গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্য প্রায় চার মাস ধরে উত্তাল। রক্তপাত, হামলা আর পাল্টা হামলায় ব্যস্ত ইসরায়েল রাষ্ট্রের চারপাশ। তবে এসবের মধ্যেও গাজার ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীকে হত্যা করেই যাচ্ছে ইসরায়েল। জাতিসংঘের আদালত যখন ইসরায়েলকে গণহত্যা ঠেকানোর নির্দেশনা দিয়েছে, ঠিক সেই সময় থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় ১৭৪ জন ফিলিস্তিনির প্রাণ হরণ করেছে তেলআবিব।
বিশ্লেষকরা প্রশ্ন করছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) সিদ্ধান্ত তথা ঘোষণা প্রকৃত অর্থেই কি ইসরায়েল প্রতিপালন করবে! যদি মানার ইচ্ছাই থাকত, তাহলে গাজায় তার নজির দেখা যেত। কিন্তু ইসরায়েল তার নির্বিচার হামলার গতি থামায়নি। গতকাল শনিবার হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ১৭৪ জনকে হত্যার পাশাপাশি ৩১০ জনকে আহত করেছে ইসরায়েল।
গাজায় ইসরায়েলি নৃশংসতার লাগাম টানতে মামলা দায়েরকারী দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা প্রত্যাশা করেছিল, আইসিজে হয়তো গাজায় সামরিক অভিযান বন্ধ করতে ইসরায়েলকে নির্দেশ দেবে। সেইসঙ্গে ইসরায়েল সেখানে গণহত্যা সংঘটিত করেছে- এমন কথাও বলেনি আইসিজে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ইসরায়েলকে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে না দেওয়ার নির্দেশের অর্থ হচ্ছে, ইসরায়েল রাষ্ট্রের আত্মরক্ষার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া। তবে সান্ত¡না হচ্ছে, গাজার পরিস্থিতিকে বিপর্যয়কর বলছে আদালত। এ-ও বলছে, গাজার যা পরিস্থিতি তা ভবিষ্যতে আরও বিপর্যয়ের দিকে যাবে। গত শুক্রবার আইসিজের ১৭ বিচারক সিদ্ধান্ত দেন, ইসরায়েলকে গণহত্যা ঠেকাতে সব কিছুই করতে হবে।
গত মাসে দায়ের করা মামলার শুনানি হয় চলতি মাসের শুরুতে। মূলত যেকোনো মামলায় আইসিজে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে সময় লাগে কয়েক বছর।
অনেকে বলছেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর যা ভাষ্য তাতে মনে হচ্ছে, গাজায় ফিলিস্তিনিদের ওপর আরও নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ চালাতে আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে ইসরায়েলি যুদ্ধযন্ত্র। ইসরায়েলি প্রশাসন বরাবরের মতো বলছে, গণহত্যার অভিযোগ মিথ্যা এবং হামাসই ফিলিস্তিনি বেসামরিক মানুষকে হামলার শিকারে পরিণত করছে।
গত শুক্রবার আদালতের প্রেসিডেন্ট জোয়ান ডোনোহুই বলেন, গাজায় জরুরি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আদালতের কাছে বিবেচ্য ছিল এবং ইসরায়েল যেভাবে মামলাটিকে ছুড়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টায় ছিল তা সফল হয়নি। তিনি আদালতে ফিলিস্তিনিদের দুর্বিষহ পরিস্থিতির বর্ণনা দেন। বিশেষ করে গাজায় শিশুদের অবস্থাকে হৃদয়বিদারক বলে আখ্যা দেন।
ইসরায়েল গণহত্যামূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে , এমন অভিযোগ এনে হেগের আদালতে মামলাটি করে দক্ষিণ আফ্রিকা। এতে ৯টি অন্তর্র্বর্তী পদক্ষেপের আবেদন করেছিল দেশটি। অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির মূল দাবি ছাড়া এসব আবেদনের অনেকগুলোই আদালত আমলে নিয়েছিল।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মরক্ষার অধিকারের যুক্তির কারণে আদালতের পক্ষ থেকে যুদ্ধবিরতির আদেশ দেওয়ার সম্ভাবনা কোনো সময়েই তেমন ছিল না।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়ার আইনের প্রভাষক জুলিয়েট ম্যাকইনটায়র বলেন, ‘আমার কখনোই মনে হয়নি, আদালত যুদ্ধবিরতির আদেশ দিতে পারে। ইসরায়েলের আত্মরক্ষার অধিকারের চূড়ান্ত পর্যায়টা কী, এ নিয়ে আমরা কোনো কথায় যেতে পারি না। তাই যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আমরা কোনো কিছু বলতে যাচ্ছি না।’
তবে আদালতের আদেশকে ‘বড় বিজয়’ হিসেবে অভিহিত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী নালেদি পান্ডোর। তবে দক্ষিণ আফ্রিকার এই শীর্ষ কূটনীতিক বলেছেন, আদালত স্পষ্টভাবে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানাবে, এমনটা প্রত্যাশা করেছিলেন তিনি।
আবার অনেক ফিলিস্তিনি বিষয়টি নিয়ে হতাশ। যেমন পূর্ব জেরুজালেমের বাসিন্দা লেখক মোহাম্মদ আল-কুর্দ বলেছেন, ‘গাজায় অবিলম্বে অবশ্যই সামরিক অভিযান স্থগিত করবে ইসরায়েল, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই অন্তর্র্বর্তী পদক্ষেপের অনুরোধ বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে আইসিজে। অবাক হওয়ার কিছু নয়, তবে বিষয়টি যন্ত্রণা দিচ্ছে।’
