মেশিনের নামে পার্টস কিনে ২০ লাখ টাকা লোপাট

আপডেট : ২২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:১১ এএম

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মেশিন ক্রয়ের নামে মেশিনের পার্টস কিনে ২০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব নির্দেশনা অমান্য করে ওয়ারেন্টি-গ্যারান্টি ছাড়াই ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকার মেশিন ক্রয় করা হয়। সরকারের স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের একটি নিরীক্ষায় এসব তথ্য উঠেছে আসে। যারা এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের কাছ থেকে অর্থ আদায়সহ বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২০-২১ অর্থবছরে বিএসএমএমইউর প্যাথলজি বিভাগের জন্য জাপানের তৈরি অলিমপাস (মডেল-বিএক্স৪৩) ব্র্যান্ডের পাঁচটি কম্পাউন্ড অপটিক্যাল মাইক্রোস্কোপ সরবরাহের জন্য ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট সারবন ইম্পোর্ট লিমিটেডকে কার্যাদেশ প্রদান করা হয়। কার্যাদেশ অনুযায়ী পাঁচটি মাইক্রোস্কোপ সরবরাহ করে। স্বাস্থ্য অডিট দল নিরীক্ষাকালে দেখা পায়, মাইক্রোস্কোপের একপাশে মডেল বিএক্স৪৩ লেখা, অন্যপাশে ইউ-ডিজিরোথ্রি লেখা। এ মডেলের মাইক্রোস্কোপের শিপিং চার্জসহ প্রতিটির মূল্য ৯৯ হাজার টাকা। সরবরাহকৃত মেশিনের ভ্যাট, আইটি ও মুনাফাসহ মোট মূল্য হবে ৬ লাখ ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা। অথচ এসব যন্ত্রের মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে ২৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ মেশিন ক্রয়ের নামে ২০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা লোপাট করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিএসএমএমইউতে সরবরাহকৃত মডেল ইউ-ডিজিরোথ্রি একটি পূর্ণ মেশিন নয়। এটি মডেল-বিএক্স৪৩ মেশিনের একটি অংশ মাত্র। কাজের সুবিধার্থে বিএসএমএমইউতে মডেল-বিএক্স৪৩ মেশিন ব্যবহার করা হয়। এ মেশিনের সঙ্গে মডেল ইউ-ডিজিরোথ্রির কোনো সম্পর্ক নেই। নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে বিএসএমএমইউ যে জবাব দিয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তাই এ অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে অতিরিক্ত পরিশোধকৃত অর্থ আদায় করে কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা প্রদানসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বিএসএমএমইউতে ২০২০-২১ অর্থবছরে চারটি কোম্পানি থেকে যন্ত্রপাতি কেনা হয়। এসব যন্ত্রপাতি ওয়ারেন্টি ছাড়ায় ক্রয় করার কারণে সরকারের ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকা গচ্চা গেছে। যেসব কোম্পানি থেকে যন্ত্রপাতি ক্রয় করা হয়েছে তার মধ্যে সানি ট্রেডিং এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড, রিয়ালেন্স সলিউশন লিমিটেড, এসপি ট্রেডিং হাউজ এবং জেবিএফ ডিজিটাল ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের নাম রয়েছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ২০১৪ সালের ২ জুন ক্রয় ও সংগ্রহ শাখার জারিকৃত পরিপত্রের অনুচ্ছেদ ৫(খ) এবং ৫(গ)-তে বলা আছে, উচ্চপ্রযুক্তির চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সরবরাহকারীদের ন্যূনতম পাঁচ বছরের নিরবচ্ছিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশের গ্যারান্টি প্রদান করতে হবে এবং পাঁচ বছরের কমপ্লিট আফটার সেলস সার্ভিসের নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। এ ছাড়া বিএসএমএমইউর অর্থ কমিটির ৭০ দশমিক ১৩-এর সিদ্ধান্ত মোতাবেক মেশিনারি ক্রয়ের সময় পাঁচ বছরের ওয়ারেন্টির বিষয়টি অগ্রাধিকার মানতে হবে। অথচ মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের নির্দেশনা অমান্য করে মেশিনারি যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সরবরাহের ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের স্থলে দুই বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ওয়ারেন্টি ছাড়াই বিএসএমএমইউতে ক্রয় করা হয়েছে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএসএমএমইউতে ২০২০-২১ অর্থবছরে যন্ত্রপাতি ক্রয়, কমিশনের নামে ইউজার ফির অর্থ আত্মসাৎ ও চাকরির বয়সসীমা বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাৎসহ ৩৬ খাতে ২৬৭ কোটি ৭৩ লাখ ২০ হাজার ৭২৪ ব্যয়ে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। অডিট দল যথাযথ প্রমাণক উপস্থিত করে এসব অডিট আপত্তি মীমাংসার জন্য বিএসএমএমইউতে চিঠি দিয়েছে। বিএসএমএমইউর তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে ১৭টি আপত্তি মীমাংসা করা সম্ভব হলেও ১৯টি আপত্তি মীমাংসা করা হয়নি, যেগুলো মীমাংসাযোগ্য নয়। এর মধ্যে দুটি আপত্তি হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানটির প্যাথলজি বিভাগে মেশিন ক্রয়ের নামে মেশিনের পার্টস কিনে ২০ লাখ ৮১ হাজার ২৫০ টাকা লোপাট এবং মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অমান্য করে ওয়ারেন্টি ছাড়া মেশিন কেনায় আরও ৬ কোটি ৮৮ লাখ ৩৯ হাজার ৯৯৬ টাকা লোপাট।

অডিট অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, বিএসএমএমইউতে ২০২০-২১ অর্থবছরের অনেক খাতের ব্যয়ের অনিয়ম নিয়ে অডিট আপত্তি হয়েছে। এর মধ্যে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণকের ভিত্তিতে কিছু মীমাংসা করা হয়েছে। আর তথ্য-প্রমাণক না থাকায় ১৯টি আপত্তি মীমাংসা করা হয়নি। যেসব আপত্তি মীমাংসাযোগ্য নয়, সেগুলো দুর্নীতি হিসেবে গণ্য করা হয়। যারা এ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত তাদের কাছ থেকে লোপাট হওয়া অর্থ আদায় করে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা প্রদান ও তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এ বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরবর্তী সময়ে প্রতিবেদনটি রাষ্ট্রপতি ও সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হবে। সংসদীয় কমিটি অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অডিট অধিদপ্তরের পরিচালক মুহাম্মদ সাইফুর রহমান জামালী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিএসএমএমইউর অডিটের বিষয়ে এখন কিছু বলা যাবে না। নথি দেখে বিস্তারিত বলতে হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত