আচরণবিধি ভঙ্গ  দুই শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ

আপডেট : ২৪ ডিসেম্বর ২০২৩, ০১:৫৯ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে দেশে সংঘর্ষ ও সহিংসতা বাড়ছে। এসব সংঘর্ষে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এ ছাড়া আচরণবিধিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে রাস্তা বন্ধ করে চলছে নির্বাচনী সভা-সমাবেশ। আবার কোথাও সড়কের ওপরে গড়ে উঠেছে নির্বাচনী অফিস। বৈদ্যুতিক খুঁটি ও দেয়ালে আঠা দিয়ে লাগানো হচ্ছে পোস্টার। আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক প্রার্থীকে শোকজ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এর মধ্যে কিছু প্রার্থীকে একাধিকবার শোকজ করা হয়েছে। যারা ইসির সতর্কে সাড়া না দিয়ে ধারাবাহিকভাবে আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন, তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে বলে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

গতকাল শনিবার নির্বাচন কমিশনার আনিছুর রহমান বলেছেন, ‘আমাদের কাছে ইতিমধ্যে তথ্য এসেছে। এ বিষয়ে আজ রবিবার ইসির পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত আসতে পারে। যারা আচরণবিধি লঙ্ঘন করেছেন, তাদের কারও কারও ক্ষেত্রে প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে।’

সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থক মারা গেছেন। এ ধরনের ঘটনা অনাকাক্সিক্ষত। বিধি লঙ্ঘনে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না, প্রার্থিতা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্তে চলে যাব আমরা।’

স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোথাও কোথাও মাঠে দাঁড়াতে পারছেন না, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী অনেকেই আচরণবিধি মানছেন নাÑ এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন জেলা ঘুরে এসেছি। আচরণবিধি বাস্তবায়ন হচ্ছে। আজও (শনিবার) আমরা কিছু কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করেছি। আরও কিছু তথ্য চেয়েছি। আগামীকাল (আজ রবিবার) আরও কিছু তথ্য পেলে দেখবেন যে কিছু কঠোর সিদ্ধান্তে চলে যাব।’

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রার্থী বা রাজনৈতিক দলকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতে পারে। কমিশন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা দলকে ২০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা জরিমানা করতে পারে বা প্রার্থিতা বাতিল করতে পারে।

ইতিমধ্যে কারণ দর্শানোর জন্য তলব করা হয়েছে ক্ষমতাসীন দলের কয়েকজন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীকে। এ ছাড়া কিছু সংসদ সদস্যও রয়েছেন। শুধু তলব নয়, অভিযুক্ত কারও কারও বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট এলাকার নির্বাচন কর্মকর্তাদের মামলা করারও নির্দেশ দিয়েছে ইসি। এ ছাড়া কয়েকটি আসনে প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে কমিশন। বরগুনা-১ আসনের বর্তমান এমপি ও আওয়ামী লীগ প্রার্থী ধীরেন্দ্র দেবনাথ, গাজীপুর-৫ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস মো. মাজেদুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে গত ১৮ ডিসেম্বর প্রতীক বরাদ্দের পর নির্বাচনী প্রচারের শুরু থেকে বিভিন্ন সংসদীয় আসনে প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি জায়গায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ জায়গায় হামলা হচ্ছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কর্মীদের ওপর।

সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। এ নিয়ে তাকে তিনবার নোটিস দেওয়া হয়েছে। হামলার ঘটনায় কুমিল্লা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। একই সঙ্গে আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই তদন্ত প্রতিবেদন নির্বাচন কমিশন কার্যালয়ে পাঠানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

নৌকার প্রতিকৃতি তৈরি করে আলোকসজ্জা ও বৈদ্যুতিক খুঁটিতে ফেস্টুন লাগিয়ে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে পাবনা-৫ (সদর) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত ‘নৌকা’ প্রতীকের প্রার্থী ও সংসদ সদস্য গোলাম ফারুক প্রিন্সকে শোকজ করেছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। আজ বেলা সাড়ে ১১টায় উপস্থিত হয়ে বা প্রতিনিধির মাধ্যমে লিখিত ব্যাখ্যা দিয়েছে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটি।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যান চলাচল ও জনসাধারণের চলাচলের পথ বন্ধ করে সভা করার অভিযোগে ঢাকা-১৯ আসন (সাভার-আশুলিয়া) স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য তালুকদার তৌহিদ জং মুরাদকে আচরণবিধিভঙ্গের দায়ে শোকজ নোটিস দিয়েছে নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটি। এ ছাড়া ট্রাক ও মোটরসাইকেল ব্যবহার করে শোডাউন করারও অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে কুষ্টিয়ায় জোট প্রার্থীর বিরুদ্ধে কুৎসা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগে আওয়ামী লীগ নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থীকে কারণ দর্শাও নোটিস দেওয়া হয়েছে। কুষ্টিয়া-২ (মিরপুর-ভেড়ামারা)-এর স্বতন্ত্র প্রার্থী মিরপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও সদ্য পদত্যাগী উপজেলা চেয়ারম্যান কামারুল আরেফিনকে শোকজ নোটিস পাঠানো হয়েছে। আজ বেলা ১১টায় নোটিসপ্রাপ্ত অভিযুক্ত মো. কামারুল আরেফিনকে লিখিত বক্তব্যসহ যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ প্রথম আদালতের বিচারক সশরীরে হাজির হয়ে ব্যাখ্যা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন আদালত পুলিশের পরিদর্শক মনিরুল ইসলাম।

এ ছাড়া টাঙ্গাইল-২ (গোপালপুর-ভূঞাপুর) আসনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ চার সংসদ সদস্য প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের জরিমানা করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহিমা বিনতে আখতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এর আগে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভূঞাপুর পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালিয়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের ৫ হাজার টাকা করে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

ভ্রাম্যমাণ আদালত সূত্রে প্রকাশ, অভিযানে জাতীয় পার্টির (লাঙ্গল) প্রার্থী হুমায়ুন কবির তালুকদার, আওয়ামী লীগের নৌকার প্রার্থীর অনুসারী, বাংলাদেশ কংগ্রেস পার্টির মো. রেজাউল করিমের (ডাব), গণফ্রন্ট মনোনীত গোলাম সারোয়ারের (মাছ) কর্মী-সমর্থককে ওই জরিমানা করা হয়।

প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া ও টাঙ্গাইল প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত