মসজিদের যেসব কাজ নিয়ে রয়েছে কঠিন বার্তা

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ১২:৪৪ এএম

মসজিদ থেকে প্রতিদিন পাঁচবার মানুষকে ডাকা হয়, ‘এসো নামাজের দিকে, এসো কল্যাণের দিকে।’ মুয়াজ্জিনের আজানধ্বনি কর্ণকুহরে পৌঁছতেই আল্লাহর প্রিয় বান্দারা ছুটে যান মসজিদপানে। নামাজ আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে একান্ত আলাপনে মগ্ন হন। মুমিনহৃদয় তার রবের ভালোবাসায় প্রশান্তি অনুভব করে। বলা হয়, মসজিদের সঙ্গে যে বান্দার সম্পর্ক যত গভীর, সে তত বেশি আল্লাহর নৈকট্যলাভে ধন্য হবে। মসজিদ নির্মাণ পুণ্যের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য মসজিদ নির্মাণ করবে, আল্লাহ জান্নাতেও তার জন্য অনুরূপ ঘর তৈরি করে দেবেন।’ -সহিহ বোখারি : ৪৫০

মসজিদ হলো আল্লাহতায়ালার নিদর্শন ও ইসলামের প্রতীক। ইসলামের প্রতীককে সম্মান দেখানো ইমানের দাবি। এ বিষয়ে কোরআনে কারিমে ইরশাদ হয়েছে, ‘যে আল্লাহর নিদর্শনকে সম্মান করে, নিঃসন্দেহে তা অন্তরের তাকওয়া থেকেই।’ (সুরা হজ : ৩২)

হাদিসে মসজিদ বানানোর উদ্দেশ্য বর্ণিত হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘এসব মসজিদ বানানো হয়েছে আল্লাহর স্মরণ ও আলোচনা, নামাজ ও কোরআন পাঠের জন্য। (সহিহ মুসলিম : ২৮৫)

বর্ণিত হাদিসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, ওই উদ্দেশ্যসমূহের প্রতিবন্ধক ও ব্যাঘাতকারী কোনো কাজ মসজিদে করা নিষিদ্ধ। এসব কাজের অন্যতম হলো

উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা নিষিদ্ধ : মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলা মসজিদের আদব ও সম্মানবহির্ভূত কাজ। সুতরাং এটি নিষিদ্ধ। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা তোমাদের মসজিদকে অবুঝ শিশু ও পাগলদের থেকে দূরে রাখো, তদ্রুপ ক্রয়-বিক্রয়, বিচার-আচার, উচ্চৈঃস্বর, দণ্ডপ্রদান ও তরবারি কোষমুক্ত করা থেকে বিরত থাকো।’ (ইবনে মাজাহ : ৭৫০)

মসজিদে চেঁচামেচি ও শোরগোল কেয়ামতের আলামত : এক হাদিসে মসজিদে উচ্চ আওয়াজ ও চেঁচামেচি কেয়ামতের নিদর্শন হিসেবে উল্লিখিত হয়েছে। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যখন লোকেরা জেহাদলব্ধ গনিমতের সম্পদকে নিজের সম্পত্তি বুঝবে, আমানতকে স্বীয় সম্পত্তি গণ্য করবে, জাকাতকে জরিমানা মনে করবে, দ্বীনি ইলম ছাড়া অন্য ইলম শিক্ষা করবে, পুরুষ স্ত্রীর তাঁবেদারি করবে, নিজ মায়ের নাফরমানি করবে, বন্ধু-বান্ধবকে ঘনিষ্ঠ ভাববে আর আপন পিতাকে দূরবর্তী বলে বুঝবে, মসজিদে উচ্চৈঃস্বর ও চেঁচামেচি বেড়ে যাবে, ফাসেক লোক সমাজের সর্দার হবে, সর্বাপেক্ষা নীচ প্রকৃতির লোক সমাজের কার্যভারপ্রাপ্ত হবে, জালেমকে তার জুলুমের ভয়ে লোক সম্মান করবে, নর্তকী ও বাদ্যযন্ত্র বিস্তার লাভ করবে, মদ প্রচুর পরিমাণে পান করা হবে, পরবর্তী লোকেরা পূর্বপুরুষকে মন্দ বলবে, তখন তোমরা এরূপ বিপদের অপেক্ষা করতে থাকবে যে, লালবর্ণের প্রচণ্ড বায়ু অথবা ভূমিকম্প, জমিন ধসে যাওয়া, লোকের রূপান্তর হওয়া ও পাথর বর্ষণ হওয়া ইত্যাদি পরিলক্ষিত হবে। আরও অনেক আপদ-বিপদ ধারাবাহিকভাবে আসতে থাকবে, যেমন মুক্তামালা ছিঁড়ে গেলে দানাসমূহ খসে পড়তে থাকে।’ (জামে তিরমিজি : ২২১০, ২২১১)

মসজিদে হারানো বিজ্ঞপ্তির ঘোষণা নিষিদ্ধ : মসজিদে হারানো বা প্রাপ্তির ঘোষণা করা নিষিদ্ধ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) বলেন, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে ক্রয়-বিক্রয়, হারানো বিজ্ঞপ্তি, কবিতা আবৃত্তি নিষিদ্ধ করেছেন। (সুনানে আবু দাউদ : ১০৭৯)

অন্য বর্ণনায় হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘তোমরা যখন কাউকে মসজিদে হারানো বিজ্ঞপ্তি দিতে শোনো, তখন বলবে, আল্লাহ তোমার হারানো বস্তু ফিরিয়ে না দিক, কেননা মসজিদ তো এজন্য বানানো হয়নি।’ (সহিহ মুসলিম : ৫৬৮)

সমন্বিত জিকিরে সতর্কতা : আলেমরা মসজিদে উচ্চৈঃস্বরে জিকিরের ক্ষেত্রেও সতর্ক করেছেন যে, উচ্চৈঃস্বরে জিকিরের কারণে নামাজি, কোরআন তেলাওয়াতকারী, অন্য ইবাদতকারী ও ইতেকাফকারীদের ঘুমের যেন ব্যাঘাত না হয়। নচেৎ উচ্চৈঃস্বরে জিকিরও নিষিদ্ধ হবে। (ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া : ৬৩৯)

চিন্তার বিষয় এই যে, যেখানে জিকিরের ব্যাপারেও এত কঠোর নির্দেশ, সেখানে সাধারণ কথাবার্তার বিধান কী হবে?

পার্থিব কথাবার্তায় সীমারেখা : নামাজ ও ইবাদত-বন্দেগির উদ্দেশ্যে মসজিদে গমনের পর অবসরে মুসল্লিদের ব্যাঘাত না করে পরস্পর স্বাভাবিক আওয়াজে পার্থিব বৈধ কথাবার্তা বলা জায়েজ। হাদিস শরিফে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ফজরের নামাজের পর নামাজের স্থান থেকে সূর্যোদয়ের আগে উঠতেন না। এ অবস্থায় মুসল্লি সাহাবিরা পরস্পর স্বাভাবিক আওয়াজে কথাবার্তা বলতেন এবং জাহেলি যুগের গল্প করে হাসতেন। হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) ও তাদের গল্প শুনে মুচকি হাসতেন। (সহিহ মুসলিম : ৬৭০)

তবে স্মর্তব্য যে, শুধু পার্থিব কথাবার্তা বলার উদ্দেশ্যেই মসজিদে গমন এবং আসর জমানো নাজায়েজ। (রদ্দুল মুহতার : ১/৬৬২)

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত