নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সঙ্গে একই দিনে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি। তারা আলাদাভাবে গতকাল বুধবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। গতকাল দুপুরে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে প্রথমে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পিটার হাস। এ সময় বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান সম্পর্ক কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত।
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে পিটার হাস সেখানে উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোহিঙ্গা সংকটে একে অপরকে কীভাবে সহযোগিতা করতে পারি, সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি। আগামী মাসগুলোতে আমাদের পারস্পরিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করবে।’
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ‘বৈরী’ সম্পর্কের পর এই প্রথম নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দূতের সাক্ষাৎ হলো। নির্বাচন-পরবর্তী সম্পর্ক নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে এবং আলোচনা কেমন হলো- এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘনিষ্ঠতর সম্পর্কের লক্ষ্যে আলোচনা ফলপ্রসূ হয়েছে।’
ইইউ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গেও ফলপ্রসূ বৈঠক হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক, তাদের নিজ দেশে পূর্ণ নাগরিক অধিকার ও মর্যাদার সঙ্গে ফিরিয়ে নেওয়াই রোহিঙ্গা সমস্যার একমাত্র সমাধান এটি পুনর্ব্যক্ত করে এ বিষয়ে তাদের (যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ) সহযোগিতা বৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতের পর ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে শিগগিরই নতুন পার্টনারশিপ কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্টে (পিসিএ) সই করতে যাচ্ছে ইইউ। এর মধ্য দিয়ে দুই পক্ষের সম্পর্ক আরও বাড়বে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হাছান মাহমুদের সঙ্গে প্রথম দেখা করেছি। এর আগেও তার সঙ্গে পরিচয় ছিল। আমরা দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করেছি।’
পিটার হাস বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন, ব্যবসার সম্প্রসারণ ও রোহিঙ্গা সমস্যার মতো আরও বেশ কিছু পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। আগামী মাসগুলোয় দুই পক্ষের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আমি বাংলাদেশের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করতে উন্মুখ হয়ে আছি। পারস্পরিক অভিন্ন স্বার্থে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।’
বৈঠকের পর পিটার হাসের হাতে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা ও উপহার তুলে দেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
দুই রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক সম্পর্কে যা বললেন মন্ত্রী : বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্যে বাণিজ্য বিস্তৃতি, জঙ্গি দমনসহ সংশ্লিষ্ট সব ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে দেশটির রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ফলপ্রসূ আলোচনার কথা জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা উভয় দেশ আমাদের সম্পর্ককে আরও ঘনিষ্ঠ করার লক্ষ্যে ফলপ্রসূ আলোচনা করেছি। আমাদের স্বাধীন দেশের ৫২ বছরের পথচলায় যুক্তরাষ্ট্রের বড় উন্নয়ন সহযোগী ভূমিকার জন্য রাষ্ট্রদূতকে ধন্যবাদ জানিয়েছি। বাণিজ্য খাতেও তারা আমাদের বড় অংশীদার। আমাদের বিজনেস বাস্কেট আরও সমৃদ্ধ করা ও যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে আলোচনা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও আমাদের নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ‘গত নির্বাচনে মার্কিন পর্যবেক্ষকদের পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে আমি তাকে (পিটার হাস) সুষ্ঠু, সুন্দর, অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা জানিয়েছি। যেখানে শীত ও কুয়াশা সত্ত্বেও প্রায় ৪২ শতাংশ ভোট পড়েছে, যেটি একটি ভালো ভোটার টার্নআউট।’
ইইউর সঙ্গে শিগগিরই নতুন চুক্তি সই: পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বৈঠকের পর চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদের সঙ্গে এটি আমার প্রথম বৈঠক। বেলজিয়ামের সঙ্গে তার জোরালো সম্পর্ক রয়েছে। কারণ তিনি সেখানেই লেখাপড়া করেছেন। আর বেলজিয়াম হচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান কার্যালয়। এই বৈঠকে ইইউ-বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে আমাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেকগুলো এজেন্ডা রয়েছে। শিগগিরই নতুন পিসিএ সই করতে যাচ্ছি আমরা। এটি অনেক ব্যাপক ও নতুন প্রজন্মের চুক্তি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউক্রেন-রাশিয়ার সংঘাতসহ বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও কথা হয়েছে। যেটিকে আমরা অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। আলোচনায় রোহিঙ্গা সংকটও উঠে এসেছে। এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। আগামীতেও বহু বছর ধরে এ সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে আশা করছি। আমাদের বৈঠক ছিল খুবই ফলপ্রসূ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ইইউ-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে।’
বাংলাদেশ-ইউরোপীয় ইউনিয়নের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে এক প্রশ্নের উত্তরে হোয়াইটলি বলেন, ‘পিসিএর ভিত্তিতে আগামী পাঁচ বছরে আমাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরিবর্তন আসবে। ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের যে চুক্তি রয়েছে, সেটির চেয়ে এর (পিসিএ) ধরন অনেকটা রাজনৈতিক। কারণ আগের চুক্তি বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উন্নয়ন সহযোগিতার; যা এখনো বর্তমান আছে।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে সব বড় রাজনৈতিক দল অংশ নেয়নি উল্লেখ করে ইইউর দেওয়া বিবৃতি প্রসঙ্গে বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ‘না, এ বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। আজকের আলোচনা খুবই ফলপ্রসূ ছিল। কীভাবে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারি, সেটাই ছিল আমাদের আলোচনার বিষয়।’
অতীত ভুলে গেছেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই না, অতীতও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের নির্বাচনী বিশেষজ্ঞ দল এই শহরে ছিল। তারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারা এখনো বাংলাদেশ ছেড়ে যাননি। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ শেষে তারা প্রতিবেদন তৈরি করবেন; যা পরে প্রকাশ করা হবে।’
পর্যবেক্ষকদের প্রতিবেদনে যা-ই বলা হোক না কেন; আগামী পাঁচ বছরে বাংলাদেশকে সহায়তা অব্যাহত রাখবেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে হোয়াইটলি বলেন, ‘অবশ্যই। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে।’
বৈঠক শেষে মন্ত্রী রাষ্ট্রদূতের হাতে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রতীক নৌকাসহ ঐতিহ্যবাহী উপহার সামগ্রী তুলে দেন এবং পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন।
