‘কেউ কোনো খোঁজ খবর নেয়নি’

আপডেট : ০১ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৩৮ এএম

‘ঢাকার তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় বাসার ফেরার পথে গুলিবিদ্ধ স্বামী মারা যাওয়ার পর কেউ কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি আমাদের। বৃদ্ধ শাশুড়ি এবং একমাত্র মেয়েকে নিয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছি। পথে সন্ত্রাসীদের গোলাগুলিতে আমার স্বামীর মৃত্যুর ঘটনার দায় সরকার এড়াতে পারে কি? আমি এখন কী করব? যে গেছে সে তো চলেই গেছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। বৃদ্ধ মাকে নিয়ে কীভাবে দিন কাটাব?’ এই প্রতিবেদকের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে কাঁপা কণ্ঠে আক্ষেপ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন নিহত অ্যাডভোকেট ভুবন চন্দ্র শীলের স্ত্রী রত্না রানী শীল।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের বিজি প্রেস এলাকা দিয়ে ভুবন মোটরসাইকেলে করে গুলশান থেকে আরামবাগ বাসায় ফিরছিলেন। তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকায় ওই রাতে প্রাইভেট কার আরোহী এক শীর্ষ সন্ত্রাসীকে লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি গুলি চালায় একদল সন্ত্রাসী। সেই গুলি লেগেছিল ভুবনের মাথায়। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। পরে ওই রাতেই তাকে ধানম-ির পপুলার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়াইয়ের পর হার মানেন।

এই ঘটনা তখন বেশ চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। প্রায় তিন মাস পার হয়ে গেলেও ভুবনের পরিবারের কেউ খোঁজ-খবর নেয়নি, মেলেনি কোনো সহায়তা। এ ছাড়া জড়িত কাউকে পুলিশ এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

রতœা বলছিলেন, ‘বলতে লজ্জার কিছু নেই। স্বামী গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর হাসপাতালে ৬-৭ লাখ টাকার চিকিৎসা খরচের মধ্যে ভুবনের অফিস ও তার কলেজের অ্যাসোসিয়েশন থেকে ১ লাখ করে ২ লাখ টাকা সহায়তা করা হয়। বাকিটা আমাদের বহন করতে হয়েছে। এর ধাক্কা এখনো কাটাতে পারিনি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ভুবন তার মা-বাবার একমাত্র সন্তান ছিল। বৃদ্ধ শাশুড়ি ও মেয়েকে নিয়ে ফেনীতে বসবাস করছি। বৃদ্ধ মায়ের ওষুধপত্রের খরচ রয়েছে। এ ছাড়া মেয়ে এখন এইচএসসি প্রথম বর্ষে পড়ালেখা করছে। ফেনীতে একটি স্কুলে সামান্য বেতনে শিক্ষকতা করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছি।’

রত্না বলেন, ‘যেহেতু চলার পথে এ ঘটনা ঘটেছে। এখানে তো সরকার দায় এড়াতে পারে না। এটা সম্পূর্ণভাবে সরকারের দায়ভার নেওয়ার কথা ছিল। আমি বাদী হয়ে মামলা করতে চাইনি। চেয়েছিলাম সরকার মামলা করুক। কিন্তু সেখানে আমাদের মামলাটা করতে হয়েছে।’

মামলার বাদী হিসেবে পুলিশ আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল কি না প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ঘটনার কিছুদিন পর পুলিশ একদিন ফোন করেছিল। কিন্তু তখন অসুস্থ থাকায় কথা বলতে পারিনি। এরপর আর কখনো মামলার অবস্থা বা আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে যোগাযোগ করেনি পুলিশ।’

সুনির্দিষ্ট বা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি শুধু শুনেছি। কিন্তু কে দোষী বা কে করেছে, আমি দেখিনি, আমি জানি না। এ জন্য আমি এ বিষয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে চাই না। অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমি জড়াতে চাই না। যে যাওয়ার চলে গেছে। আমি আমার সন্তান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার দিন জামিনে সদ্য মুক্তি পাওয়া তারিক সাঈদ মামুন ছিলেন টার্গেট। মামুন মগবাজারের পিয়াসী বার থেকে বের হয়ে উবারের গাড়িতে করে তার দুই বন্ধুসহ শুক্রাবাদে বাসার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। পথে বিজি প্রেসের সামনে কয়েকটি মোটরসাইকেলে সন্ত্রাসীরা তার গাড়ির গতিরোধ করে। তারা মামুনকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করে। মামুনও তখন তাদের লক্ষ্য করে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলে, সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি ছোড়ে। এ সময় প্রায় ১৫-২০ রাউন্ড গুলির শব্দ পাওয়া যায়।

পুলিশের ধারণা, কারাগারে থাকা আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের নির্দেশে এ হামলার ঘটনা ঘটেছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও জানা যায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমন ও মামুন একসময় ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর ও তেজগাঁও এলাকার আতঙ্ক ছিলেন। তাদের গড়ে তোলা বাহিনীর নাম ছিল ‘ইমন-মামুন’ বাহিনী। তারা দুজনই চিত্রনায়ক সোহেল চৌধুরী হত্যা মামলা ছাড়াও সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের ভাই সাঈদ আহমেদ ওরফে টিপু হত্যা মামলার আসামি। ইমন কারাগারে থাকলেও ২৪ বছর জেলে থেকে মামুন জামিনে বের হন। কারাগারে থাকা অবস্থাতেই দুজনের বিরোধ দেখা দেয়। এই হামলার পেছনে ইমনের হাত রয়েছে বলে পুলিশের ধারণা। এ ঘটনার পর পুলিশ মারুফ বিল্লাহ ওরফে হিমেল নামে একজনকে গ্রেপ্তার করে দুই দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করে। কিন্তু এরপর তদন্তে ধীরগতি দেখা যায়।

এ ঘটনায় মামলার অগ্রগতির বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার উপপরিদর্শক বিএম রানা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ঘটনার পর সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীরা আত্মগোপন করে। তাদের সম্ভাব্য স্থানগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে। তারা নিয়ম অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছেন। তদন্তে কোনো ধীরগতি নেই। আসামিদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা হবে।

গ্রেপ্তার মারুফ বিল্লাহ জেলে নাকি জামিনে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘তার বিষয়ে এ মুহূর্তে আমার কাছে কোনো তথ্য নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত