নতুন বছর মানেই সবকিছু নতুন করে শুরু করার এক সুবর্ণ সুযোগ। সঙ্গে নতুন নতুন সংকল্প আর নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার জন্য নতুন কিছু পরিকল্পনা। নতুন বছরে কেমন হতে পারে ঘর-গৃহস্থালির প্রস্তুতি, কীভাবে সাজানো যায় গোছানো কিছু প্ল্যান। নিচে রইল এ বিষয়ে কিছু ধারণা। লিখেছেন তানজিলা তাহরিন
নিত্যদিনের রুটিন তৈরি
বাচ্চাদের জন্য স্কুলের রুটিনের সঙ্গে মিল রেখে রোজ দিনের রুটিন তৈরি করে ফেলতে পারেন বছরের শুরুতেই। এতে নিয়মানুবর্তিতার পাশাপাশি বাচ্চারা হয়ে উঠবে অনেকটাই সময় সচেতন। সকালে ঘুম থেকে ওঠার জন্য একটা নির্ধারিত সময়, প্রতিদিন একই সময়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ও ডিনার, পড়াশোনার জন্য একটা বরাদ্দ সময় এবং বাকিটুকু খেলাধুলা ও অবসরের অ্যাকটিভিটির জন্য সাজাতে পারেন। অবশ্যই বাচ্চাদের রুটিন সাজাতে হবে তাদের জন্য সুবিধাজনকভাবে এবং তাদের কমফোর্টের কথা মাথায় রেখে। রুটিন যেন কোনোভাবেই তাদের ওপর চেপে না বসে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। সৃজনশীল কাজ, বই পড়া এবং শখের কাজের জন্য কিছু সময় রুটিনে আলাদা করে রাখা বাচ্চাদের মানসিক বিকাশের জন্য সহায়ক হতে পারে। বাচ্চারা যখন স্কুলে থাকবে সে সময়টাতে নিজের জন্যও কিছু সময় আলাদা করে রেখে নিন। সে সময়টাতে নিজের যত্ন, বই পড়া, গান শোনা, ফোনে আড্ডা দেওয়া এসবের মধ্যে কাটিয়ে দিন।
স্বাস্থ্যই সুখের মূল
নতুন বছরে না হয় হয়ে উঠলেন আরেকটু বেশি স্বাস্থ্য সচেতন। সুস্বাস্থ্য যেহেতু সুস্থতার চাবিকাঠি, তাই স্বাস্থ্যের অপচয়ে পরিমিত হওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়া শুরু করতে পারেন বছরের শুরুতেই। সারা বছর স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার দিকে জোর দেওয়া ছাড়াও ওয়ার্ক আউট বা যোগব্যায়ামের জন্য বছরের শুরুতে ভর্তি হয়ে যেতে পারেন নিকটস্থ জিম বা যোগার ক্লাসে। কিংবা অনলাইনে কোনো কোনো ক্লাস করতে পারেন। বাদ দিতে পারেন বাইরের খাবারের বাজে অভ্যাস, চিনি ছাড়ার সংকল্পও নিতে পারেন। সেই সঙ্গে কমাতে পারেন সিগারেট বা চা-কফির নেশাও। গড়ে তুলতে পারেন মর্নিং ওয়াক বা মেডিটেশনের সুঅভ্যাসও।
ক্যারিয়ার প্ল্যান
ক্যারিয়ার নিয়ে বেশ কিছু হিসাব-নিকাশ করে ফেলতে পারেন বছরের শুরুতেই। এতে পরিকল্পনামাফিক একটা ক্যারিয়ার প্ল্যানে এগোনো সহজ হতে পারে। স্টুডেন্ট হলে সারা বছর পড়াশোনার ক্ষেত্রে কী কী পদ্ধতি অবলম্বন করবেন, কোন কোন বিষয়ে জোর দেবেন, কীভাবে প্রত্যাশিত ফলাফলের দিকে এগিয়ে যাবেন এবং পরীক্ষার আগের সময়টুকু কীভাবে পড়বেন এসব কিছুর একটা খসড়া করতে পারেন বছরের শুরুতে। স্কুল-কলেজের গন্ডি পার হয়েছেন যারা, তারা ভেবে ফেলতে পারেন কী হতে পারে আপনার পড়ার জন্য পছন্দের বিষয় এবং সে জন্য কীভাবে নেবেন ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি তার প্ল্যান করে ফেলতে পারেন। তাতে সামনের দিকে এগোনোর পথটা অনেকটাই ঝামেলামুক্ত হয়। গ্র্যাজুয়েশন বা পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে যারা পেশাগত জীবনের জন্য নিজেকে তৈরি করছেন, তারা বছরের শুরুতেই নির্ধারণ করতে পারেন কী হতে পারে কাজ করার ক্ষেত্রে। আপনার পছন্দের ক্ষেত্র এবং সেই অনুযায়ী কীভাবে নিজেকে প্রস্তুত করবেন, কী কী পড়বেন এসব ভেবে ফেলতে পারেন। চাকরি ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বিভিন্ন কোর্স। নিজের জন্য উপযুক্ত কোর্সগুলোর একটি লিস্টও আপনার ক্যারিয়ার প্ল্যানে যুক্ত করতে পারেন। এতে যেমন মোটিভেশন পাবেন তেমন বছরের শুরু থেকেই অটুট থাকবে উদ্যম ও আগ্রহ।
বছরের সঞ্চয়
নতুন বছরের শুরুতেই আয়-ব্যয় ও সঞ্চয়ের একটা বাজেট করে ফেললে সঞ্চয় করা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ৫০/৩০/২০ নীতি বেশ কাজে আসে। ট্যাক্স, বিল এসবকে বাদ রেখে মূল আয়ের ৫০% টাকা প্রয়োজনীয় খরচের জন্য বরাদ্দ করা যায়, ৩০% রাখা উচিত নিজেদের শখ ও ইচ্ছা মেটানোর জন্য এবং বাকি যে ২০% থাকে তা সঞ্চয় হিসেবে রাখা যেতে পারে। এতে বছর শেষে আয়ের বেশ বড় একটা অংশ সঞ্চয় করে ফেলা যেতে পারে। এ ছাড়া নিতান্তই বাজে খরচগুলোকে চিহ্নিত করে সেগুলো বাদ দেওয়া যেতে পারে, এতে বেশ কিছু টাকা সেইভ হয়ে যায়। সেই সঙ্গে সম্ভাব্য খরচগুলো সম্পর্কে আইডিয়া থাকলে তার জন্য আলাদা আলাদা বাজেট তৈরিও সঞ্চয়ের জন্য সহায়ক হতে পারে। তাই চেষ্টা করুন প্রতিদিনকার খরচের হিসাব একটা নোটবুকে লিখে রাখা। পরের দিন যখন খরচ করবেন তখন ভেবে দেখতে পারবেন গত দিনের সব কেনাকাটা বা ব্যয়ের প্রয়োজন ছিল কি। পরবর্তী সময় কেনাকাটার সময় এটা মাথায় থাকবে। অল্প সঞ্চয় থেকেই আয়ের বেশ বড় একটা অংশ জমিয়ে ফেলা যায়। এই মূল ভাবটা মাথায় রেখে বছরের প্রথম থেকেই হয়ে উঠতে পারেন সঞ্চয়ী মনোভাবাপন্ন।
ঘুরতে যাওয়ার সময়
একটি সুন্দর জীবনের জন্য কাজ ও পরিশ্রমের পাশাপাশি ভ্রমণ অতি প্রয়োজনীয়। প্রতিদিনের একঘেয়েমি জীবনের জমে যাওয়া বিষাদ কেটে যায় একটা আরামদায়ক ছুটি কাটানোর পর, কাজ শুরু করা যায় নতুন উদ্যমে। বছরের শুরুতেই করে ফেলা যায় বড় বড় ছুটিগুলোতে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান। সেই সঙ্গে করে নেওয়া যায় ট্রাভেলিং বাবদ কিছু বাজেটও। এতে করে পুরো ভ্রমণের প্রসেসিং ও খুঁটিনাটি বেশ সহজ হয়ে যায়। বেশি বাজেট থাকলে আশপাশের দেশগুলোতে প্ল্যান করে ফেলতে পারেন দুই-তিন দিনের ট্যুর। ভারত, মালদ্বীপ,
থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া বা তুরস্ক হতে পারে বাজেটের মধ্যে অসাধারণ ছুটি কাটানোর গন্তব্য। সে ক্ষেত্রে ভিসা অ্যাপ্লিকেশন, হোটেল বুকিং, স্পট নির্ধারণ, প্যাকেজ সিলেকশন ইত্যাদি খুঁটিনাটি শুরু করতে পারেন বছরের শুরু থেকেই। তাহলে ধাপে ধাপে সহজেই শেষ হতে পারে প্রস্তুতি। এ ছাড়া অল্প বাজেটে দেশের মধ্যেই নয়নাভিরাম জায়গাগুলোতে ঘুরে আসা যায়। কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, সাজেকের পাশাপাশি সিলেটের চোখ জুড়ানো জায়গাগুলো বা সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরে দুদিন, এক রাত ভেসে বেড়ানো হতে পারে দারুণ অবকাশ যাপন। বিখ্যাত জায়গাগুলো ছাড়াও নিজেদের গ্রামের বাড়ি বা ঢাকার ভেতরের রিসোর্টগুলো হয়ে উঠতে পারে ঘুরতে যাওয়ার জন্য পারফেক্ট। এসবের জন্য বছরের শুরুতে প্ল্যান ও বাজেট তৈরি করে ফেলুন। একটি নির্ঝঞ্ঝাট ছুটি কাটানোয় সেটি হয়ে উঠতে পারে উপকারী।
পুরনো বছর থেকে নেওয়া শিক্ষাগুলো
মানুষ ভুল থেকে শেখে, অতীত থেকে নেওয়া বিভিন্ন উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জীবনে এগিয়ে যায় সামনের দিকে। এ ক্ষেত্রে পুরনো বছরের ভুল বা ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন বছরটাকে সাজাতে পারেন সহজ ও সুন্দরভাবে। তাতে চলার পথটা হতে পারে আরও সুগম। কী কী করলেন, কীভাবে চললেন, কাদের সঙ্গে ছিল বন্ধুতা, কারা শুধু সুযোগ নিল আপনার সরলতার এসবের হিসাব-নিকাশ পুরোপুরি সম্ভব না হলেও কিছুটা তো যোগ-বিয়োগ করতেই পারেন বছর শেষে। কী করলে আরও ভালো হবে সব কিছু, কর্মোদ্যমী হওয়া যায় কীভাবে, কারা আপনার সত্যিকারের শুভাকাক্সক্ষী, কাদের একটু হলেও এড়িয়ে চলা উচিত এসব কিছু বছরের শুরুতেই ভেবে নিতে পারেন। এতে জীবন আরেকটু সহজ হয়। এভাবেই পুরনো বছরের ব্যর্থতা হয়ে উঠতে পারে নতুন বছরের সফল পথের অনুপ্রেরণা।
