সংসদ নির্বাচনের প্রচারণার শেষ সপ্তাহে এসে আবার নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিতে (জাপা)। দলটির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এবং মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে খুঁজে পাচ্ছেন না দলীয় প্রার্থীরা। শুধু তাই নয়, নির্বাচন পরিচালনা করতে জাপা যে কমিটি করেছে, সেই কমিটির সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ নেই জাপার দুই শীর্ষ নেতার।
জিএম কাদের গত শুক্রবার থেকে নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুর-৩-এ অবস্থান করছেন। অন্যদিকে মহাসচিব চুন্নু ইশতেহার ঘোষণার পর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতে নিজ এলাকা কিশোরগঞ্জে গিয়ে আর ঢাকায় ফিরে আসেননি। দলের চেয়ারম্যান ও মহাসচিবের এমন বিচ্ছিন্নতা নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে জাপার বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের।
শাসক দল আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় প্রার্থীদের ভোটে জেতাতে একের পর এক জনসভা করে যাচ্ছেন। সিলেট থেকে জনসভার মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন। এরপর বরিশাল, মাদারীপুর, রংপুর, ফরিদপুরে তিনি জনসভায় যোগ দিয়ে দলীয় প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন ও নৌকায় ভোট চাইছেন। পাশাপাশি তিনি ভার্চুয়াল সমাবেশেও যুক্ত হচ্ছেন। ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ অন্য নেতারাও নিজ আসন ছাড়াও দলীয় প্রার্থীদের পক্ষে বিভিন্ন এলাকায় প্রচারণায় যোগ দিচ্ছেন।
কিন্তু একেবারেই বিপরীত চিত্র বিরোধী শিবির জাপায়। এখন পর্যন্ত জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরকে কোনো নির্বাচনী জনসভায় যুক্ত হতে দেখা যায়নি। এমনকি নিজ নির্বাচনী এলাকায়ও তিনি নামমাত্র প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিভিন্ন সমস্যায় পড়ে জাপা প্রার্থীরা দলীয় চেয়ারম্যানের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হচ্ছেন।
সর্বশেষ শুক্রবার ঢাকা থেকে সড়কপথে রংপুরের উদ্দেশে রওনা দেন জিএম কাদের। জাপার দায়িত্বশীল সূত্রে জানা যায়, রংপুর যাওয়ার পথে টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধার নির্বাচনী এলাকাগুলোতে জনসভায় করার বিষয়ে দলীয় চেয়ারম্যানকে অনুরোধ জানান প্রেসিডিয়াম মেম্বাররা। কিন্তু চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের জনসভায় লাখ লাখ মানুষ অংশ নিচ্ছে, আমাদের জনসভায় মানুষ পাবেন কই?’ পরবর্তীকালে এসব নেতা পথসভা করতে পরামর্শ দিলেও তিনি গুরুত্ব দেননি।
একই অভিযোগ টাঙ্গাইলের এক প্রার্থীর। নাম প্রকাশ না করে এ প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা টাঙ্গাইল অথবা সিরাজগঞ্জে একটি জনসভা করতে দলের শীর্ষ নেতাদের অনুরোধ জানিয়েছিলাম। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের এ প্রস্তাবে শীর্ষ নেতারা সাড়া দেননি।’
জিএম কাদের নিজ নির্বাচনী এলাকা রংপুরে ফিরেই পরদিন শনিবার আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। নির্বাচনে ভোটার নিয়ে আসা ও তার সমর্থনে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাজ করতে অনুরোধ জানান তিনি। এরপর থেকে তিনি এলাকায় অবস্থান করলেও তাকে কোনো জনসভা করতে দেখা যায়নি। শুধু সাংবাদিকদের সঙ্গে মাঝেমধ্যে কথা বলছেন ও দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বাসায় বৈঠক করছেন।
কুড়িগ্রাম, রংপুর, লালমনিরহাট থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জাপার এমন একাধিক প্রার্থী দেশ রূপান্তরকে বলেন, উত্তরবঙ্গে জাপা শক্তিতে এগিয়ে আছে, এখানকার ৩৩টি আসন থেকে জাপা উল্লেখযোগ্য আসন পাবে। দলের চেয়ারম্যান এসব এলাকায় জনসভা করলে নেতাকর্মী ও ভোটাররা উজ্জীবিত হবেন।
চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জাপা প্রার্থী মোহাম্মদ ছালেম বলেন, ‘গত এক সপ্তাহ ধরে চেয়ারম্যান ও মহাসচিবকে ফোন দিয়ে যাচ্ছি ক্রমাগত। কিন্তু তারা ফোন রিসিভ করছেন না, কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই। নির্বাচনের আগে দল নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও তারা রাখছে না।’
জাপার কো-চেয়ারম্যান ও রংপুর সিটি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা বলেন, ‘আমাদের চেয়ারম্যান জিএম কাদের নানামুখী চাপে রয়েছেন, ফলে তার মন ভালো নেই। প্রার্থীরা নির্বাচন করতে গিয়ে নানা চাপে পড়ছেন। প্রশাসন আওয়ামী লীগের হয়ে কাজ করছে, আমাদের প্রার্থীরা হামলার শিকার হচ্ছে। সরকার যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে আমাদের নির্বাচনে নিয়ে এসেছিল তার একটাও রাখেনি। ফলে এ নির্বাচন নিয়ে সংশয় রয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই চেয়ারম্যান নির্বাচনে আসার পক্ষে ছিলেন না, তাকে চাপ দিয়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার তার প্রতিশ্রুতি না রাখলে নির্বাচনে থাকা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
চেয়ারম্যান ও মহাসচিব প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন না কেন এমন প্রশ্নে জাপা নেতা মোস্তফা বলেন, ‘নির্বাচন করতে অনেক খরচ ও আনুষঙ্গিক বিষয় আছে। প্রার্থীরা ফোন দিয়ে আর্থিক সহযোগিতা চাচ্ছেন, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা কামনা করছেন। এসব লোড চেয়ারম্যান নিতে পারছেন না, ফলে তিনি বিরক্ত।’
কিশোরগঞ্জ-৩ আসন থেকে সর্বশেষ তিন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সংসদ সদস্য হয়েছেন। কিন্তু এবার তার সঙ্গে কাজ করতে রাজি হচ্ছেন না স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। আওয়ামী লীগ নেতারা এবার যেকোনো মূল্যে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে দলটির স্বতন্ত্রদের পক্ষে কাজ করছেন। এবার চুন্নুর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ও স্বতন্ত্র প্রার্থী ড. মিজানুল হক।
জাপার নির্বাচন পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা দলের মহাসচিব এলাকায় যাওয়ার পর থেকে প্রার্থী তো দূরের কথা, দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন না। এ নিয়ে তারা বিরক্ত।
রাজশাহী-২ আসনের জাপা প্রার্থী সাইফুল ইসলাম স্বপন বলেন, ‘কমিটির সদস্যরা প্রার্থীদের কোনো খোঁজ নেন না। আমরা কী করছি, কীভাবে নির্বাচনের মাঠে আছি তা দলের পক্ষ থেকে জানার কেউ নেই। আমাদের দল থেকে যে সহযোগিতার কথা বলা হয়েছিল, সে বিষয়েও দলের কোনো কার্যক্রম নেই।’
জাতীয় পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ও প্রেসিডিয়াম মেম্বার জহিরুল ইসলাম জহির দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু নিজ নির্বাচনী এলাকায় থাকায় তাদের সঙ্গে আমাদের কিংবা প্রার্থীদের যোগাযোগ হচ্ছে না। এ নিয়ে প্রার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করছেন, তাদের নানা দাবিদাওয়া ও চাহিদার কথা জানাচ্ছেন, যা চেয়ারম্যান-মহাসচিব ছাড়া কেউ পূরণ করতে পারব না।’ তবে মহাসচিব প্রতিদিন রাতে একবার তার সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজখবর নেন বলে জহির জানান।
