রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই গত প্রায় দুই বছর ধরে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে রয়েছে। ডলার সংকটে বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি মন্থর। রিজার্ভ ঠেকছে তলানিতে। এমন সংকটকালে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণের প্রতিশ্রুতি দিলেও অর্থছাড় কমিয়ে দিয়েছে বিদেশি ঋণদাতা সংস্থাগুলো। গত অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) যেখানে অর্থছাড় হয়েছিল ২৪৬ কোটি ডলারের বেশি, চলতি অর্থবছরের একই সময়ে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ২১২ কোটি ডলারে। এ সময়ে অর্থছাড় কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
অন্যদিকে অর্থছাড় কমিয়ে দিলেও এসব দাতাসংস্থাতে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩৪ শতাংশ বেশি। গতকাল বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে ২১১ কোটি ৭০ লাখ ডলারের অর্থছাড় করতে পেরেছে বাংলাদেশ। এরমধ্যে ২০৪ কোটি ডলার ঋণ, বাকি প্রায় ৭ কোটি ডলার অনুদান। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্থছাড়ের পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি ২৪ লাখ ৮০ হাজার ডলার। বছরের ব্যবধানে অর্থছাড় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ।
ডলার সংকটের কারণে বাংলাদেশে বিদেশি ঋণের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। নভেম্বর শেষে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়নে হার ১৭ শতাংশ, যা ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পর সর্বনিম্ন। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দের ১৭ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে সরকারের মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো, যা গত ৭ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন।
জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সরকারের অর্থ ব্যয় কমেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের জুলাই-নভেম্বরের তুলনায় চলতি অর্থবছরের একই সময়ে প্রায় ২৬৫ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে। গত অর্থবছরে একই সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ এবং ২০২১-২২ অর্থবছরের বাস্তবায়ন হার ছিল ১৮ দশমিক ৬১ শতাংশ। এর আগে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল ১৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
ইআরডির গতকাল প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ডলার সংকটের এ সময়ে ঋণ পরিশোধের চাপেও নাকাল বাংলাদেশ। চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে ১৩৩ কোটি ২১ লাখ ৮০ হাজার ডলারের। বাংলাদেশি মুদ্রায় তা ১৪ হাজার ৬৪৪ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এর মধ্যে মূল ছিল ৭৬ কোটি ৯৯ লাখ ডলার বা ৮ হাজার ৪৬৩ কোটি টাকা। সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৫৬ কোটি ২২ লাখ ডলার বা ৬ হাজার ১৮১ কোটি টাকা।
অথচ গত বছরের একই সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছিল মাত্র ৮৮ কোটি ডলার বা ৮ হাজার ৪৩০ কোটি টাকা। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় ঋণ পরিশোধ বেড়েছে ৩৪ শতাংশ।
গত বছর সুদ পরিশোধ করতে হয়েছিল মাত্র ২৩ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এবার করতে হয়েছে ৫৬ কোটি ২২ লাখ ডলার। গত এক বছরে শুধু সুদ পরিশোধই বেড়েছে ৫৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।
ইআরডির অর্থছাড়ের চিত্রে দেখা যায়, সব ঋণদাতা গোষ্ঠীই তাদের অর্থছাড় কমিয়ে দিয়েছে। আমেরিকা ও জাপান ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে অর্থছাড় করেছিল ৭৪ কোটি ২৭ লাখ ডলার, এবার এ দুটি দেশ অর্থছাড় করেছে মাত্র ৬১ কোটি ডলার। বিশ^ব্যাংকের আইডিএ প্রোগ্রাম থেকে বাংলাদেশ গত বছরের একই সময় অর্থছাড় করেছিল ৪২ কোটি ২৫ লাখ ডলার, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ কোটি ৭৯ লাখ ডলারে।
অন্য সংস্থাগুলো অর্থছাড় কমিয়ে দিলেও সবচেয়ে বড় ঋণদাতা সংস্থাগুলোর একটি এডিবি চলতি অর্থবছর অর্থছাড় কিছুটা বাড়িয়েছে। চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সংস্থাটি অর্থছাড় করেছে ৪৪ কোটি ৪২ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৩১ কোটি ৯৪ লাখ ডলার। একইসঙ্গে ইউরোপ থেকেও অর্থছাড় বেড়েছে। চলতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে অর্থছাড় হয়েছে ৪৫ কোটি ২৩ লাখ ডলার, গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ২৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার।
চলতি অর্থবছর অর্থছাড় কমলেও আগের বছরের তুলনায় ঋণ প্রতিশ্রুতি বেড়েছে ৯২ শতাংশের বেশি। চলতি অর্থবছর বিভিন্ন ঋণদাতা গোষ্ঠীর কাছ থেকে ঋণের প্রতিশ্রুতি এসেছে ৫৮৫ কোটি ৯১ লাখ ডলারের। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল ৪৬ কোটি ১৩ লাখ ডলার।
এদিকে আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বৈদেশিক সহায়তার বরাদ্দ থেকে অর্থ ব্যয় বাড়লেও কমেছে সরকারি তহবিলের ব্যয়। অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে সরকারি তহবিলের বরাদ্দ থেকে অর্থ ব্যয়ের হার ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ, যা গত অর্থবছরে ছিল ১৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ। চলতি বছরের জুলাই-নভেম্বর সময়ে বৈদেশিক সহায়তা বরাদ্দের ১৯ দশমিক ১৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয়েছে, যা এর আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, চলতি অর্থবছরের নভেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সংস্থার নিজস্ব তহবিলের বরাদ্দ থেকে ব্যয় হয়েছে ১৩ দশমিক ২৩ শতাংশ, যা গত বছরের একই সময়ে ছিল ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ।
