নয়াদিল্লির চিন্তায় ভারত মহাসাগর

আপডেট : ১৭ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:২১ এএম

ভারত মহাসাগরে চীনের তৎপরতা নিয়ে ভারতের মাথাব্যাথা ক্রমশ বাড়ছে। মালদ্বীপ থেকে সেনাঘাঁটি অপসারণের তোড়জোড়ের পর নয়াদিল্লির সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিও বাতিল করল মালে। আবার এরই মধ্যে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার দিকে এগিয়ে আসছে চীনের গবেষণা জাহাজ, যা নিয়ে আপত্তি তুলেছে ভারত। ভারত মহাসাগরের সবচেয়ে নিকটবর্তী দুই দ্বীপরাষ্ট্র ঘিরে চীনের কর্মকান্ড নয়াদিল্লির জন্য মোটেই স্বস্তিদায়ক হচ্ছে না।  মালদ্বীপে ‘চীনপন্থি নেতা’ মোহাম্মদ মুইজ্জু প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়ে দেশটি থেকে সেনাঘাঁটি সরাতে নয়াদিল্লির প্রতি অনুরোধ জানান। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর, নয়াদিল্লি ঘাঁটি তুলে নিতে সবুজ সংকেত দিয়েছে। এ নিয়ে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতের সেনাঘাঁটি সরিয়ে আনার মধ্য দিয়ে দ্বীপরাষ্ট্রটিতে চীনের প্রভাব বৃদ্ধির পথ আরও প্রশস্ত হতে যাচ্ছে। চার বছর আগে মালদ্বীপ ও ভারতের মধ্যে একটি সমুদ্র সহযোগিতা চুক্তি সই হয়, যার আওতায় সমুদ্রে জরিপ চালাত দুই দেশ। এই নৌ সহযোগিতা চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় নৌবাহিনী মালদ্বীপের জলসীমায় নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত সহযোগিতার পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষা এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণাধর্মী কাজে সমীক্ষা চালাতে পারত। মালের সহযোগিতায় মূল কাজটি করছিলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরাই।

মালের জননীতিবিষয়ক সচিব মোহাম্মদ ফিরুজুল আবদুল খলিল গত বৃহস্পতিবার সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বিপক্ষীয় এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার মুইজ্জুর প্রশাসন চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে মালদ্বীপের জলসীমায় অবাধ বিচরণের অনুমতি আর থাকল না ভারতের। মালদ্বীপের প্রেসিডেন্টের দপ্তর থেকে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট চান না যে, দেশের জলসীমায় অন্য দেশের প্রভাব থাকুক। বিষয়টিকে দেশের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকি মনে করেন মুইজ্জুর প্রশাসন। মালদ্বীপের সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ সোলিহ ভারতপন্থি নেতা হিসেবে পরিচিত। তিনিই এই চুক্তি করেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারে মুইজ্জু প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তিনি জয়ী হলে ওই চুক্তি পর্যালোচনা করা হবে। ভারত মহাসাগর নিয়ে চীন আর ভারতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত দুই দশকে নতুন মাত্রা পেয়েছে। বিশেষ করে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার মতো দুই দ্বীপরাষ্ট্রকে কবজায় নিতে দুই শক্তিই নিজ নিজ কৌশল সাজাতে ব্যস্ত। মালদ্বীপের নির্বাচনে চীনপন্থি নেতার জয় ভারতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবেই এসেছে। কারণ বিশাল সমুদ্রাঞ্চলে প্রভাব ধরে রাখতে মালদ্বীপ ছিল ভারতের নির্ভরযোগ্য অংশীদার। তা ছাড়া দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটিতে ভারতের প্রভাব বিরাজ করছিল, যা এখন প্রধান ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী চীনের কাছে চ্যালেঞ্জের মুখে। মালের নতুন প্রশাসনের সঙ্গে নয়াদিল্লির সম্পর্কে দূরত্ব সৃষ্টির পরপরই নতুন এক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। চীনের গবেষণা জাহাজ ‘শি ইয়ান-৬’ শ্রীলঙ্কার সমুদ্র উপকূলে নোঙর করে জরিপ চালিয়ে গত ২ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে চলে গিয়েছে। এবার কলম্বো ও মালের কাছে আরও একটি গবেষণা জাহাজ ‘শিয়াং ইয়াং হং-৩’ নোঙর করানোর অনুরোধ জানিয়েছে বেইজিং। দক্ষিণ ভারত মহাসাগরে জরিপ চালাতে জাহাজটির নোঙর করাতে চাইছে বেইজিং। চীন ওই দুই দেশকে বলেছে, আগামী জানুয়ারি থেকে মে মাসের শেষ পর্যন্ত তারা দেশ দুটির বন্দরে নোঙর করে কর্মকা- চালিয়ে যেতে চায়। দক্ষিণ চীন সাগরের একটি বন্দরে নোঙর করা জাহাজটি মালাক্কা প্রণালি পাড়ি দিয়ে দুই দেশের বন্দরে নোঙর করতে চায়। এ নিয়ে নয়াদিল্লি আপত্তি জানিয়ে বলেছে, চীনের শিয়াং ইয়াং হং-৩ জাহাজটি নজরদারি সামগ্রী দিয়ে পরিপূর্ণ, যা ভারতের জন্য হুমকিস্বরূপ।

নতুন গবেষণা জাহাজকে ভারত ‘গোয়েন্দা জাহাজ’ বলছে। এটিকে এখনো বন্দরে ভেড়ানোর অনুমতি দেয়নি কলম্বো। তবে আগের জাহাজটিকে ঠিকই অনুমতি দিয়েছিলেন শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে। এবার দেখার বিষয় ভারতের উদ্বেগ আমলে নিয়ে চীনা জাহাজকে ভিড়তে অনুমতি দেয় কি না কলম্বো। আবারও মালে এ নিয়ে কী পদক্ষেপ নেয় তাতেও নজর থাকবে ভারতের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত