সমাজে আলেমদের অবদান

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:২৩ এএম

আলেমরা দুনিয়াতে নবীদের প্রতিনিধিত্ব করেন। নবীদের অনুপস্থিতিতে তাদের সব কাজ আঞ্জাম দেন। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ। -সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৪১

তারা নবীদের ওয়ারিশ জ্ঞানে-গুণে, আদবে-আখলাকে, ভদ্রতায়-শিষ্টাচারে, আচার-আচরণে ও ন্যায়-ইনসাফে। নবীরা ধর্মীয়, সমাজিক, রাষ্ট্রীয়, বৈশ্বিক ক্ষেত্রে যত ধরনের কাজ করেছেন সবক্ষেত্রেই আলেমরা নবীদের ওয়ারিশ। নবীরা যত ধরনের কাজ করেছেন, তাদের অনুপস্থিতিতে আলেমরা সবগুলো পরিচালনা করবেন। সভ্য সমাজ বিনির্মাণে নবীরা যেসব ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন। আলেমরাও সেসব ক্ষেত্রে অবদান রাখবেন। সভ্য সমাজ বিনির্মাণে আলেমদের অবদান চিত্রায়িত করা হলো।

আদর্শ জাতি গঠনের প্রধান কারিগর : পরিশুদ্ধ, আদর্শ জাতি গঠনে আলেমদের অবদান অনস্বীকার্য। তাদের নৈতিকতা ও শুদ্ধতার শিক্ষা, আদর্শ জাতিগঠন ও সমাজ বিনির্মাণে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসুল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তার আয়াতসমূহ, তাদের পবিত্র করেন এবং শিক্ষা দেন কেতাব ও হেকমত।’ -সুরা জুমআ : ২

নবীজির অনুপস্থিতিতে এই কাজটি আলেমরা করে থাকেন। মসজিদের মিম্বরে, ওয়াজের ময়দানে, দরবারে, খানকায়, সেমিনার ও সিম্পোজিয়ামে জনসাধারণের জন্য নসিহতমূলক বক্তৃতায় এবং স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসে তাদের সঞ্জীবনী আলোচনা ছাত্রদের নৈতিকতাসম্পন্ন আদর্শ ব্যক্তি হতে আত্মার খোরাক হিসেবে কাজ করে।

সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধাদান : ভালো কাজে আদেশ এবং খারাপ কাজে বাধা দেওয়া সব মানুষের নৈতিক এবং ইমানি দায়িত্ব হলেও এই কাজ পূর্ণাঙ্গ নিষ্ঠার সঙ্গে আলেমরাই পালন করেন। আল্লাহ বলেন, তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহ্বান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভালো কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে।’ -সুরা আলে ইমরান : ১০৪

আর করবেন-ই না বা কেন? তাদের প্রতি মহান আল্লাহর হুকুম রয়েছে যে, আলেমরাই জাতিকে সর্তক করবেন। তাদের ভালো-মন্দ বোঝাবেন। সঠিক পথ দেখাবেন। আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক দলের একটি অংশ কেন বের হলো না, যাতে তারা দ্বীনের জ্ঞান লাভ করে এবং সতর্ক করে স্বজাতিকে, যখন তারা তাদের কাছে আসবে, যেন তারা বাঁচতে পারে।’ -তওবা : ১২২

শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান : মুসলিম জাতিকে শিক্ষিত করতে যুগ যুগ ধরে আলেমরাই অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছেন। আমরা যদি দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে তাকাই তাহলে দ্বিধাহীন চিত্তে এই কথা স্বীকার করব যে, গোটাদেশে বিশেষত গরিব-অসহায় ও প্রান্তিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাব্যবস্থা আলেমদের দ্বারাই সাধিত হচ্ছে। তারা তাদের ধর্মীয় ও জাগতিক উভয় শিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। নবী কারিম (সা.)-এর বিদায় হজের সেই আদেশকে কার্যকর করছেন। তিনি বলেছিলেন, আমার পক্ষ থেকে একটি বাণী হলেও অন্যের কাছে পৌঁছে দাও। -সহিহ বোখারি : ৩৪৬১

জনসেবামূলক কাজ : প্রত্যেক আলেম তার গোটাজীবনকে কোনো না কোনো জনসেবামূলক কাজে উৎসর্গ করেন। কিন্তু তারা সেই সেবাকে মানুষের কাছে প্রকাশ করেন না বা করতে চান না। কারণ তারা জনসেবা করেন ইবাদত হিসেবে। আর মানুষ দেখান ইবাদত আল্লাহ কবুল করেন না। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, দুনিয়াবাসীর ওপর অনুগ্রহ করো, তাহলে আসমানের অধিপতি তোমার ওপর অনুগ্রহ করবেন। -সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৪১

জনসেবায় তারা রাসুলের এই কথাকে মূলনীতি মেনে চলেন। সেবার দ্বারা মানুষের প্রতি অনুগ্রহ করেন কিন্তু সেটাকে প্রকাশ করেন না।

সমাজে নৈতিকতার ভিত তৈরি : ধর্মই মানুষকে নৈতিকতার শিক্ষা দেয়। আর ধর্মীয় জ্ঞানের অধিকারী আলেমরা সেই শিক্ষাকে মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিয়ে মানুষের নৈতিকতার ভিত মজবুত করেন। আলেমরা সমাজকে শিক্ষা দেন, সদা সত্য কথা বলতে এবং মিথ্যা পরিহার করতে। নবী কারিম (সা.) বলেছেন, সত্য আত্মার জন্য শান্তিদায়ক আর মিথ্যা অশান্তিকারক। -সুনানে তিরমিজি : ২৫১৭

সতর্ক করেন মানুষকে ধোঁকা দিতে। বেঁচে থাকতে বলেন সুদ, ঘুষ ও সব ধরনের বাটপারি থেকে। উৎসাহিত করেন অন্যকে সাহায্য ও সহযোগিতা করতে। যেমন আল্লাহতায়ালা বলেন, কে সেই ব্যক্তি যে, আল্লাহকে (গরিব, অসহায়দের) উত্তম ঋণ দেবে, এরপর তিনি তার জন্য তা বহুগুণে বৃদ্ধি করবেন। -সুরা হাদিদ : ১১

সমাজে অপতৎপরতা রোধ : সমাজকে অপরাধমুক্ত করতে। অপরাধী ও কুচক্রী যারা সর্বদা সমাজে ফ্যাসাদ সৃষ্টির সুযোগ সন্ধানে থাকে কিন্তু নিজেদের নিরপরাধ ও শান্তিকামী বলে প্রকাশ করে। আল্লাহর ভাষায়, যখন তাদের বলা হয়, দুনিয়াতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না। তারা বলে, আমরাই মীমাংসাকারী। -সুরা বাকারা : ১১

আলেমরা এমন কুচক্রীদের ব্যাপারে সমাজকে সচেতন করেন। কুটিল লোকদের অপতৎপরতা থেকে সমাজকে রক্ষা করতে আলেমরা সর্বক্ষণ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করেন। মসজিদের মিম্বরে মিম্বরে জোরালো আওয়াজ তুলে অপতৎপরতা ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে দেশের জনসাধারণকে সতর্ক করেন। সতর্ক করেন এসবে যোগদান থেকে।

রাজনীতিতে আলেম সমাজ : রাজনীতি আমাদের সমাজ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সেই রাজনীতিকে নববি আদর্শে ফেরাতে এদেশের কিছু আলেম নিরলসভাবে কাজ করছেন। চেষ্টা করেছেন স্বচ্ছ রাজনীতি করতে এবং দেশের মানুষকে শেখাতে। এদের মধ্যে মোজাহেদে আজম আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী (রহ.), মোহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর (রহ.), শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.), মুফতি ফজলুল হক আমিনী (রহ.) অন্যতম। যারা এদেশে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির স্বপ্নদ্রষ্টা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত