দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি কূটনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যেই শেষ হলো ২০২৩ সাল। সবকিছু ঠিক থাকলে ৭ জানুয়ারি এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হবে। এবারের জাতীয় নির্বাচন ঘিরে অন্য যেকোনো বারের চেয়ে বিদেশিদের চাপ ছিল লক্ষণীয়। অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমাদের নানামুখী উদ্যোগ ও ‘আস্থাহীনতার’ কারণে কূটনৈতিক বড় চ্যালেঞ্জ নিয়েই শুরু হলো নতুন বছর। কূটনৈতিক বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচন ও অর্থনৈতিক ইস্যুতে গত বছরের চেয়ে আরও বেশি চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু হলো নতুন বছর। মার্কিন ভিসানীতির পর এখন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের বাংলাদেশের ওপর বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। নতুন বছরের প্রথম সপ্তাহটাই হবে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রথম ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বিশেষ করে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর দেখার বিষয় হচ্ছে, বিদেশিরা এ নির্বাচন কতটা স্বীকৃতি দেয় এবং তারা কী প্রতিক্রিয়া দেখায়। নির্বাচন-পরবর্তী যেকোনো বৈশ্বিক চাপ কূটনৈতিকভাবে সামাল দেওয়াটাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
তবে সরকারপক্ষ মনে করছে, যুক্তরাষ্ট্রসহ তাদের মিত্ররা দেশের নির্বাচন নিয়ে যে সক্রিয়তা দেখিয়েছে এবং তাদের যে প্রত্যাশার কথা বিভিন্ন সময়ে জানিয়ে এসেছে, তার ইতিবাচক জবাব পাবে ৭ জানুয়ারির নির্বাচনে। ফলে আপাতদৃষ্টিতে বছরের শুরুটা চরম কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে শুরু হলেও, নির্বাচনের পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে এটি ততটা প্রকট হবে না।
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনও নির্বাচন ঘিরে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করেছেন। সম্প্রতি এ বিষয়ে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, দেশের বিদ্যমান পরিস্থিতি বিশেষত নির্বাচনের পর পশ্চিমাদের পক্ষ থেকে কোনো নিষেধাজ্ঞা আসবে কি না, তা নিয়ে এখনই ভাবছে না সরকার। সরকারের লক্ষ্য সুষ্ঠু ভোট। এ নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের অঙ্গীকার রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র সচিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনের পরিবেশ শান্ত। জনগণের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হওয়ার পর নিষেধাজ্ঞা বা অন্য যাই আসবে, তা বাংলাদেশ অবশ্যই যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করতে পারবে। নির্বাচন, রাজনীতি, মার্কিন ভিসানীতি ও নিষেধাজ্ঞা নিয়ে এখনই চিন্তিত বা ভীত হওয়ার কিছু নেই। বিদেশি কাউকে সন্তুষ্ট করার জন্য নির্বাচন হচ্ছে না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামীতে কূটনৈতিক চাপ কতটা বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন হবে তা ৭ জানুয়ারির পর স্পষ্ট হবে। তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতিও (বিজিএমইএ) একই কথা বলেছে। বিজিএমইএ বলছে, কোনো কারণে বাংলাদেশের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এলে গার্মেন্টস শিল্পের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে।
তবে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, এতদিন শুধু পোশাকশিল্পের কথা বলা হলেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ওপরও এর প্রভাব পড়বে। কারণ বাংলাদেশের বিমান বহরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের তৈরি উড়োজাহাজই সবচেয়ে বেশি। নিষেধাজ্ঞা এলে এর যন্ত্রাংশ সরবরাহ বিঘ্নিত হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পশ্চিমারা দেশের মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও শ্রম অধিকারের ঘাটতির কথা বলে আসছে। এর ফলে শ্রম অধিকার ইস্যুটিও গুরুত্ব পাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে খাতওয়ারি নিষেধাজ্ঞার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। সম্প্রতি ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে একটি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পূর্বাভাস দিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বার্তা আসার পর থেকেই এ শঙ্কা তৈরি হয়েছে। আবার মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগে ২০২১ সালে র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। গত দুই বছরে অনেক দেন-দরবারের পরও সেই নিষেধাজ্ঞা ওঠেনি। আবার নতুন করে ভিসানীতি শ্রম অধিকার এবং বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার বিষয় আসছে।
ভিসানীতির নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, র্যাবের মতোই যেকোনো নিষেধাজ্ঞাই সুদূরপ্রসারী। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আওতায় কোনো নিষেধাজ্ঞা এলে তাতে অনেক কিছুই ঘটে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি হলে পরিবারের সদস্য এবং তার ওপর নির্ভরশীলদের সেই ঘানি টানতে হয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠান হলে তার ফরোয়ার্ড লিংকিং এবং ব্যাকওয়ার্ড লিংকিং দারুণভাবে প্রভাবিত হয়। অর্থাৎ ওই শিল্পের বিনিয়োগ, কাঁচামালের আমদানি এবং প্রস্তুতকৃত মালামালের বাজারজাতকরণ সিস্টেম ব্লক হয়ে যায়। এরই মধ্যে বাংলাদেশের নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু এবং শান্তিপূর্ণ করতে ঘোষিত ভিসানীতির প্রয়োগ শুরুর কথা জানিয়েছে ওয়াশিংটন। নাম-ঠিকানা প্রকাশ না করা হলেও ভিসানীতির আওতায় রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে পেশাজীবী পর্যায়ে দেশের বিভিন্নজনের দীর্ঘমেয়াদি ভিসা বাতিল এবং অনেকের ভিসার আবেদনই আটকে গেছে। কাজেই এটা একটা বড় চ্যালঞ্জে। এর বাইরে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনও একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে এবার য্ক্তুরাষ্ট্রের আগ্রহ অনেক বেশি। এরই মধ্যে দেশটি ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। শ্রম ইস্যুতে কথা বলতে শুরু করেছে। নির্বাচন নিয়ে সরকার যে প্রতিশ্রুতি দিয়ে আসছে, বিদেশিরা সেটা পর্যবেক্ষণ করছে। তারা নির্বাচন নিয়ে সতর্ক করে আসছে। দেশের বড় বিরোধীপক্ষ বিএনপি নির্বাচন করছে না। ফলে বছরের শুরু থেকেই রয়েছে কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।’
