জ্বালানি খাতে লবিস্ট ও প্রভাবশালীদের অনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে সংস্থাটি মনে করে, অভিযোজন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত তহবিল সরবরাহ এবং তা ছাড়করণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা নির্ধারণে সব অংশীজনকে একত্রে কাজ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অধিকতর সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বানও জানিয়েছে সংস্থাটি। গতকাল সোমবার এক বিবৃতিতে দুবাই জলবায়ু সম্মেলনে (কপ২৮) জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার ঘোষণা ও ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের আনুষ্ঠানিক যাত্রাকে ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে টিআইবি। তবে উভয় ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট পথরেখা না থাকায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মতো ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য এর বাস্তব সুফল কখন, কীভাবে, কতটুকু আসবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অভিযোজনের জন্য তহবিল বাড়ানো এবং তা নির্দিষ্ট সময়ে সরবরাহের বিষয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় হতাশা প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
বিবৃতিতে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জলবায়ু সম্মেলনে ২০০টি দেশের প্রতিনিধিদের ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার ঘোষণা ঐতিহাসিক বলে বিবেচিত হলেও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিষয়ে চূড়ান্ত চুক্তিতে ইচ্ছাকৃতভাবে ভাষাগত অস্পষ্টতা ও ত্রুটিযুক্ত রাখা হয়েছে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পথরেখা উল্লেখ না করে কোনো ধরনের ব্যাখ্যা ছাড়াই যথাযথ, সুশৃঙ্খল ও ন্যায়সংগত জাতীয় কিছু শব্দবন্ধ উল্লেখ করে দায়মুক্ত থাকার প্রবণতা উদ্বেগজনক। বিজ্ঞানের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার কথা বলা হয়েছে, যা ৩০ বছর আগেই সব পক্ষ স্বীকার করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে উন্নত দেশগুলো প্রতিশ্রুত অর্থায়নসহ তাদের কর্তব্য পালন করেনি।
ড. ইফতেখারুজ্জামান উল্লিখিত ঘোষণা দুটি মানার ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধ্যবাধকতাও রাখা হয়নি, যা জীবাশ্ম জ্বালানি খাতের প্রসারে যেমন কোনো বাধা না থাকার নামান্তর, তেমনি ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের যাত্রাও আইওয়াশের বেশি কিছু হবে এমন প্রত্যাশা করা অমূলক।
টিআইবি জানায়, সম্মেলনের খসড়া প্রস্তাবনায় প্রাথমিকভাবে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার ‘পর্যায়ক্রমে বন্ধ’ করার কথা উল্লেখ করা হলেও দৃশ্যত জীবাশ্ম জ্বালানি লবির প্রভাবে তা শেষ পর্যন্ত রাখা হয়নি; বরং সম্মেলনে নেট জিরো কার্বন নির্গমন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৫০ সালের মধ্যে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে পর্যায়ক্রমে সরে আসার বিষয়ে বাধ্যবাধকতাহীন অনির্দিষ্ট একটি ঘোষণা দিয়ে দায় সারা হয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সরে আসার কথা বলা হলেও চূড়ান্ত চুক্তিতে সময়াবদ্ধ কোনো পরিকল্পনা বা পথরেখা নেই। অধিকন্তু ক্ষয়ক্ষতি তহবিলের জন্য যে ৬৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মাত্র ঘোষণা করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য কতটুকু বাস্তব সুফল বয়ে আনবে, তারও কোনো দিকনির্দেশনা নেই।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, এবারের সম্মেলনে শুরু থেকেই প্রত্যাশা ছিল কয়লার ব্যবহার বন্ধে অন্তত সুনির্দিষ্ট একটি ঘোষণা দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার মোড়কে ভাষাগত মারপ্যাঁচে চুক্তিতে অদক্ষ কয়লা প্রযুক্তিতে ভর্তুকি না দেওয়া এবং এমন প্রযুক্তিকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বন্ধ করার মতো অস্পষ্ট ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রাখার সুযোগ বাস্তবে অবারিত রাখা হয়েছে; যা জীবাশ্ম জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি বড় সফলতা।
