এমপিদের অজনপ্রিয়তায় স্বতন্ত্ররা শক্তিশালী

আপডেট : ১৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৭:৪০ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পেয়েও স্বস্তিতে নেই ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া শতাধিক আসনের প্রার্থী। এসব আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভোট করছেন অনেকটা ফুরফুরে মেজাজে। বিপরীতে নৌকার প্রার্থীদের কপালে পড়েছে চিন্তার ভাঁজ; বিশেষ করে বর্তমান সংসদ সদস্য (এমপি) যারা আবার নির্বাচন করছেন, তারা আছেন বেশি শঙ্কায়। এলাকার রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব ও দুর্ব্যবহার এবং জনবিচ্ছিন্নতাসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে অনেক আসনে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা।

অন্যদিকে নতুন প্রার্থীরা নৌকা নিয়ে নির্বাচন করলেও পুরনোদের মতো ভোটের মাঠে তাদের বেগ পেতে হচ্ছে না। বেগ পেতে হচ্ছে না স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও। দেশের সবকটি বিভাগের আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে। এমনকি গতকাল সোমবার প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর কয়েক দিন আগে থেকেই হানাহানির ঘটনা ঘটতে শুরু করেছে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে।

টাঙ্গাইল জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ফজলুর রহমান ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নতুন প্রার্থীর চেয়ে রানিং প্রার্থীদের (বর্তমান এমপি) জন্য এবারের নির্বাচনী অঙ্ক একটু জটিল। যিনি এমপি আছেন এবং আবারও ভোট করছেন, তিনি ৫-১০ বছরে সবার মন রক্ষা করতে পারেননি। সবার চাওয়া-পাওয়া পূরণ করা সম্ভবও নয়। ফলে নির্বাচনের সময় বঞ্চিত অংশকে ম্যানেজ করা জটিল।’

এই আওয়ামী লীগ নেতা আরও বলেন, ‘সারা দেশে অনেক আসনে বর্তমান এমপিদের বিরুদ্ধে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে রাজনীতি করা ও দলের মধ্যে বিভাজন তৈরির অভিযোগ আছে। সেই সব এমপির জন্য স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ভয়ের কারণ। স্বতন্ত্র বেশিরভাগ প্রার্থী আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় দলের নেতাকর্মীদের স্বতন্ত্র প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার ক্ষেত্রে আটকানোও বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও আওয়ামী লীগের, ফলে নেতাকর্মীদের ঠেকানো অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে।’

তবে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা বলছেন, স্বতন্ত্র না নৌকা কে বিজয়ী হবে তা নিয়ে তারা চিন্তিত নন। তাদের মূল ভাবনা নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করা। এ প্রসঙ্গে দলটির সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির কো-চেয়ারম্যান কাজী জাফর উল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে। নির্বাচনে যে প্রার্থী জনপ্রিয় তিনিই জিতে আসবেন। নৌকা ও স্বতন্ত্র এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের কোনো ভাবনা নেই।’

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের আরও একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, যেসব প্রার্থী নৌকা পাওয়ার পরও স্বতন্ত্র প্রার্থীকে ভয় পাচ্ছেন, তাদের ব্যাপারে দলের কোনো ছাড় নেই। আওয়ামী লীগ মনে করে তারা অযোগ্য। তাই তাদের রাজনীতিতে থাকারও কোনো প্রয়োজন নেই।

এ বিষয়ে তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান এমপিরা নিজেদের অপরাজনীতির মাশুল পেতে যাচ্ছেন। এলাকার রাজনীতিতে নিজস্ব বলয় সৃষ্টি, দলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি ও খারাপ আচরণসহ বিভিন্ন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণেই অনেক আসনে নৌকার প্রার্থীর প্রতি বিরূপ অবস্থান নিয়েছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। নিজস্ব বলয় সৃষ্টি করে রাজনীতি করা, নেতাকর্মীদের কাছে ঘেঁষতে না দেওয়া, দুর্ব্যবহার এসবের প্রতিশোধ নিতে মুখিয়ে আছেন তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা যেহেতু নিজের দলেরই লোক, তাই নৌকার বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ করাকে তৃণমূল নেতাকর্মীরা অনৈতিকও মনে করছেন না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নৌকার যেসব প্রার্থী ২০০৮ সালের পর রাজনীতিতে এসে শিকড় গেড়েছেন, মূলত তারাই বেকায়দায় পড়েছেন এবারের নির্বাচনে। নৌকা প্রতীক পেলেও এসব প্রার্থী ভোটের আগেই যেন পরাজিত স্বতন্ত্র প্রার্থীর কাছে। অন্যদিকে নৌকা প্রতীক না পেয়েও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঠে পাশে পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছেন।

বিএনপিবিহীন দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন জমিয়ে তুলতে দলীয় নেতাদের স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বিধিনিষেধ তুলে নেয় আওয়ামী লীগ। ফলে দেশ জুড়েই স্বতন্ত্র প্রার্থীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হচ্ছে আওয়ামী লীগ মনোনীত নৌকার প্রার্থীকে। স্বতন্ত্র প্রায় সব প্রার্থী আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের বেশিরভাগই স্বতন্ত্র প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে আছেন। ফলে নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কাছেই গলদঘর্ম অবস্থা নৌকা প্রার্থীদের। এমনকি অনেক আসনে প্রচারণা শুরুর আগেই স্বতন্ত্র প্রার্থীরা মাঠ দখলে নিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান সংসদ সদস্য যারা আবারও নৌকা প্রতীক পেয়েছেন, বেশিরভাগই পুরনো হওয়ায় তাদের ব্যাপারে নেতাকর্মীদের মধ্যে একধরনের নেতিবাচক চর্চা শুরু হয়েছে। দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে একজনকে কতবার ভোট দেবেন। সাধারণ মানুষের মধ্যেও একই ধরনের প্রশ্ন। আবার এমপি থাকা অবস্থায় তারা কী করেছেন, সেসব চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষতে শুরু করেছেন নিজ দলের নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ মানুষও। প্রচার চলছে যে, দুই-তিন মেয়াদে সংসদ সদস্য থেকে সাধারণ মানুষের জন্য কী করেছেন তারা? বর্তমান এমপি যারাই নির্বাচন করছেন, তাদের সবার বিরুদ্ধে এলাকায় দলের মধ্যে বিভাজন তৈরির অভিযোগ ভোটের মাঠে বেশ আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া এক অংশকে সুবিধা দিয়ে আরেক অংশকে দমনপীড়ন করেছেন এসব নিয়েও চলছে কানাঘুষা। এসব হিসাব মেলাতে গিয়ে নৌকার প্রার্থীকে সমর্থন না দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে সমর্থন দিতে শুরু করেছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই। তবে যেসব আসনে বর্তমান সংসদ সদস্যকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেসব আসনে নৌকার প্রার্থীর সঙ্গেই আছেন দলের নেতাকর্মীরা। এমন পরিস্থিতিতে অধিকাংশ নির্বাচনী এলাকায় নিজেদের মধ্যে মারামারি-হানাহানির আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।

নৌকা প্রার্থীর সমর্থকরা আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের নানাভাবে হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আবার শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদেরও নৌকা প্রার্থীর সমর্থকদের হুমকি দিতে দেখা যাচ্ছে।

বিভিন্ন জেলায় দেখা গেছে, স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে টানাটানি করছেন নৌকা ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা। নানারকম লোভ দেখিয়ে চলেছে উভয়পক্ষ। এ অবস্থায় নেতাকর্মীদের কদরও বেড়েছে। দুপক্ষই নিজেদের পক্ষে রাখতে চান আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের। তবে নৌকার চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকেই বেশি ঝুঁকেছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতাকর্মী অনেক সংসদীয় আসনে নৌকা হারাতে স্বতন্ত্র প্রার্থীকে বিজয়ী করতে উঠেপড়ে লেগেছেন। ফলে নিজেদের জয় নিয়ে ভীত হওয়ার পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রতি চরম ক্ষুব্ধ নৌকার প্রার্থীরা। আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীরা নিজ দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের হুমকি-ধমকি দিয়ে আসছেন। আর গতকাল প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর পর এই হুমকি-ধমকি হানাহানিতে রূপ নিতে যাচ্ছে বলে আশঙ্কা করছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীরা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত