বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে এখন পর্যন্ত ১১টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং ১২তম নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে। শুরু থেকেই আমাদের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন ছিল এবং ফলে নির্বাচনী সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। এ পর্যন্ত বাংলাদেশের যে ৪টি নির্বাচনকে মোটা দাগে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক বলা যায় তার সবকটিই অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্দলীয় সরকারের অধীনে। এর বাইরে যে ৭টি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে ১৯৭৩, ৭৯ ও ২০১৮ সালের নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হলেও এই ৩টি নির্বাচনে মোটামুটি সব দল অংশগ্রহণ করেছিল। ৭৯ ও ২০১৮ সালে দলীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায় নির্বাচনের যে উদাহরণ তৈরি হয়েছে তা আমাদের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে খারাপ উদাহরণ হয়ে আছে। অপরদিকে ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল সেটা নিয়েও প্রশ্ন থাকলেও তাকে শেষ পর্যন্ত মন্দের ভালোর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারি না। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কার্যত তখন বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের কোনো প্রতিপক্ষই ছিল না, যারা ভোটযুদ্ধে তাদের চ্যালেঞ্জ জানাতে পারে। তথাপি হাতেগোনা কিছু আসনে দলীয় প্রার্থীকে জিতিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রকাশ্যে হস্তক্ষেপসহ ভোটকেন্দ্র দখল, জাল ভোট প্রদান, সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে যে নির্বাচনী নিরপেক্ষতার উদাহরণ তৈরির সুযোগ ছিল, তা শুরুতেই হাতছাড়া হয়ে যায়।
নির্বাচন হচ্ছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ। সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয় ক্ষমতাকে বৈধতা দেয় এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও সম্প্রীতি উন্নত করে। কেবল আইনি বা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার জন্য নয়, সুষ্ঠু নির্বাচন গণতন্ত্রের চর্চা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্যও অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সবশেষ ২০১৪ ও ১৮ নির্বাচন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১৪ এর নির্বাচন বিএনপিসহ প্রায় সব বিরোধী দল বর্জন করেছিল। ১৮ এর নির্বাচনে প্রায় সবগুলো দল অংশগ্রহণ করলেও এই নির্বাচনে নজিরবিহীন অনিয়ম হয়েছিল যার ফিরিস্তি উঠে আসছে চলমান নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রার্থীদের প্রচারণায় আওয়ামী লীগ নেতাদের দেওয়া বক্তব্যে।
আগামী ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া নির্বাচন বিএনপি ও তার মিত্র দল এবং কিছু বাম ও ইসলামপন্থি দল বর্জন করেছে। ফলে শুরুতেই এই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশের রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিদেশি বন্ধুরা সংকট কাটাতে বারবার নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার আগে এবং পরেও ক্ষমতাসীন এবং বিরোধীদের শর্তহীনভাবে সংলাপে বসার অনুরোধ জানান। কিন্তু আওয়ামী লীগের উদাসীনতা ও উন্নাসিকতা এবং বিরোধী শিবিরের ছাড় না দেওয়ার মানসিকতা শর্তহীন সংলাপকে আর বাস্তবে রূপ দিতে পারেনি।
নির্বাচনের আগেই সরকারি দল কে হবে তা দেশের সব নাগরিক জেনে গেছেন, সমালোচকরা বলছেন- বিরোধী দল কে হবে, সেটা নিশ্চিত করতেই এই নির্বাচন। বিএনপির মতো বড় একটি দল যেই নির্বাচনে নেই, সেখানে মানুষ ভোট দিতে ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। অন্যদিকে, সরকারি দল ও তার স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সংঘাত কতটা বিস্তৃত হবে তা নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে প্রশ্ন উঠেছে। এখানে বলে নেওয়া ভালো এই নির্বাচন যদি খুব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবেই সরকার ও নির্বাচন কমিশন আয়োজন করে তারপরও বিশ্বে এই নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কি না কিংবা সরকার আগামী ৫ বছর ক্ষমতায় থাকতে পারবে কি না তা কিন্তু নিশ্চিত নয়। ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরাও কিন্তু নানা কথাবার্তা দিয়ে তা বুঝিয়ে দিচ্ছেন। তবে শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কেমন হবে তা নিয়ে এখনই মন্তব্য করা উচিত হবে না। এ নিয়ে মন্তব্য করতে আমাদের আরেকটু অপেক্ষা করতে হবে।
এক নজরে দেখা যাক দলীয় সরকারের অধীনে সব দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত ৩টি নির্বাচন কেমন হয়েছিল:
১৯৭৩ : প্রথম সংসদ নির্বাচন
স্বাধীন বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধু সরকার প্রথম নির্বাচন আয়োজন করে ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগ, ন্যাপ (মোজাফফর), ন্যাপ (ভাসানী), সিপিবি, জাসদসহ মোট ১৪টি দল অংশ নেয়। নির্বাচনে মোট প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৯ জন। স্বাধীন বাংলাদেশে আয়োজিত প্রথম নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব ও ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো নেতা যেমন তৈরি হয়নি তেমনি আওয়ামী লীগেরও কোনো প্রতিপক্ষ দল গড়ে ওঠেনি। ফলে অনুমিতভাবেই আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ জয়লাভ করে। ওই নির্বাচনে শাসক দল আওয়ামী লীগের ১১জন সদস্য বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছিলেন।
বিরোধী দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ জাতীয় লীগের প্রবীণ নেতা আতাউর রহমান খান ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে প্রয়াত বাম নেতা আবদুল্লাহ সরকার ও তরুণ সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত উল্লেখযোগ্য ছিলেন। নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫৫.৬২ শতাংশ। মোট বৈধ ভোটের ৭৩.২০ ভাগই পেয়েছিল আওয়ামী লীগ।
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত ছিল কিন্ত এরপরও বেশ কিছু শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন যারা জিতে আসতে পারলে আমাদের সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্যই ভালো ছিল। বেশ কিছু আসনে শুরুর দিকে বিরোধীদলীয় প্রার্থীরা এগিয়ে ছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা পরাজিত হন। পরাজিতদের তালিকায় ছিলেন ভাষাসৈনিক অলি আহাদ। তিনি দাবি করেছিলেন, নির্বাচনে অনিয়ম, কেন্দ্র দখল, পেশিশক্তির প্রয়োগ ছিল। নিশ্চিত বিজয়ের পথে থাকা আমাকে ১০ হাজার ভোটে পরাজিত ঘোষণা করা হয়। অনিয়মের কথা উল্লেখ রয়েছে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের মেয়ে শারমিন আহমেদের লেখা নেতা ও পিতা বইয়ে। শারমিন লিখেছেন, ‘সিলেটের কয়েকটি আসনে কারচুপি এবং কুমিল্লায় খন্দকার মোশতাক চুরি করে জিতেছে এই খবরগুলো রাজনৈতিক মহলে তখন অজানা ছিল না।’
১৯৭৯ : দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন
বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর থেকে দেশের রাজনীতি ও সেনাবাহিনীতে নানা পটপরিবর্তন, পাল্টাপাল্টি অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান ক্ষমতার কেন্দ্রে আসেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। জিয়াউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথমে হ্যাঁ না ভোটের আয়োজন করেছিলেন, যা চরম বিতর্কিত ছিল।
১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশের দ্বিতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনেও বড় জয় পেয়েছিল ক্ষমতায় থাকা সাবেক সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের গঠন করা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ওই নির্বাচনে বিএনপি পায় ২০৭টি আসন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ (মিজান) ২, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ৮, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ও ইসলামিক ডেমোক্রেটিক লীগ ২০, অন্যান্য দল ৮ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হন ১৬টি আসনে।
এ নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল ৫০.৬২ শতাংশ। এর মধ্যে বিএনপি ৪১.১৬ ভাগ, আওয়ামী লীগ মালেক ২৪.৫৫ ভাগ, আওয়ামী লীগ (মিজান) ২.৭৮ ভাগ।
এই নির্বাচনে বিএনপি ব্যাপক কারচুপি, ভোট জালিয়াতি করে অনেক আসনের ভোটের হিসাব পাল্টে দিয়েছিল। বিরোধী দলগুলো এই নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি। তাদের অভিযোগ ছিল জিয়া সরকার গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে নীলনকশার নির্বাচন আয়োজন করেছে। নির্বাচনটি দেশে বিদেশে বিতর্কিত তকমা পেয়েছিল। প্রথম নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলেও এই নির্বাচন বাজে নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। বিএনপির হয়ে যারা জয়লাভ করেছিলেন তাদের একটা বড় অংশের রাজনীতিতে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না।
২০১৮ : একাদশ নির্বাচন
২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে বিএনপিসহ ৩৯ দল অংশ নিয়েছিল। নির্বাচনের আগে জেলে থাকা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করে দলটি, এমনকি তারা এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে সংলাপেও বসেছিল। শেষ পর্যন্ত দাবি আদায়ে ব্যর্থ হয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ হিসেবে খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখেই নির্বাচনে যায় বিএনপি।
একাদশ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১টি আসনের প্রার্থী মারা যাওয়ায় ২৯৯টি আসনে নির্বাচন হয়। ১টি আসনের ফলাফল স্থগিত থাকায় বাকি ২৯৮টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ নৌকা প্রতীকে এককভাবে ২৫৯টি আসনে জয়লাভ করে। এছাড়াও জাতীয় পার্টি লাঙ্গল প্রতীকে ২০টি, বিএনপি ধানের শীষ প্রতীকে ৫টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ৩টি, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) ২টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ ২টি এবং জাতীয় পার্টি (জেপি) ১টি, তরিকত ফেডারেশন ১টি , গণফোরাম ২টি আসনে জয়লাভ করে। অন্যদিকে, ৩টি আসনে জয় পেয়েছেন স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
একাদশ সংসদ নির্বাচনে ২১৩টি কেন্দ্রে শতভাগ ভোট পড়ে, নির্বাচনে ৯৬-১০০% ভোট পড়েছে ১,৪১৮টি কেন্দ্রে। এছাড়াও ৯০-৯৫ শতাংশ ভোট পড়েছে ৬,৪৮৪টি ভোটকেন্দ্রে। ৭৫টি আসনের ৫৮৭টি কেন্দ্রের শতভাগ বৈধ ভোট শুধুমাত্র আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছিলেন। অন্য কোনো প্রার্থী ১ ভোটও পাননি। এই নির্বাচনে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ বা গ্রহণযোগ্যতার বালাই ছিল না।
একাদশ নির্বাচনে গায়েবি ভোট ও রাতের বেলা ভোট দেওয়ার অভিযোগ ছিল। পাশাপাশি শাসক দলের পক্ষে প্রশাসনের সহযোগিতায় কেন্দ্র দখল, বিরোধী এজেন্ট বের করে দেওয়া, জাল ভোটের নানা অভিযোগ ছিল।
লেখক : জাতীয় নির্বাচন পর্যবেক্ষক পরিষদের (জানিপপ) চেয়ারম্যান; প্রাক্তন উপাচার্য, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়-রংপুর।
