‘আমি শেখ হাসিনার প্রার্থী আমি ভারতের প্রার্থী’

আপডেট : ২৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:১২ এএম

মেহেরপুর-১ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী (ট্রাক) ও আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য প্রফেসর আবদুল মান্নান এক সরকারি কর্মকর্তাকে ফোনে সতর্ক করে বলেছেন, ‘আমি শেখ হাসিনার প্রার্থী। এটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। আমি ভারতের প্রার্থী। এটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। আমি এখানে হারার জন্য আসিনি। সাবধান হয়ে যাও তুমি।’ মোবাইলের এই অডিও ক্লিপ সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে।

জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন (নৌকা) এই আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী। ১ মিনিট ৫ সেকেন্ডের অডিওতে আবদুল মান্নান মেহেরপুর সদর উপজেলা জেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা অলোক কুমার দাসকে মোবাইলে যে কথা বলেছেন, তা হুবহু তুলে ধরা হলো, ‘হ্যালো ডাক্তার অলোক, (পাশে আওয়াজ) এই আস্তে ধমক। আমি প্রফেসর আবদুল মান্নান কথা বলছি। জি স্যার। তুমি বাইরে থেকে এসে মেহেরপুরে বেশ আরামেই আছো। বাড়িঘর করে পয়সা-টাকা অনেক কামাই করেছো। আমি কিন্তু যেমন ভালো লোক, তেমনি খারাপ লোক। তোমাকে মন্ত্রী প্রমোশন করেনি। বাংলাদেশ গভর্নমেন্ট তোমার প্রমোশন করি দিছে। জবাব ইয়েস। মন্ত্রীকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে যদি আর একটা কথা শুনি, মন্ত্রীকে ভোট দেওয়ার ব্যাপারে, তাহলে আমি এমপি হই আর না হই, তোমার মেহেরপুরের বাস আমি উঠিয়ে দেব। আর তুমি যদি সাবধান হয়ে যাও, তাহলে আমার প্রিয় পাত্র হয়ে থাকবে। এইটুকু তোমাকে আমি বললাম। তুমি পারলে তোমার মন্ত্রীকে বলো। পারলে তোমার যেখানে শেখ হাসিনাকে বলো। আমি শেখ হাসিনার প্রার্থী। এটা তোমাকে মনে রাখতে হবে। আমি ভারতের প্রার্থী। আমি এখানে হারার জন্য আসিনি। সাবধান হয়ে যাও তুমি। আমি তোমার কোনো কথা শুনব না। আমি যে রিপোর্ট পেয়েছি। আমি খুব অসন্তুষ্ট তোমার ওপরে। তুমি সাবধান হয়ে যাও। জবাব আচ্ছা, আচ্ছা ওকে।’ ১৭ ডিসেম্বর আবদুল মান্নান তাকে ফোনে এই কথাগুলো বললে ডা. অলোক বিষয়টি আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে জানান এবং অডিওটি তাকে দেন। এরপর অডিওটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়ে পড়ে।

বিষয়টি রিটার্নিং অফিসার বা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লিখিত অভিযোগ আকারে গোপনীয় ডকুমেন্টসটি না দিয়ে জনপ্রশাসনকে মন্ত্রীকে অডিও রেকর্ডটি কেন দিলেন প্রশ্নের জবাবে ডা. অলোক কুমার দাস বলেন, ‘আমি কোনো ঝামেলায় পড়তে চাইনি। বিষয়টি সাধারণ ঘটনা বলে মনে করি। আমার ফোনে অটোকল রেকর্ডিং হয়। আমি শান্তিপ্রিয় মানুষ। শান্তিতে থাকতে চাই। এ কারণে কাউকে কোনো অভিযোগ জানাইনি। আমি শুধু আওয়ামী লীগের প্রার্থী জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেনকে বিষয়টি জানিয়েছি। কারণ তিনি (ফরহাদ) আমার অভিভাবক।’ রিটার্নিং কর্মকর্তা অডিওটি মেহেরপুরের দায়রা জজ আদালতের যুগ্ম জেলা জজ ও নির্বাচনী অনুসন্ধান কমিটির সভাপতি মো. কবির হোসেনকে দিয়েছেন বলে শুনেছি।

অভিযোগের বিষয়ে প্রফেসর আবদুল মান্নান বলেন, ‘একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়ে অলোক কুমার দাস সারা দিন প্রতিমন্ত্রীর বাসায় বসে থাকেন। অলোক নৌকার পক্ষে ভোট চেয়ে বেড়াচ্ছেন। কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে এবং নিজের চেম্বার প্র্যাকটিস করাকালে তিনি রোগীদের নৌকায় ভোটদান করতে বলে বেড়াচ্ছেন। বলছেন, নৌকায় ভোট না দিলে চিকিৎসা দেবেন না। গ্রামের মানুষজন ভোটাররা অসংখ্যবার ডা. অলোকের এই কা- আমাকে জানান। এ কারণে অলোককে বোঝানোর জন্য আমি ফোন দিয়েছিলাম। এটি উভয়ের পার্সোনাল প্রোপার্টি ছিল। কিন্তু এটি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিকৃত আকারে ছড়ানো হয়েছে। প্রতিপক্ষ প্রার্থী আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করার জন্য এ কাজ করেছেন।’

‘মূলত বলেছি আমি ভারতের প্রার্থী না। অথচ “না” শব্দটি কেটে ফেলা হয়েছে। এখন এই ইস্যুটিকে পুঁজি করে প্রতিপক্ষ প্রার্থী জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আমাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়ে প্রকাশ্যে নির্বাচনী সভায় বক্তব্য দিয়ে বেড়াচ্ছেন।’

এ ব্যাপারে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মেহেরপুর-১ আসনের নৌকা প্রার্থী ফরহাদ হোসেন বলেন, ‘প্রফেসর আবদুল মান্নান যেটি করেছেন তা নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘন। উনি সুশীলসমাজের প্রতিনিধি হয়ে এমন কথা বলতে পারেন না। আর উনি নিজেকে প্রধানমন্ত্রী ও ভারতের প্রার্থী দাবি করে যে কথা বলেছেন সেটা মিথ্যাচার ছাড়া কিছুই না। আমি বিষয়টি নিয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ করব বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

মেহেরপুর জেলা প্রশাসক জেলা রিটার্নিং অফিসার শামিম হাসান জানান, ‘তিনি বিভিন্ন মাধ্যমে বিষয়টি জেনে তা নির্বাচন অনুসন্ধান কমিটির প্রধান যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ কবির হোসেনকে জানিয়েছি। তারা পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত