প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী বিশেষ করে ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর দাবির মুখে দেড় বছর পর শেয়ারের সর্বনিম্ন মূল্য বা ফ্লোর প্রাইস তুলে নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি)। তবে সূচকে ব্যাপক প্রভাব থাকার কথা জানিয়ে এখনো ৩৫ কোম্পানির শেয়ারে ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে, যেগুলোর কয়েকটি কোম্পানি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক আদেশে এ সিদ্ধান্ত জানিয়েছে সংস্থাটি।
২০২২ সালের ২৮ জুলাই এক আদেশে ‘সাময়িক’ সময়ের কথা জানিয়ে তালিকাভুক্ত সব কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিট দরের ওপর ফ্লোর প্রাইস আরোপ করেছিল এসইসি। তবে সেই ‘সাময়িক’ সময় পার হতে দেড় বছর লেগেছে। আর দীর্ঘ সময় ফ্লোর প্রাইসের কারণে লেনদেন কমে গিয়ে ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর অধিকাংশই বিপদে পড়েছে। আয় কমে যাওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালন ব্যয় নির্বাহ করতে সংকটের মধ্যে পড়েছে। আর বিনিয়োগকারীদের বড় অংশের বিনিয়োগ দীর্ঘদিন আটকে ছিল, চাইলেও প্রয়োজনের সময় শেয়ার বিক্রি করে টাকা তুলতে পারেননি। গতকাল জারি করা নতুন আদেশে সংস্থাটি বলেছে, পরবর্তী আদেশ না দেওয়া পর্যন্ত শুধু ৩৫ কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে ফ্লোর প্রাইসের আগের আদেশটি বহাল থাকবে। বাকি সব শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের ক্ষেত্রে ২০১৯ সালের ১৪ নভেম্বর জারি করা আদেশ মোতাবেক নিয়মিত সার্কিট ব্রেকার (আগের দিনের বাজারদরের ভিত্তিতে ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারদরের ওঠানামার সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ সীমা) কার্যকর হবে। কমিশন গতকালের আদেশে এ সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে, যা আগামী রবিবার থেকে কার্যকর হবে।
যে ৩৫ কোম্পানির শেয়ারদরের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হয়নি, সেগুলো হলো আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, বারাকা পাওয়ার, ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো, বেক্সিমকো লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরিন ক্যাবলস কোম্পানি, বিএসআরএম লিমিটেড, বিএসআরএম স্টিল, কনফিডেন্স সিমেন্ট, ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং (ডিবিএইচ), ডরিন পাওয়ার, এনভয় টেক্সটাইল, গ্রামীণফোন, এইচআর টেক্সটাইল, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, ইনডেক্স অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ, ইসলামী ব্যাংক, কেডিএস এক্সেসরিজ, খুলনা পাওয়ার, কাট্টলী টেক্সটাইল, মালেক স্পিনিং, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স, ন্যাশনাল পলিমার, ওরিয়ন ফার্মা, পদ্মা অয়েল, রেনাটা লিমিটেড, রবি, সায়হাম কটন, শাশা ডেনিম, সোনালি পেপার, সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্স, শাইনপুকুর সিরামিক, শাহজীবাজার পাওয়ার, সামিট পাওয়ার এবং ইউনাইটেড পাওয়ার জেনারেশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশনস কোম্পানি লিমিটেড।
উল্লেখিত ৩৫ কোম্পানিগুলোর মধ্যে ন্যাশনাল পলিমার ছাড়া বাকি ৩৪টি গতকাল লেনদেন শেষেও ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। শুধু ন্যাশনাল পলিমারের শেয়ার গতকাল ১ টাকা ১০ পয়সা বা ২ শতাংশ দর বেড়ে ৫২ টাকা ১০ পয়সায় কেনাবেচা হয়। গত বছরের জুন ও জুলাই মাসের কয়েক দিন ছাড়া ২০২২ সালের ১৩ নভেম্বরের পর থেকে ফ্লোর প্রাইসে পড়ে ছিল এ শেয়ার।
দীর্ঘদিন পর সিদ্ধান্ত নিলেও এসইসির এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন ডিএসইর ব্রোকারদের সংগঠন ডিবিএ। সংগঠনটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম বলেন, কমিশন কথা দিয়েছিল নির্বাচনের পরপরই ফ্লোর প্রাইস তুলে নেবে। কথা রাখার জন্য তাদের ধন্যবাদ। আশা করছি আগামী এক বা দুই মাসের মধ্যে পুঁজিবাজার পুরোপুরি স্বাভাবিক ধারায় ফিরবে। ফ্লোর প্রাইস তুলে নেওয়ার পর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে যাতে কোনোভাবেই ভীতি না ছড়ায়, সেজন্য সব ব্রোকার, মার্চেন্ট ব্যাংক এবং সম্পদ ব্যবস্থাপক কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে বলে মনে করেন ডিবিএ সভাপতি।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে তালিকাভুক্ত কোম্পানি আছে ৩৫৫টি এবং তালিকাভুক্ত মেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড ৩৭টি। এর মধ্যে ২১৮টি (১৮৯টি শেয়ার এবং ২৯টি মিউচুয়াল ফান্ড) গতকাল দিনের লেনদেন শেষেও ফ্লোর প্রাইসে আটকে ছিল। ফ্লোর প্রাইসের ওপরে কেনাবেচা হওয়া বাকি ১৭৪ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪টি ফ্লোর প্রাইস থেকে সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ এবং ২১টি ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে কেনাবেচা হয়েছে। বাকি ১১৯ শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ড ফ্লোর প্রাইস থেকে ১০ শতাংশের ওপর কেনাবেচা হচ্ছিল। অর্থাৎ গতকাল ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহারের আগেই এসব শেয়ারে স্বাভাবিক সার্কিট ব্রেকার কার্যকর হয়েছিল।
৩৫ কোম্পানির শেয়ারদরের ওপর থেকে ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার হলো না, সেগুলো কীসের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছে এমন প্রশ্নে এসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র রেজাউল করিম দেশ রূপান্তরকে বলেন, কোম্পানিগুলোর ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের ভিত্তিতে বাজারমূল্য সূচকে এদের অবদান, মার্জিনযোগ্য শেয়ারগুলোর মধ্যে যেগুলোর শেয়ার বিক্রির চাপ বেশি ছিল, মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও বেশি, এমন বেশকিছু দিক বিবেচনায় নিয়ে তালিকাটি করা হয়েছে। পরে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করে, এসব শেয়ারের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবে বিএসইসি।
তবে পর্যালোচনায় দেখা গেছে, যে ৩৫ শেয়ারের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার করা হয়নি, কমিশন যে ভিত্তিতে এগুলোকে আলাদা করেছে বলে দাবি করেছে, তার সঙ্গে মিল নেই। যেমন ফ্রি-ফ্লোট শেয়ার বিবেচনায় প্রধান মূল্য সূচক ডিএসইএক্সের ৬৩৩৬ পয়েন্টের মধ্যে সোনার বাংলা ইন্স্যুরেন্সের অংশ মাত্র ৪ পয়েন্ট, যা সূচকের মাত্র শূন্য দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ। সূচকের অংশ বিবেচনায় আনোয়ার গ্যালভানাইজিং, ডরিন পাওয়ার, বারাকা পাওয়ার, এনভয়টেক্স, ইনডেক্স এগ্রো, কেডিএস এক্সেসরিজ, ন্যাশনাল হাউজিং, কাট্টলী টেক্সটাইল, এইচআর টেক্স এবং সায়হাম কটনের অবদান ১০০ পয়েন্ট বা দেড় শতাংশেরও কম।
যে ৩৫ কোম্পানির ফ্লোর প্রাইস বহাল রাখা হয়েছে, সূচকে সেগুলো সাকল্যে অবদান ২৭ শতাংশ। এর মধ্যে শীর্ষ ১৫টির অবদান সাড়ে ২৩ শতাংশ। কাট্টলীটেক্স, ন্যাশনাল পলিমার, ইনডেপ অ্যাগ্রোসহ বাকি ২০ শেয়ারের সূচকের অংশ মাত্র পৌনে ৪ শতাংশ।
