হরতাল-অবরোধে সড়কে প্রাণহানি কমেছে

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৮:৪০ এএম

দেশে বিদায়ী বছর ২০২৩ সালে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন প্রাণ হারিয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় ১০ হাজার ৩৭২ জন আহত হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এর আগের বছর ২০২২ সালে সড়কে ৬ হাজার ৭৪৯টি দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ৯৫১ জন নিহত ও ১২ হাজার ৩৫৬ জন আহত হয়েছিল। গেল বছর দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে টানা হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি চলার কারণে সড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি কমেছে বলে মনে করছেন সড়ক যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, মূলত হরতাল-অবরোধ কর্মসূচিতে দূরপাল্লার গাড়ি না চলায় মহাসড়ক ছিল অনেকটাই ফাঁকা। এজন্য অন্য বছরের চেয়ে সদ্যবিদায়ী বছরে সড়কে মৃত্যুর সংখ্যা কমেছে।

গতকাল রবিবার সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের বার্ষিক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।

এতে বলা হয়, বিদায়ী বছরে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫০৫ জন মারা গেছে। এর মধ্যে ৬ হাজার ২৬১ সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত ও ১০ হাজার ৩৭২ জন আহত হয়। এ সময় রেলপথে ৫২০টি দুর্ঘটনায় ৫১২ নিহত ও ৪৭৫ জন আহত হয়েছে। নৌপথে ১৪৮টি দুর্ঘটনায় ৯১ নিহত, ১৫২ আহত এবং

১০৯ জন নিখোঁজ রয়েছে। সড়কে গত বছর ২ হাজার ৩১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ হাজার ১৫২ জন নিহত ও ১ হাজার ৩৩৯ জন আহত হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩২ শতাংশের বেশি।

২০২২ সালের চেয়ে বিদায়ী ২০২৩ সালে ছোট যানবাহনের সংখ্যা হঠাৎ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাওয়া ও এসব যানবাহন অবাধে চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বেড়েছে বলে জানিয়েছে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিগত বছরের চেয়ে বিদায়ী বছরে ফিডার রোডে ৫৫ দশমিক ১৯ শতাংশ, জাতীয় মহাসড়কে ১৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ, রেলক্রসিংয়ে শূন্য দশমিক ১৬ শতাংশ দুর্ঘটনা বেড়েছে। তবে এবার আঞ্চলিক মহাসড়কে ৪৯ দশমিক ৩৩ শতাংশ দুর্ঘটনা কমেছে।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত বছর সড়কে দুর্ঘটনায় আক্রান্ত ১ হাজার ৯৫০ জন চালক, ৯৬৮  পথচারী, ৪৮৫ পরিবহন শ্রমিক, ৬৯৭ শিক্ষার্থী, ৯৭ শিক্ষক, ১৫৪ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য, ৯৮৫ নারী, ৬১২ শিশু, ৩০ সাংবাদিক, ৩২ চিকিৎসক, ১৬ বীর মুক্তিযোদ্ধা, ৮ আইনজীবী ও ১০ প্রকৌশলী এবং ১১১ জন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীর পরিচয় মিলেছে।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানিয়েছে, এ সময়ে সংঘটিত দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৫০টি যানবাহনের পরিচয় মিলেছে, যার ১৬ দশমিক ১৫ শতাংশ বাস, ২৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ ট্রাক-পিকআপ-কাভার্ড ভ্যান ও লরি, ৫ দশমিক ৯১ শতাংশ কার-জিপ-মাইক্রোবাস, ৫ দশমিক ৩৯ শতাংশ সিএনজিচালিত অটোরিকশা, ২৬ দশমিক ০২ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ৭ দশমিক ১৯ শতাংশ নসিমন-করিমন-মাহিন্দ্রা-ট্রাক্টর ও লেগুনা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে।

পরিসংখ্যানের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিগত ২০২২ সালের তুলনায় বিদায়ী ২০২৩ সালে ৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ গাড়িচাপা, ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৩৭ দশমিক ০৩ শতাংশ যানবাহনের চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে, ট্রেন-যানবাহন সংঘর্ষের ঘটনা ৩৫ দশমিক ০২ শতাংশ, ১৬ দশমিক ০৪ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা কমেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ বছর মোট সংঘটিত দুর্ঘটনার ৩৪ দশমিক ৮৬ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৪১ শতাংশ আঞ্চলিক মহাসড়কে, ২৮ দশমিক ৫ শতাংশ ফিডার রোডে সংঘটিত হয়েছে। এ ছাড়া সারা দেশে সংঘটিত দুর্ঘটনার ৬ দশমিক ৩২ শতাংশ ঢাকা মহানগরীতে, ১ দশমিক ১১ শতাংশ চট্টগ্রাম মহানগরীতে, শূন্য দশমিক ৬৮ শতাংশ রেলক্রসিংয়ে সংঘটিত হয়েছে।

সমিতির তথ্যমতে, গত বছর দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে ঢাকা বিভাগে। এখানে ১ হাজার ৭৩৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় ১ হাজার ৭১২ জন নিহত ও ২ হাজার ৩৮১ জন আহত হয়েছে।

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ৮০ শতাংশের মতো দুর্ঘটনা হয়ে থাকে মহাসড়কে। কিন্তু গত বছর রাজনৈতিক অস্থিরতার জন্য সড়কে গণপরিবহনের চলাচল ছিল কম। টানা হরতাল-অবরোধে দূরপাল্লার গাড়ি কম চলায় সড়কে দুর্ঘটনা ২০২২ সাল থেকে কিছু কমেছে। তবে সড়কে কিন্তু শৃঙ্খলা এখনো ফেরেনি।

তিনি আরও বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা রোধে যে সুপারিশ করা হয়েছিল সেগুলোও এখনো বাস্তবায়ন করা হয়নি। আর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর জন্য যথাযথ আইন এখনো প্রয়োগ করা হয় না। তাই সড়ক শৃঙ্খলায় চলে এসেছে এটি বলা যায় না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত