দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের বাকি আর মাত্র ১০ দিন। প্রতীক বরাদ্দের পর সারা দেশের মতো রাজধানীর ২০টি সংসদীয় আসনের প্রার্থীরাও নেমে পড়েছেন মাঠে। তবে এখনো ঠিক জমেনি রাজধানীর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। রাজধানীর বাইরে বেশ কিছু সংসদীয় আসনে বিএনপিবিহীন এ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থীর সঙ্গে স্বতন্ত্র প্রার্থীর লড়াই জমে উঠলেও তেমনটি দেখা যাচ্ছে না ঢাকায়। প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নিরুত্তাপ এ ভোট নিয়ে তাই আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ ভোটারদের কারও তেমন কোনো আগ্রহ নেই। এমনকি দু-একজন বাদে প্রার্থী চেনেন না অধিকাংশ ভোটার।
গত কয়েক দিন ঢাকার কয়েকটি সংসদীয় আসনের বিভিন্ন স্থান ঘুরে এমন চিত্রই দেখা গেছে। ঢাকা জেলা ও মহানগরের ২০টি আসনে প্রার্থী রয়েছেন ১৫৬ জন, যাদের মধ্যে ২১ জন স্বতন্ত্র। নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনে থাকা বিএনপি ও তার সঙ্গী দলগুলো নির্বাচন বর্জন করছে। এর বাইরে বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী আন্দোলন নির্বাচন বর্জন করে আন্দোলনের মাঠে রয়েছে। ফলে ঢাকার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর বিপক্ষে কয়েকটি আসনে যারা প্রার্থী হয়েছেন তাদের শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবছেন না সাধারণ মানুষ।
যদিও অলিগলি নির্বাচনী পোস্টারে ছেয়ে গেছে। আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তবে অন্য দল বা স্বতন্ত্রদের প্রতীক সংবলিত পোস্টার নেই বললেই চলে। এমন অবস্থাকে নির্বাচনী উৎসব বলতে নারাজ সাধারণ ভোটাররা।
তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এলাকায় প্রতিদিনই নৌকার পক্ষে মিছিল হচ্ছে। কোথাও কোথাও প্রার্থীর পক্ষে বাসাবাড়িতে গিয়ে ভোটও চাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সন্ধ্যার পর শোডাউনও দেখছেন তারা। কিন্তু অন্য কোনো প্রতীকের সমর্থনে মিছিল বা প্রচার-প্রচারণা কেউ দেখেননি।
রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-৭ আসন। মহানগরের বংশালের একাংশ, কোতোয়ালির একাংশ, চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ ও ধানমন্ডির একাংশ নিয়ে গঠিত এ আসন। এখানে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৪৩ হাজার ১২৯ জন। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৬৫০, নারী ভোটার ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৮ জন। এই আসনে সাতজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন নৌকার সোলায়মান সেলিম, জাতীয় পার্টির সাইফুদ্দিন মিলন এবং আওয়ামী লীগ থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়া হাসিবুর রহমান মানিক। এর বাইরে ন্যাশনাল পিপলস পার্টি, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি ও বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের প্রার্থীও রয়েছে। তবে তাদের চেনেন না বলে জানান স্থানীয়রা ভোটাররা।
আসনটিতে সর্বশেষ সংসদ সদস্য ছিলেন নৌকার বর্তমান প্রার্থী সোলায়মানের বাবা হাজী সেলিম। ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং ২০১৮ সালে নৌকা প্রতীকে জয়লাভ করেছিলেন তিনি। আসনটির কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি অলিগলি নৌকার পোস্টারে ছেয়ে গেছে। এর বাইরে স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিবুর রহমান মানিক ও জাতীয় পার্টির কিছু পোস্টার দেখা গেছে। অন্যদিকে সুপ্রিম পার্টির প্রার্থীর কয়েকটি ব্যানার ছাড়া কোনো পোস্টার চোখে পড়েনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এ আসনে নৌকা, লাঙ্গল ও ঈগল ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীর পোস্টার-ব্যানার তাদের নজরে আসেনি। এমনকি নৌকা ও ঈগল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী ছাড়া অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট চাইতে আসতে দেখেননি। তবে পোস্টার ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ তুলেছেন এ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী হাসিবুর রহমান মানিক। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পোস্টার লাগানোর মতো কোনো জায়গা রাখা হয়নি। যেটুকু জায়গা আছে সেখানে আমাদের পোস্টার লাগালেও রাতের আঁধারে ছিঁড়ে ফেলা হয়। এ নিয়ে অনুসন্ধান কমিটির কাছ অভিযোগ জানিয়েছি। তারা কী ব্যবস্থা নেয় সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি।’
একই অবস্থা ঢাকা-৬ আসনে। ওয়ারী, গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, কোতোয়ালি ও বংশালের একাংশ নিয়ে এ আসনটি গঠিত। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আসনটি জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদকে ছেড়ে দেওয়া হলেও এবার নিজেদের জন্য রেখেছে আওয়ামী লীগ। এ আসনে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সাঈদ খোকন। এখানে সাঈদ খোকনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী আছেন ছয়জন। তবে কোনো স্বতন্ত্র প্রার্থী নেই। এর মধ্যে ন্যাশনাল পিপলস পার্টির হামিদুর রেজা খান ভাসানী (আম), তৃণমূল বিএনপির কাজী সিরাজুল ইসলাম (সোনালি আঁশ), বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের আক্তার হোসেন (ছড়ি), গণফ্রন্টের আমিনুল ইসলাম সরকার (মাছ), ইসলামী ঐক্যজোটের রবিউল আলম মজুমদার (মিনার) এবং জাতীয় পার্টির জেপির সৈয়দ নাজমুল হুদাও (বাইসাইকেল) নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
আসনটির বেশ কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, তৃণমূল বিএনপি, গণফ্রন্ট ও জেপির প্রার্থী বাদে কারও কোনো পোস্টার বা ব্যানার নেই। এমনকি তাদের প্রচার-প্রচারণায়ও দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
নবাবপুর রোডের মোটর পার্টস ব্যবসায়ী জাহিদ খান বলেন, ‘নৌকার দু-একটি প্রচার মিছিল দেখেছি। নৌকা ছাড়া নির্বাচনের মাঠে আর কেউ নেই। থাকলে তো দেখতে পেতাম।’
ঢাকা-৮ আসনটি অবস্থানগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ আসনের এলাকার মধ্যে রয়েছে মতিঝিল, পল্টন ও রমনা থানা। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন নৌকা নিয়ে পাস করেন এ আসনে। এবার আওয়ামী লীগ প্রার্থী দেওয়ার পর মেনন চলে যান নিজের এলাকা বরিশালে। আসনটিতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হয়েছেন আওয়মী লীগের যুগ্ম সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দীন নাছিম। এর বাইরেও আরও নয়জন প্রার্থী রয়েছেন। এ আসনের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ স্থানেই নৌকা মার্কার পোস্টারে ছেয়ে ফেলা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো প্রতীকের পোস্টার চোখে পড়েনি। মৌচাক-মালিবাগ এলাকার কোনো কোনো গলিতে কোনো পোস্টারই লাগানো হয়নি। দুয়েকটি স্থানে নৌকা মার্কার নির্বাচনী ক্যাম্প চোখে পড়লেও অন্য প্রার্থীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি।
১৯ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটার ও ইস্কাটন গার্ডেনের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গতকাল (রবিবার) নাছিম ভাই আসছিল। এর বাইরে কাউকে আসতেও দেখি নাই, পোস্টারও নাই।’
২০ নম্বর ওয়ার্ডের আরেক বাসিন্দা ও স্থানীয় ভোটার রণজিৎ পাল বলেন, ‘আগের ভোটগুলোতে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করত তাদের সবাইকে চিনতাম। এবার যিনি নৌকার প্রার্থী হয়েছেন তাকে চিনি। এর বাইরে নাকি আরও ছয়-সাতজন প্রার্থী আছেন, কিন্তু তাদের চিনি না। পল্টনে মোমবাতি মার্কার একটা পোস্টার দেখেছিলাম, এর বাইরে কারও পোস্টারও দেখিনি।’
