যুদ্ধচিত্র পাল্টাচ্ছে ইরানি ড্রোন

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:১৪ এএম

গত ৭ অক্টোবার ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস অতর্কিতভাবে ইসরায়েলে আক্রমণ চালানোর পর শুরু হওয়া গাজা যুদ্ধ যত এগিয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হামলাও হয়েছে সেই অনুপাতেই। মধ্যপ্রাচ্যে এই সময়ের মধ্যে মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে ১৬৫টি আক্রমণ হয়েছে। সর্বশেষ সিরিয়া সীমান্তবর্তী জর্ডানের একটি এলাকায় মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় নিহত হয় ৩ মার্কিন সেনা এবং আহত হয় কমপক্ষে ৮০ জন।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে ইরানের সমর্থনপুষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোই ওইসব হামলার নেপথ্যের শক্তি। জর্ডানে হামলা নিয়ে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন বলে, জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলায় জড়িত তেহরানের মদদপুষ্ট ইরাকভিত্তিক সশস্ত্র দল কাতাইব হিজবুল্লাহ।  কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এসব হামলার পরিপ্রেক্ষিতে জোরালোভাবে যে বিষয়টি সামনে আসছে; তা হলো ইরানের তৈরি ড্রোনের বিস্তৃতি।

আন্তর্জাতিক থিংকট্যাংক ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর গবেষক এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্ত্র বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ান হিঞ্জ বলেন, ‘ভাবুন এটি নব্বইয়ের দশক। তখন কাতাইব হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালাতে কয়েকটি রকেট ব্যবহার করত। এখন তারা ব্যাপক পরিমাণ ক্ষতিসাধন করতে পারে স্বল্পসংখ্যক ড্রোন দিয়ে অনেক দূরের অবস্থানেও এবং তা বেশ নিখুঁতভাবে।’  জর্ডানের হামলা নিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এটি শাহেদ ড্রোনের সংস্করণ।

মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী ড্রোনটি ইরানের অস্ত্র নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘শাহেদ অ্যাভিয়েশেন ইন্ডাস্ট্রিজ রিসার্চ সেন্টার’ থেকে তৈরি। হিঞ্জ বলছেন, মার্কিন কর্মকর্তাদের কথা সত্য হলে, বলতেই হবে, কাতাইব হিজবুল্লাহর কাছে ক্ষুদ্র সংস্করণ ‘শাহেদ ১০১’ এবং অপেক্ষাকৃত বড় ডেল্টা উইংয়ের ‘শাহেদ ১৩১’-এর মজুদ রয়েছে। এর পাল্লা ৭০০ কিলোমিটার পর্যন্ত এবং মূল্য ২০ হাজার ডলার বা এর বেশি। গত পাঁচ বছরের বিশ্বব্যাপী সংঘাতের ঊর্ধ্বগতিতে এর উৎপাদনের গতি বেড়েছে। আশির দশকে ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় থেকেই ড্রোনের প্রতি তেহরান প্রশাসনের ঝোঁক দেখা গেছে। পশ্চিমা অস্ত্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগের অভাবে তারা ড্রোন বিকাশের পথে গেছে। ২০১৯ সালে অন্য সৌদি আরবের আবকাইক ও খুরাইস তেল স্থাপনায় হামলা হয় যার কারণে বিশ্বের তেল উৎপাদন ৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। তবে এই ঘটনায় প্রথমে মনে করা হচ্ছিল, ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবে হামলাটি চালিয়েছিল; কারণ ওই সময় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন বহুজাতিক বাহিনী সুন্নিদের পক্ষ নিয়ে হুথিদের বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সৌদি প্রশাসন বলেছিল, প্রকৃতপক্ষে ড্রোনটির গতিপথ বিশ্লেষণ করে দেখা যায় হুথি নয় বরং ইরানের দিক থেকে ধেয়ে আসে ড্রোনটি। সেই ড্রোন ছিল শাহেদের ডেল্টা উইং।

২০২১ সালের জুলাইয়ে ডেল্টা উইংয়ের ড্রোন দিয়ে হামলা হয় ইসরায়েলি তেলক্ষেত্র মার্সার স্ট্রিটে। এতে ব্রিটিশ ও রোমানিয়ার দুই নাগরিক প্রাণ হারান। তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করেন, এতে ইরানের দায় রয়েছে। ওই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ইরান এই ধরনের ড্রোন থাকার কথা স্বীকার করেনি। পরে ইরান ‘শাহেদ ১৩১’ উন্নয়নের পাশাপাশি ‘শাহেদ ১৩৬’ সংস্করণের কথা জানায়।

২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণ করে রাশিয়া। পশ্চিমা বিশে^র দাবি, রাশিয়া অস্ত্র সংকটে পড়লে মস্কোতে বিশ্বের অন্যতম অস্ত্র সরবরাহকারী হয়ে ওঠে ইরান। ২০২২ সালে শরৎকালে প্রথম ইরানি ড্রোন দেখা যায় ইউক্রেনের যুুদ্ধক্ষেত্রে। এ সময় কোরীয় ড্রোনের কথাও শোনা যায়। ইউক্রেনের একজন কমান্ডার জানান, খারকিভে ‘শাহেদ ১৩৬’ পাওয়া গেছে যা ওই সময় একটি ‘এম৭৭৭’ হাউইটজার কামান ধ্বংস করেছিল। ওই বছরের পরের মাসগুলোতে ইরানি ড্রোনগুলো সচরাচরই দেখা যেত। বলা হয়ে থাকে, কামান থেকে ১০০ গোলা নিক্ষেপ করার চেয়ে এসব ড্রোন হামলা চালানো সহজ। ‘শাহেদ ১৩৬’-এ হালকা কার্বনের ফাইবার এয়ারফ্রেম রয়েছে। এর পাল্লা দেড় হাজার কিলোমিটার। বেলারুশ থেকে ইউক্রেনের উত্তরে এবং রুশ দখলে থাকা অঞ্চলগুলো থেকে ইউক্রেনের দক্ষিণে এসব ড্রোন ওড়াতে পারে রাশিয়া। ১৩৬ সংস্করণ ২০-৪০ কেজি পর্যন্ত বিস্ফোরক বহন করতে পারে যা ১৩১ সংস্করণের তুলনায় দ্বিগুণের মতো। যুক্তরাজ্যভিত্তিক ‘রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউট’-এর অ্যাভিয়েশন বিশ্লেষক জাস্টিন ব্রংক বলেন, গাইডেড ক্রুইজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করতে এই ড্রোন সর্বোত্তম সস্তা বিকল্প। এদের গতিপথ আগেই প্রোগ্রাম করা থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের নেভিগেশন ব্যবস্থার উদ্ভাবনী প্রযুক্তির মিশেল থাকায় এগুলোর গতিপথ নির্ণয় করা কঠিনতর কাজ হয়ে দাঁড়ায়। শাহেদ ড্রোন সহজেই মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অ-রাষ্ট্রীয় মিত্র পক্ষগুলোর কাছে সরবরাহ করা যায়। গাজা যুদ্ধের জবাব দিতে ইরানি ‘প্রতিরক্ষা অক্ষ’ হিসেবে আবির্ভূত হওয়া হিজুবল্লাহ, হুতি ও কাতাইব হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর কাছে সহজেই এগুলো পৌঁছে যায়। এসব ড্রোন অস্ত্র দিয়ে ধ্বংস করা গেলেও, এগুলো ব্যয় করতে মনোযোগ দিতেই হবে। অর্থাৎ এগুলোকে রুখতে প্রতিরক্ষা খরচ ব্যয় করতেই হবে।

ইউএস সেন্টার ফল নেভাল অ্যানালাইসিসের ড্রোন বিশেষজ্ঞ স্যামুয়েল বেন্ডেট বলেন, ‘যুদ্ধাস্ত্রে অনেক বেশি ব্যয় করার পরিবর্তে, এটি (শাহেদ ড্রোনের ব্যবহার) দেখায় যে, একটি সস্তা ড্রোন কিনুন; আশা করতে পারেন, এটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করবে অথবা শত্রুরা একে ভূপাতিত করতে প্রতিরক্ষা ব্যয় করবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত