স্বতন্ত্রের সংরক্ষিত আসন আওয়ামী লীগের হাতে

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২৪, ০৭:৩৭ এএম

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থীদের সঙ্গে ভোটযুদ্ধ করে জিতে এলেও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা (এমপি) সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসছেন না। দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ স্বতন্ত্র এমপিরা সরকারি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গেই থাকবেন। স্বতন্ত্র পরিচয়ে ৬২ এমপির আনুপাতিক হারে পাওয়া সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মনোনয়নের দায়িত্বও আওয়ামী লীগের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। তাদের মনোনয়ন দেবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগের একাধিক নীতিনির্ধারক ও একাধিক স্বতন্ত্র এমপি দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেছেন, নিজেদের পছন্দে সংরক্ষিত সদস্য নেওয়ার এক ধরনের পরিকল্পনা থাকলেও এখন সেখান থেকে সরে এসেছেন স্বতন্ত্র এমপিরা। তারা আরও বলেন, স্বতন্ত্র এমপি কারোরই কোনো জোট বা ফ্রন্ট গঠন করার আগ্রহ নেই। তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বেই থাকছেন।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা-৪ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপি আওলাদ হোসেন বলেন, ‘আমি মনেপ্রাণে আওয়ামী লীগ। অবস্থার প্রেক্ষাপটে স্বতন্ত্র এমপি হয়েছি। আমি শেখ হাসিনার নির্দেশনার বাইরে যাব না।’

মাদারীপুর-২ আসনে স্বতন্ত্র এমপি তাহমিনা বেগম বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোট করে এমপি হলেও আমি আওয়ামী লীগের। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীর ভোটেই এমপি নির্বাচিত হয়েছি আমি। দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তই স্বতন্ত্র এমপিদের সিদ্ধান্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘সংসদের ভেতরে-বাইরে সবখানেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে আছি, থাকব।’

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের আনুপাতিক হারে পাওয়া সংরক্ষিত মহিলা আসনে কারা সংসদ সদস্য নির্বাচিত হবেন, সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ছেড়ে দেবেন স্বতন্ত্র এমপিরা। এ নেতা আরও বলেন, সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে চান না তারা।

আওয়ামী লীগের দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানা গেছে, আগামী রবিবার আওয়ামী লীগ সভাপতি, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে সাক্ষাৎ করবেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচিত এমপিরা।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, সেদিন প্রধানমন্ত্রীর দেওয়া নির্দেশনা অনুযায়ী সব সিদ্ধান্ত নেবেন স্বতন্ত্র এমপিরা। ওইদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় অনুষ্ঠিত বৈঠকে স্বতন্ত্র এমপিরা সব দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর ছেড়ে দেবেন।

এ প্রসঙ্গে নেত্রকোনা-৩ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপি ইফতেখার উদ্দিন পিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগামী রবিবার গণভবনে বৈঠকের বিষয়টি নিক্সন চৌধুরী মোবাইলে ফোন করে তাকে জানিয়েছেন। স্বতন্ত্র এমপিদের আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত আসনে এমপি কে হবেন তা নেত্রীই (শেখ হাসিনা) নির্ধারণ করবেন।

মুন্সীগঞ্জ-৩ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র এমপি মোহাম্মদ ফয়সাল বলেন, ‘সবার ওপরে আমাদের দলীয়প্রধান আছেন। ওনার ইচ্ছাটা আমরা বুঝি, সেটা অনুযায়ী হবে।’

দুটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচন করবেন এমন একটা বিষয় ভাবা হচ্ছিল। নিয়ম রয়েছে প্রতি ছয়জনে একজন সংরক্ষিত মহিলা সদস্য পাবেন। স্বতন্ত্র ছয়জনকে ২ কোটি করে সর্বমোট ১২ কোটি টাকা যে দেবেন তাকে সংরক্ষিত আসনে সদস্য নির্বাচিত করা হবে, এমন একটি চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছিল। গত মঙ্গলবার সংসদে গতবারের একজন সংরক্ষিত মহিলা সংসদ সদস্য গুরুত্বপূর্ণ একজনকে এ বিষয়টি জানান। বর্তমান সংসদের গুরুত্বপূর্ণ ওই ব্যক্তির কক্ষে এ আলোচনায় তিনি বলেন, ১২ কোটি টাকায় রাজি আছেন তিনি। কিন্তু টাকা দিলেও সংরক্ষিত মহিলা আসনে সদস্য হবেন এ নিশ্চয়তা কোথায়?

জানা গেছে, স্বতন্ত্র এমপিদের এ পরিকল্পনার কথা আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা অবহিত হওয়ার পর সংসদে সংরক্ষিত মহিলা সদস্য নির্বাচনের সুযোগ তাদের হাতে না রাখার সিদ্ধান্ত হয়। সে অনুযায়ী স্বতন্ত্র এমপিদের হাতে থাকা এ সুযোগ আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, স্বতন্ত্র এমপিদের এ পরিকল্পনা সত্যি হয়ে থাকলে এ সুযোগ গ্রহণ করে সংরক্ষিত মহিলা আসনে বিতর্কিত সদস্য নির্বাচিত হয়ে যেতে পারেন। তাই স্বতন্ত্র এমপিরা তাদের আনুপাতিক হারে পাওয়া সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য মনোনীত করা নিরাপদ মনে করছেন না তারা।

এদিকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের কাছে সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের কথা অবহিত করে নির্বাচন কমিশন (ইসি) থেকে চিঠি পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিব মো. জাহাংগীর আলম স্বাক্ষরিত চিঠিতে বলা হয়, জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংসদে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতির ভিত্তিতে রাজনৈতিক দল ও জোটের মধ্যে আসন বণ্টনের জন্য দল ও জোটওয়ারি পৃথক তালিকা করতে হবে। আইন অনুযায়ী, সংসদের সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার তারিখের পরবর্তী ৩০ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে এ তালিকা করতে হবে।

নির্দলীয় সদস্য কোন রাজনৈতিক দল বা জোটে যোগদান অথবা রাজনৈতিক দল বা নির্দলীয় সদস্যদের নিয়ে জোট গঠন করা হলে সে অনুযায়ী পৃথক তালিকা প্রস্তুতের বিধান রয়েছে। অন্যদিকে জোট গঠন অথবা রাজনৈতিক দল বা জোটে যোগদানের বিষয়টি নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশিত হওয়ার পরবর্তী ২১ দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে অবহিত করতে হবে। এ অবস্থায় কোনো নির্দলীয় সংসদ সদস্য দলে বা জোটে যোগদান করেছেন কি না; অথবা সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের উদ্দেশ্যে অন্য কোনো দলের সঙ্গে জোট গঠিত হয়েছে কি না, তা ৩১ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন কমিশনকে জানাতে অনুরোধ করা হয় ইসির চিঠিতে।

স্বতন্ত্র এমপিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইসির পাঠানো চিঠির কোনো জবাব গতকাল বুধবার পর্যন্ত দেওয়া হয়নি। গণভবনে বৈঠক শেষে ইসির চিঠির জবাব দেবে তারা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত