বক্তৃতার শেষপর্যায়ে বেসামাল ভুট্টো বলেন, ‘আপনারা যে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এনেছেন, তা ভার্সাই চুক্তির চেয়েও অপমানজনক। আমি এই চুক্তি সমর্থন করতে পারি না। আমি নিজ দেশে ফিরে যাব এবং যুদ্ধ করব। রইল পড়ে আপনাদের নিরাপত্তা পরিষদ। আমি চললাম।’ এরপরই অতি নাটকীয়ভাবে কাগজ ছিঁড়ে পরিষদ কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন ভুট্টো।

বিপদের সে সময় অপেক্ষাকৃত গ্রহণযোগ্য পোলিশ প্রস্তাব ভুট্টো কেন গ্রহণ করেননি, পরে তা নিয়ে পাকিস্তানে ব্যাপক বিতর্ক হয়। কেউ ভুট্টোর পক্ষে বলেন, কেউবা বিপক্ষে। তবে সেনাশাসক জিয়াউলপন্থি রাজনীতিকদের সমালোচনার মুখে ১৯৮৬ সালে বেনজির ভুট্টো উল্লেখ করেন, ১৯৭১-এর ১৫ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে যে কাগজ ছিঁড়ে ভুট্টো বের হয়েছিলেন, তা পোলিশ প্রস্তাবের কপি ছিল না। মার্কিন গবেষক সিসন ও রোজ বেনজিরের এই বক্তব্যের পক্ষে মত দেন। অন্যদিকে নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই প্রস্তাব মেনে নিলেও হয়তো পরিস্থিতি খুব একটা পরিবর্তন হতো না। কারণ ঢাকায় আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে। গভর্নর ডাক্তার মালেক আগেই (১৩ ডিসেম্বর) পদত্যাগ করেছেন। পাকিস্তানি সেনারা পরাজয় মেনে নিতে প্রস্তুত। মদ্যপায়ী, বেসামাল ইয়াহিয়া পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় মেনে নেওয়া ছাড়া আর কোনো পথই খোলা ছিল না পাকিস্তান ও তার মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-চীনের জন্য। তাই শেষ সময়ে কোনো প্রস্তাব মানতে চাননি ভুট্টো; বরং দম্ভ দেখিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে আসাটাকেই লাভজনক বলে মনে করেছেন, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অনেকটা সহায়ক ছিল। যাকে বেশ ভালোভাবেই নিজের মতো করে কাজেও লাগিয়েছিলেন রাজনৈতিক অঙ্গনের নটবর জুলফিকার আলী ভুট্টো।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত