ইইউর বাণিজ্য নিয়ম না মানলে নিষেধাজ্ঞায় পড়বে ব্র্যান্ড

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:১৭ এএম

মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশকে ডিউ ডিলিজেন্স বা নিয়মকানুন যথাযথভাবে পালন করতে হবে। নিয়ম না মানলে নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের জন্য ব্র্যান্ডগুলোকে বাধ্য করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) কর্মকর্তারা। তবে স্থানীয় উৎপাদকরা মনে করেন, নিয়মের সংখ্যা ও তা পরিপালনের খরচ অনেক বেশি। সে কারণে তারা ক্রেতাদের কাছ থেকে পণ্যের ন্যায্যমূল্য চেয়েছেন।

‘আইনের যথাযথ পরিপালন’ বিষয়ে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেছেন বিদেশি কূটনীতিক এবং দেশে এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। রাজধানীর তেজগাঁওয়ে নিজস্ব কার্যালয়ে বৈঠকের আয়োজন করে ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অব বাংলাদেশ (আইবিএফবি)। সংগঠনের সভাপতি হুমায়ুন রশীদের সভাপতিত্বে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঢাকায় ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ডেপুটি হেড অব ইইউ মিশন বার্নড স্প্যানিয়ার। আলোচনায় অংশ নেন তৈরি পোশাক উৎপাদন  ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন-বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান, নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম, বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন, আইবিএফবি সহসভাপতি এম এস সিদ্দিকী, সংগঠনের উপদেষ্টা মুহাম্মদ আবদুল মজিদ। ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের কমার্শিয়াল কাউন্সিলর জন ফেসহ আরও কয়েকজন কূটনীতিক উপস্থিত ছিলেন।

আলোচনায় চার্লস হোয়াইটলি বলেন, মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশকে ডিউ ডিলিজেন্স বা নিয়মকানুন যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। নিয়ম না মানলে নিষেধাজ্ঞা ও জরিমানার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক ত্যাগের জন্য ব্র্যান্ডগুলোকে বাধ্য করা হবে।

মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো বিষয়গুলো মানতে একগুচ্ছ নিয়ম-কানুন তৈরি করছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেশগুলো। নিয়ম না মানলে উৎপাদক, ক্রেতা ও ব্র্যান্ড যে কাউকেই দেওয়া হতে পারে নিষেধাজ্ঞা ও বড় ধরনের জরিমানা। ডিউ ডিলিজেন্স আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি শুধু ক্রেতা-বিক্রেতার বিষয় না; সরবরাহ শৃঙ্খলে যুক্ত সবার পরিপালনের জন্যই তা করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশুশ্রম, বাধ্যতামূলক শ্রম, দাসত্ব, বন ধ্বংস, পরিবেশ দূষণ, ইকোসিস্টেমের ক্ষতি করা ও মানবাধিকারের মতো বিষয় রয়েছে। সুতরাং এসব শুধু ইউরোপীয় ইউনিয়নের একার স্বার্থ নয়, এর সঙ্গে বৈশ্বিক স্বার্থ যুক্ত।

ডিউ ডিলিজেন্স আইনগুলোকে আলাদা করে দেখা ঠিক হবে উল্লেখ করে চার্লস হোয়াইটলি বলেন, ২০২৬ সাল নাগাদ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে বাংলাদেশকে অনেক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে। তাই ডিউ ডিলিজেন্স আইনকে আলাদা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এ সম্পর্কিত প্রায় ৩২টি কনভেনশন রয়েছে। বাংলাদেশকে এগুলো শুধু অনুসমর্থন নয়, বরং তা বাস্তবায়ন করতে হবে। আর ইইউ রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা যে একটি একক অডিট পদ্ধতির কথা বলছেন- এটি একটি ভালো প্রস্তাব। আমরাও এটি নিয়ে কথা বলব।

বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকটি ডিউ ডিলিজেন্স আইন পাস করা হয়েছে, যার বেশিরভাগ ইউরোপীয় দেশগুলো থেকে এসেছে। যদিও সবগুলো আইনের মূল সারমর্ম প্রায় একই। তবে প্রতিটি নিয়মের জন্য একাধিকবার অডিট রিপোর্ট করতে হয়। এটি নিঃসন্দেহে সময় ও আর্থিক দিক থেকে টেকসই নয়। সুতরাং আইনগুলো সর্বজনীন ও বৈশ্বিকভাবে পালনযোগ্য হওয়া উচিত। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে টেকসই ও দায়িত্বশীল চর্চা পালন করা হচ্ছে। তবে মনে রাখতে হবে, এটি একক কোনো কাজ নয়; এই প্রক্রিয়াকে সফল করতে হলে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ের সমর্থন প্রয়োজন। ক্রেতাদের মধ্যে পণ্যের কম দাম দেওয়ার জন্য এক ধরনের অনানুষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা রয়েছে। ব্যবসা ক্ষেত্রে এ ধরনের অসদাচরণ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়।

মূল বক্তব্যে বার্নড স্প্যানিয়ার বলেন, স্থানীয় দুর্বল নিয়ম ও কম দামে ক্রয়াদেশ নেওয়ার অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ খাতে অনেকেই স্বেচ্ছায় নিয়মকানুন মেনে চলেন না। আমরা বাংলাদেশে রানা প্লাজা ধসের ঘটনা এবং করোনার সময় কিছু ব্র্যান্ড ও ক্রেতাদের দায়িত্বহীন আচরণ দেখেছি। এসব ঘটনা আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছে যে, ব্যবসা প্রতিষ্ঠাগুলো স্বেচ্ছায় নিয়মকানুন মানছে না। এ জন্য সরবরাহ খাতে সুশাসন থাকা প্রয়োজন। এই বাস্তবতায় ইইউ কিছু আবশ্যক পালনীয় আইন বা ডিউ ডিলিজেন্স বাস্তবায়ন করছে।

ডিউ ডিলিজেন্স বাধ্যবাধকতা দুভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রথমত, মানবাধিকার ও পরিবেশ সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হলে ভুক্তভোগী যে কেউ নির্দিষ্ট কোম্পানির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় আদালতে ক্ষতিপূরণ চাইতে পারবেন। দ্বিতীয়ত, ইইউর তদারককারী কর্তৃপক্ষগুলো নিজেরাই পর্যবেক্ষণ করবে যে, সরবরাহ শৃঙ্খলে কেউ নিয়ম ভাঙছে কিনা। যথাযথভাবে নিয়ম না মানলে ইইউ কর্তৃপক্ষ যে কোনো নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, যার পরিমাণ ওই কোম্পানির বৈশ্বিক টার্নওভারের ৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বিকেএমইএ নির্বাহী সভাপতি বলেন, দাম নিয়ে সব সময়েই আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। ক্রেতা দেশগুলোর বিভিন্ন আইনের জন্য কয়েক ধরনের অডিট পদ্ধতি মেনে চলতে হয় উৎপাদকদের। এতে বাণিজ্যের সময় ও খরচ অনেক বেড়ে যায়। অপ্রয়োজনীয় এসব অডিট পদ্ধতিকে ইউনিফাইড করা প্রয়োজন।

বিটিএমএ সভাপতি মোহাম্মদ আলী খোকন বলেন, কমপ্লায়েন্স মানতে আমাদের মূলত ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকেই সনদ নিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য এটা বড় ধরনের ব্যবসা। আমরা সব ধরনের শর্ত মানলেও পণ্যের ন্যায্য দাম পাই না। সুতরাং সব কমপ্লায়েন্স মানার শর্ত দিলে, এই ভারী বোঝা বহনের শক্তিও আমাদের দিতে হবে। অর্থাৎ, পণ্যের ন্যায্য দাম দিতে হবে।

প্রায় একই কথা বলেন এম এস সিদ্দিকী। তিনি বলেন, বর্তমান আর্থিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের উৎপাদকদের পক্ষে এত ধরনের কমপ্লায়েন্স মানার বাস্তবতা নেই । বিশ্বে সামাজিক ও পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স একেক অঞ্চলে একেক রকম। প্রতিযোগিতামূলক বাজারে বাংলাদেশ সবচেয়ে কম দামে পণ্য রপ্তানি করে অথচ এদেশের পোশাক খাতের ওপর একের পর এক কমপ্লায়েন্সের বোঝা চাপানো হচ্ছে। বর্তমান বৈশ্বিক আইনগুলো প্রয়োজনীয় সংশোধন করে একক ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত