এবারের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়া সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা), আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) পোস্টারে দলগুলোর অস্তিত্বের সংকট চোখে পড়েছে। নির্বাচনে দল হিসেবে অংশ নিলেও দলীয় পরিচয় ছাপিয়ে তাদের পোস্টারে জায়গা করে নিয়েছে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক ও পরিচয়। পোস্টার করার ক্ষেত্রে চোখে পড়েছে দলীয় বিশৃঙ্খলাও।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ও তার মিত্ররা অংশ নেওয়ার পরও এই তিন দলকে যে আসনে ছাড় দিয়েছিল আওয়ামী লীগ বিএনপি না থাকার পরও এবার দলগুলোর আসন তার চেয়ে কমেছে।
১৪-দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাসদ নেতা রেজাউল করিম তানসেন ও ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা তাদের পোস্টারে দলীয় পরিচয়ই ব্যবহার করেননি। আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো জোটে না থেকেও জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু পোস্টারে নিজেকে ‘জাতীয় পার্টি মনোনীত’ ও ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ প্রার্থী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবারের নির্বাচনে জাপাকে যে ২৬টি আসন ছেড়ে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, তার মধ্যে চুন্নুর আসনটিও রয়েছে। আওয়ামী লীগ সমর্থিত লেখায় তাকে নিয়ে নিজ এলাকা ও সারা দেশে চলছে নানা সমালোচনা। এবারের নির্বাচনে ১৪-দলীয় জোটের শরিক জাসদ ৩টি, ওয়ার্কার্স পার্টি ২টি ও জাতীয় পার্টিকে (জেপি) ১টি আসন ছেড়েছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া নির্বাচনী সমঝোতা হিসেবে জাপাকে ২৬টি আসন ছেড়েছে ক্ষমতাসীনরা।
ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও রাজশাহী-২ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ফজলে ২০০৮ সাল থেকে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনেও তিনি জোটের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছেন। তার নির্বাচনী এলাকায় যে পোস্টার লাগিয়েছেন তাতে লেখা হয়েছে, ‘দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-২ আসনে ১৪ দল মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী ফজলে হোসেন বাদশাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিন’। পোস্টারের কোথাও তার দলীয় পরিচয় লেখা নেই। এমনকি তার পোস্টারে দলীয় সভাপতি রাশেদ খান মেননেরও ছবি নেই। ১৪-দলীয় জোটের প্রধান শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
ফজলে হোসেন বাদশা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সহসভাপতি (ভিপি) ছিলেন। দেশের রাজনীতিতেও তিনি ছোট দলের বড় নেতা হিসেবে পরিচিত। পোস্টারে দলীয় পরিচয় না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বাদশা এই প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘পোস্টারে দলীয় পরিচয় লেখাটা কি খুব দরকার ছিল? আমি নিজেকে দলীয় পরিচয়ের বাইরে নিয়ে সর্বজনীন পরিচয় দিতে পোস্টারে দলীয় পরিচয় উল্লেখ করিনি। যেহেতু দলমত-নির্বিশেষে সবাই আমাকে ভোট দিয়ে এমপি বানিয়েছে।’
ভোটের মাঠে ওয়ার্কার্স পার্টির পরিচয় ব্যবহার করলে ভোট কমে যাবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নতুন করে আমার পরিচয় দেওয়ার কিছু নেই। ৫০ বছর ধরে আমি ওয়ার্কার্স পার্টির রাজনীতি করছি।’
ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন জোট থেকে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেলেও পোস্টারে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করেছেন। তাদের দুজনের পোস্টারে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান ব্যবহার করা হয়নি। ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’ লেখা হয়েছে।
তবে দলটির সব প্রার্থীর পোস্টারে ঐক্য নেই। কারও পোস্টারে ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগান ব্যবহার করা হয়েছে। কেউ ‘আল্লাহ সর্বশক্তি মান’, ‘কেউ লিখেছেন সৃষ্টিকর্তা মহান’। ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ লেখা রয়েছে কারও কারও পোস্টারে। একইভাবে প্রার্থীরা কেউ কেউ দলীয় প্রধান রাশেদ খান মেননের ছবি ব্যবহার করলেও অনেকেই এড়িয়ে গেছেন।
এ বিষয়ে ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, প্রার্থীরা দলীয় নেতাদের চাপ, ভোটের কৌশল, সাধারণ জনতার মন বুঝে ভিন্ন ভিন্ন স্লোগান ব্যবহার করছেন। ভোটের মাঠে এসব হয়। পোস্টার নিয়ে দলীয় কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল কি না এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্র থেকে নির্দেশনা থাকলেও অনেকেই তা মানছেন না। বিষয়টি আলোচনায় তুলব।’
জোটের প্রার্থী জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুর পোস্টারে লেখা হয়েছে, ‘১৪-দলীয় জোট নেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মনোনীত ১৪-দলীয় প্রার্থী জাতীয় নেতা, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুকে নৌকা প্রতীকে ভোট দিন’। তিনি জোটের প্রধান শেখ হাসিনার ছবি ব্যবহার করেছেন এবং স্লোগান রেখেছেন ‘শ্রমজীবী-কর্মজীবী-পেশাজীবী জনতার জয় হোক’। পাশাপাশি রেখেছেন ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’।
জোটের প্রার্থী হিসেবে লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে মনোনয়ন পাওয়া জাসদ নেতা মোশাররফ হোসেন পোস্টারে দলীয় পরিচয় ব্যবহার করেননি। এমনকি দলীয় প্রধান ইনুর কোনো ছবিও ব্যবহার করেননি।
মোশাররফ হোসেন সাবেক এমপি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি তার পোস্টারে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ মনোনীত (১৪-দলীয়) লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী মোশাররফ হোসেনকে নৌকা মার্কায় ভোট দিন’। তিনি তার পোস্টারের শুরুতে আল্লাহ সর্বশক্তিমান লিখেছেন এবং স্লোগান ব্যবহার করেছেন ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাসদের সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘সম্ভবত এটা ভুল করে করেছেন। আমি মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে কথা বলব।’
দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের সুযোগ থাকার পরও কেন জোটের প্রতীকে নির্বাচন করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো দলের চেয়ে জোট বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জোটের প্রয়োজনেই আমরা জোটের প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি।’
জেপির চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জোট প্রার্থী হিসেবে পিরোজপুর-২ আসনে নির্বাচন করছেন। তিনি পোস্টারে নিজের পরিচয় দিয়েছেন, ১৪-দলীয় জোট প্রার্থী ও জেপি চেয়ারম্যান। সাতবারের এই সংসদ সদস্য এবারই প্রথম নিজ দলীয় প্রতীক বাইসাইকেলের পরিবর্তে নৌকা প্রতীক নিয়েছেন।
এবারের নির্বাচনে জাপা এককভাবে অংশ নিচ্ছে। তারপরও জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু তার পোস্টারে ‘আওয়ামী লীগ সমর্থিত’ কথাটি ব্যবহার করেছেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ইতিমধ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, দলীয় নির্দেশে স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করলেও জাপা প্রার্থীকে সমর্থন কিংবা তার পক্ষে কাজ করার কোনো নির্দেশনা আসেনি।
ফেনী-৩ আসনের জাপা প্রার্থী মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী নিজেকে মহাজোট মনোনীত প্রার্থী হিসেবে পোস্টারে পরিচয় দিয়েছেন। পাশাপাশি পোস্টারে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি বাম পাশে এবং জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের ছবি ডান পাশে ব্যবহার করেছেন। জাপা কো-চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-৫ আসনের প্রার্থী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ পোস্টারে তার কোনো দলীয় পরিচয় ব্যবহার করেননি।
ময়মনসিংহ-৫ (মুক্তাগাছা) ও নীলফামারী-৩ আসনের জাপার প্রার্থী যথাক্রমে সালাহউদ্দিন আহমেদ মুক্তি ও রানা মোহাম্মদ সোহেল পোস্টারে জাতীয় পার্টি মনোনীত ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত উল্লেখ করেছেন। সমঝোতার ২৬টি আসনের মধ্যে তারাও রয়েছেন।
মুক্তাগাছা শহর আওয়ামী লীগ সভাপতি আরব আলী বলেন, ‘পোস্টারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত লেখা ব্যবহার করার আগে প্রার্থীর পক্ষ থেকে আমাদের কারও কাছে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি।’
চুন্নু ও মুক্তির পোস্টারে বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম লিখলেও মাসুদ ও রানার পোস্টারে লেখা হয়েছে ‘আল্লাহ সর্বশক্তিমান’।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমার পোস্টারটি আওয়ামী লীগের কিছু শুভাকাক্সক্ষী বানিয়ে দিয়েছেন। আমি নামিয়ে ফেলতে অনুরোধ করেছি। জাপার প্রার্থীর পোস্টারে আওয়ামী লীগ সমর্থিত লেখার কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি নিয়ে আমরা প্রার্থীদের নির্দেশনা দেব।’
সুজনের সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, যেসব ছোট দল বড় দলের সঙ্গে জোট করেছে বা বড় দলের পরামর্শ ও নির্দেশে রাজনীতি করেছে, একটা সময় পর তারা রাজনীতিতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। এই দলগুলোর নিজস্ব সত্তা হারিয়ে যায় এবং বড় সঙ্গীর মধ্যে হারিয়ে যায়, ফলে তাদের জনসমর্থন ও শক্তি ক্রমান্বয়ে ক্ষয় হতে থাকে।
তিনি বলেন, ‘কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আওয়ামী লীগের সঙ্গে, এখন সেই কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য বাম দলগুলো প্রায় বিলুপ্ত। ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ ও জাতীয় পার্টিও একই পথে হাঁটছে।’
