ছবিও আসলে সংবাদ বড় সংবাদ

আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৮ পিএম

পাঁচ পেরোল ‘দেশ রূপান্তর’। ২০১৮ সালের এই দিনে ‘দায়িত্বশীলদের দৈনিক’ এ স্লোগান নিয়ে পাঠকের কাছে হাজির হয়েছিলাম আমরা। শুরুর দিন থেকেই ছবি প্রকাশের ক্ষেত্রে আমরা পাঠকের চাহিদার প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম। আমরা চেষ্টা করেছি ভিন্নধারার ছবি প্রকাশের মাধ্যমে পাঠকের সঙ্গে এক নিবিড় বন্ধন তৈরি করার। আমরা আমাদের ক্যামেরার লেন্সে ধরে রাখতে চেয়েছি গণমানুষের অনুভূতি, যা আপনাদেরও আলোড়িত করেছে। দেশ রূপান্তরের আলোচিত ছবিগুলো বিভিন্ন সামাজিকমাধ্যমে শেয়ার করে আপনারাও আমাদের পাশে থেকেছেন। আপনাদের এমন সমর্থন আমাদের দৃশ্যভাবনার জগৎকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

আমাদের পত্রিকাগুলো সাধারণত একই ধরনের, আগে দেখা বা প্রথাগত কম্পোজিশনের ছবি প্রকাশ করে থাকে। ছবি নিয়ে তাদের ভাবনার জায়গাটাও সংকুচিত। ফলে ছবি অনেক সময় গুরুত্বহীনভাবে ছাপা হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে পাঠকের অদেখা বা ভিন্ন কম্পোজিশনের সংবাদচিত্র প্রকাশ করে দেশ রূপান্তর ইতিমধ্যেই একটি নিজস্ব শৈলী তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। মাঝেমধ্যেই ঘটনার প্রতিনিধিত্বশীল ছবি, যাকে সংবাদচিত্রের ভাষায় ডিসাইসিভ মোমেন্ট বলা হয়; সেই মুহূর্তের আলোকচিত্র দিয়ে মলাট বা প্রচ্ছদ করে এক ধরনের মনন তৈরি চেষ্টা করেছে দেশ রূপান্তর। প্রচ্ছদগুলো পাঠকমহলে বেশ আলোচিত ও নন্দিত হয়েছে।

সাধারণ বাংলা দৈনিকগুলোতে বড় ছবি ছাপার ব্যাপারে কিছুটা কুণ্ঠা দেখি। এই কুণ্ঠা বহুকালের পুরনো। দুয়েকটি ইংরেজি দৈনিকের অবশ্য বড় বড় ছবি ছাপার সুনাম আছে। কিন্তু এ দেশে দীর্ঘদিন ছবিনির্ভর একটা বাংলা দৈনিকের খুব অভাব ছিল। দেশ রূপান্তর সেই অভাব পূরণ করেছে বলে অনেককে বলতে শুনি। বড় ছবি ছাপার ব্যাপারে দেশ রূপান্তর বরাবরই উদার। প্রথম পৃষ্ঠায় চার কলাম ছবি ছাপা এ পত্রিকার একটা ন্যূনতম মানদন্ড। মাঝেমধ্যে ঘটনার গুরুত্ব বা ছবির অন্তর্নিহিত বক্তব্যের কারণে পাঁচ-ছয়-সাত-আট কলামও ছবি ছেপেছি আমরা। একবার দুই পৃষ্ঠা জুড়ে ষোলো কলাম ছবি ছাপারও নজির তৈরি করেছে দেশ রূপান্তর। ছবি ছাপার পাশাপাশি ফটো ক্রেডিট দেওয়ার ব্যাপারেও দেশ রূপান্তর বেশ উদারতার পরিচয় দিয়েছে। নিজস্ব আলোকচিত্রী ছাড়াও বিশেষ প্রয়োজনে বাইরে থেকে ছবি সংগ্রহ করলেও তার নাম যথাযথভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও দেশ রূপান্তর যত্নশীলতা দেখিয়েছে।

আমরা বিভিন্ন ঘটনা প্রবাহের ছবি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে, যত্নের সঙ্গে প্রকাশ করার চেষ্টা করি। যখন কোনো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ঘটনা থাকে না, তখন দৈনন্দিন ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ফিচার ছবি তোলার ও ছাপার চেষ্টা করি। ফলে ছবিগুলোও মানুষের প্রাত্যহিক আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। আমরা শুরু থেকেই চেষ্টা করেছি, কিছুটা ব্যতিক্রমী ভাবনার ছবি ছাপতে। এই কাজ করা সম্ভব হয়েছে আমাদের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুনের আন্তরিক সহযোগিতা আর সমর্থনের কারণে। বড় ছবি, ভালো ছবি ছাপার ব্যাপারে আমি সবসময় তার পক্ষপাত লক্ষ করেছি। ভালো ছবি ছাপা হলে তার কাছ থেকে অভিনন্দনপত্র পেতে দেরি হয় না। আমি প্রায় বলি, মামুন ভাই হলেন একজন আলোকচিত্রবান্ধব সম্পাদক। কথাটা এমনি এমনি বলি না। মামুন ভাই আছেন বলেই বার্তাকক্ষের অন্যরাও ছবি ও আলোকচিত্রীর ক্রেডিটের ব্যাপারে সচেতন থাকেন। ছবির ক্রেডিট দেওয়াটা যে আন্তর্জাতিকভাবে গণমাধ্যমের একটা স্বীকৃত রীতি, সেটি দেশ রূপান্তর সততার সঙ্গে পালন করে। প্রতিদিন আমাদের নিজস্ব আলোকচিত্রী ছাড়াও পিআইডি, বাসস, ফোকাস বাংলা, এএফপিসহ সারা দেশের প্রতিনিধিদের কাছ থেকে যত ছবি আসে; সেই ছবিগুলোর আমি একটা প্রাথমিক সিলেকশন করি সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে। কোনো ব্যতিক্রম ছবি পেলেই আমি দ্রুত সম্পাদকের কাছে যাই। ছবিটা কেন গুরুত্বপূর্ণ তা বলার চেষ্টা করি। ছবি দেখে মামুন ভাইও কিছুটা উত্তেজিত হয়ে বলেন, চলেন গ্রাফিকস রুমে। যেতে যেতে ভাবি ছবিটা হয়তো পাঁচ কলাম ছাপা হবে। গ্রাফিকস রুমে গিয়ে মামুন ভাই বলেন, ‘আলী, ছবিটা ছয় কলাম বসান।’ আলী হচ্ছেন আমাদের প্রধান গ্রাফিক ডিজাইনার। পুরো নাম মোহাম্মদ আলী। আলী ভাই ছবিটা বসানোর পর পত্রিকার চেহারাটাই অন্যরকম হয়ে যায়।

আমাদের ফটোগ্রাফি টিমটা যে খুব বড় তা নয়। মাত্র ছয়জনের টিম। নিউজ বিভাগে কাজ করেন মহুবার রহমান ও মারুফ রহমান। ফিচারে আবুল কালাম আজাদ আর স্পোর্টসে মোশারফ হোসেন। চট্টগ্রাম অফিসে কাজ করেন আকমাল হোসেন। সংবাদপত্রের কাজটা আসলে সমন্বয়ের, যাকে সাংবাদিকতার ভাষায় টিমওয়ার্ক বলা হয়। নিউজ ডেস্ক ও রিপোর্টিং বিভাগের সঙ্গে ফটোগ্রাফি বিভাগের সমন্বয়টা বেশ শক্ত। ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মোস্তফা মামুন, বার্তা সম্পাদক শাহআলম বাবুল, অতিরিক্ত বার্তা সম্পাদক জুয়েল মোস্তাফিজ, যুগ্ম বার্তা সম্পাদক জাকির হোসেন ও প্রধান প্রতিবেদক আশরাফুল হক রাজীবের সঙ্গে ফটোগ্রাফি বিভাগের সমন্বয়টাও বেশ স্বচ্ছন্দের।

বেশিরভাগ পত্রিকায় ছবিকে এখনো সংবাদের সহযোগী অনুষঙ্গ ভাবা হয়। অথচ পৃথিবী এখন ভিজ্যুয়াল হয়ে গেছে। ফলে সংবাদমাধ্যমের অনেকটা জায়গা দখল করে নিয়েছে ছবি। নিজেদের টিকিয়ে রাখার জন্যই ছবিকে ভিন্নভাবে ভাবা দরকার। ঐতিহাসিক ছবি ব্যবহারের ক্ষেত্রে পত্রিকাগুলো ‘সংগৃহীত’ লিখে দায় সারার চেষ্টা করে। কিন্তু দেশ রূপান্তর চেষ্টা করে ছবিটা কার তোলা, কখন, কোন বাস্তবতায় তোলা; তা উদঘাটন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরতে। ঐতিহাসিক ছবিগুলো সঠিকভাবে তুলে ধরা আমরা কর্তব্য মনে করি। দীর্ঘকাল পর ছবিগুলো ভুলভাবে পাঠকের কাছে গেলে ইতিহাসে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গত বছর থেকে দেশ রূপান্তরে বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড চালু হয়। সিদ্ধান্ত হয় প্রতি মাসে সেরা প্রতিবেদনের জন্য একজন রিপোর্টার এ পুরস্কার পাবেন। আমি তখন বলি, ফটোগ্রাফি বিভাগেও এ পুরস্কার চালু করা উচিত। আমার কথা শুনে সম্পাদক বলছিলেন, ‘তাহলে তো প্রতিটি বিভাগই এ পুরস্কার দাবি করে বসবে।’ এখন বলতে ভালো লাগছে, এ বছর ফটোগ্রাফি বিভাগ তিনবার বেস্ট রিপোর্টিং অ্যাওয়ার্ড পায়। জানুয়ারি মাসে আমি, জুন মাসে আলোকচিত্রী মহুবার রহমান আর নভেম্বর মাসে চট্টগ্রামের আলোকচিত্রী আকমাল হোসেন এ পুরস্কার পান। সংবাদচিত্রও যে রিপোর্টিংয়ের একটা গুরুত্বপূর্ণ অংশ, দেশ রূপান্তর ছাড়া এমনটা আর কারা ভাবে?

লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত