ক্ষতিপূরণ চাওয়ার কথাও ভাবতে পারে বাংলাদেশ

আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৭:২৯ এএম

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর সঙ্গে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সংঘাতের মধ্যে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার ঘটনা থামছেই না। পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি), সেনাবাহিনী, পুলিশ ও ইমিগ্রেশনের সদস্য এবং বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। এরই মধ্যে মিয়ানমার থেকে আসা মর্টার শেলে বান্দরবানের ঘুমধুম সীমান্তে বাংলাদেশি নারীসহ দুজন নিহতের ঘটনায় সীমান্তবর্তী এলাকায় চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে গতকাল মঙ্গলবার ঢাকায় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিজিপিসহ দেশটির নাগরিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারেও আলোচনা চলছে।

মিয়ানমারে এ পরিস্থিতির ফলে নতুন করে রোহিঙ্গাদের প্রবেশ ঠেকানো এবং তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আরও বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এ সংঘাত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ হলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। এতে সবচেয়ে বেশি সংকট হবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করার ক্ষেত্রে। এ ছাড়া বাংলাদেশের নাগরিক হতাহতসহ সামগ্রিক পরিস্থিতির জন্য মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত বলেও অভিমত তাদের।

তবে এবার আগের মতো বাংলাদেশ অভিমুখে রোহিঙ্গা ঢল নামবে না বলে অভিন্ন মত পোষণ করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, এবার মিয়ানমারের সামরিক জান্তা ও আরাকান আর্মির মধ্যে সংঘর্ষ হচ্ছে। সেখানে কোনো পক্ষেরই লক্ষ্য রোহিঙ্গা নয়। কিন্তু সংঘাত চরম বলেই তারা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তাই রোহিঙ্গারা আগের মতোই বাংলাদেশে পালিয়ে আসার চেষ্টা করবে। তাদের অভিমত, এখন উচ্চপর্যায়ে কূটনৈতিক আলোচনা করতে হবে। আমাদের সীমান্ত রক্ষায় দুই দেশের মধ্যে আলোচনা এবং চীন ও ভারতের সঙ্গেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কারণ চীনের সীমান্তেও একই ঘটনা ঘটেছে। তারা এরই মধ্যে আলোচনা করেছে। বাংলাদেশও এরই মধ্যে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে।

জাতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের সবচেয়ে বেশি খেয়াল রাখা উচিত রাখাইন রাজ্যের ওপর। এখানে চীনের সঙ্গে তাদের সীমান্তের একটা বিষয় আছে। চীনের সীমান্ত এলাকায়ও কিছু কিছু গোলা-বোমা নিক্ষেপ হয়েছে। চীন তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসেছে এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। আমাদের এখানেও দেখা যাচ্ছে, আরাকানের রাখাইন অঞ্চলে প্রচণ্ড সংঘাত চলছে। বিশেষ করে রোহিঙ্গারা যেসব অঞ্চল থেকে আমাদের দেশে চলে এসেছে, সেসব অঞ্চলেও রোহিঙ্গারা রয়ে গেছে। কয়েক দিন ধরেই দেখছি সেই সব অঞ্চল দখলের চেষ্টা করা হচ্ছে; একটি অঞ্চল দখলে নিয়েছে বিদ্রোহীরা। এ দখলের জন্য মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রচণ্ড গোলাগুলি করেছে। তবে আমরা যে আশঙ্কা করছি বড় আকারে রোহিঙ্গাদের আসা, সেই সম্ভাবনা কম। কারণ এর আগে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের তাড়িয়েছে পরিকল্পনা করে। এখন রোহিঙ্গাদের তাড়ানোর সম্ভাবনা বা পরিকল্পনা মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নেই। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী ও আরাকান আর্মি পরস্পর মুখোমুখি। সেখানে আরাকান আর্মিও রোহিঙ্গাদের তাড়ানোর মতো পরিস্থিতিতে নেই। এরকম সংঘাতের মধ্যে রোহিঙ্গারা ভয় পেয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে। পরিস্থিতি থেকে বাঁচার জন্য তারা আসছে।’

এই বিশ্লেষক মনে করেন, ‘এ সংঘাতের ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বে। কারণ সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রদূত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এসে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তাদের ইতিবাচক ভূমিকার কথা বলে গেছেন। কিন্তু তিনি প্রত্যাবাসনের জন্য স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও পরিবেশের কথাও বলেছেন। কারণ চীনের রাষ্ট্রদূত এবং অন্যরা সবাই বলেছেন যে, পরিস্থিতির স্বাভাবিক অবস্থায় প্রত্যাবাসন শুরু হবে। কাজেই এই মুহূর্তে তো হবেই না। এখন হঠাৎ করে যে পরিস্থিতি হয়েছে, তা কবে স্বাভাবিক হয় সেটা অনিশ্চিত। তাহলে বোঝা যাচ্ছে আমাদের জন্য রোহিঙ্গা পরিস্থিতিটা দিন দিন জটিল হয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই প্রত্যাবাসন নিয়ে গড়িমসি করছে, এর মধ্যে এ সংঘাতের কারণে মিয়ানমার সেনাবাহিনী আরও একটি সুযোগ পেয়ে গেছে। প্রত্যাবাসনের কথা বললে তারা বলবে যে, এ অবস্থায় যুদ্ধের মধ্যে আমরা কীভাবে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেব। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারাও যেতে রাজি হবে না। সেখানে আরাকান আর্মি যদি কোনোভাবে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে তাতেও প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা অনেক কম। কারণ সেই আরাকান আর্মির সঙ্গে আমাদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা যা-ই হোক না কেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও তা অনেক বেশি জটিল হয়ে গেছে।’

এক বছর ধরে কক্সবাজার ও বান্দরবান সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারে বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে দেশটির সেনাবাহিনী এবং সীমান্তরক্ষী বাহিনীর লড়াই চলছে। মাঝে কিছুদিন উত্তেজনা কমে এলেও তিন দিন ধরে তুমুল লড়াই হচ্ছে। রাখাইনে প্রচণ্ড সংঘাতের কারণে কক্সবাজারের টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বাসিন্দারা উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। সেখানকার গ্রামগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি। এর মধ্যে গত সোমবার মিয়ানমার থেকে একটি মর্টার শেল ঘুমধুমের একটি বাড়িতে এসে পড়ে বাংলাদেশি এক নারীসহ দুজন নিহত হন। এরপর থেকে সীমান্ত এলাকার বাসিন্দারা বাড়িঘর ছেড়ে আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিতে শুরু করেছে। মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছে ২৬৪ রোহিঙ্গা। তাদের মধ্যে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিজিপি, সেনাবাহিনী, পুলিশ, ইমিগ্রেশনের সদস্য ও বেসামরিক নাগরিকও রয়েছেন। সীমান্তে সতর্ক অবস্থায় রয়েছেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যরাও।

গতকাল দুপুর ১২টার দিকে বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম জানান, সর্বশেষ তথ্যমতে, ২২৯ জন বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে পালংখালী সীমান্ত দিয়ে এসেছেন ১১৪ জন। এখানে শুধু বিজিপি সদস্য নন, সেনাবাহিনীর সদস্য, কাস্টমস সদস্য ও আহত মিয়ানমারের সাধারণ নাগরিক আছেন। এই মুহূর্তে কতজন আহত আছেন, তা জানাতে পারেননি তিনি।

এবারের পরিস্থিতি কিছুটা অন্যরকম। এ পরিস্থিতিতে সরকারের কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া উচিত এ প্রশ্নে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রথমে আমাদের একজন নাগরিক মারা যাওয়া ও একজন রোহিঙ্গা মারা যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। তাদের অভ্যন্তরীণ কী হবে, সেটার জন্য বাংলাদেশ তো ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। এর জন্য মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষের কাছে প্রতিবাদ জানাতে তো হবেই। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। তবে এসব প্রতিবাদে তেমন কোনো ফল হয় না। কারণ যখন দুপক্ষ যুদ্ধ অবস্থায় আছে, তখন তারা একে অন্যকে অভিযুক্ত করার চেষ্টা করবে। মিয়ানমার কর্র্তৃপক্ষ বলবে, আমরা তো এটা চাইনি। যুদ্ধাবস্থায় যখন এরকম পরিস্থিতির উদ্ভব হয়, তখন সেটার দায় কেউই স্বীকার করে না। কাজেই আমাদের ক্ষতিপূরণ দাবি করা উচিত, যারা মারা গেছে তাদের পরিবারের পক্ষ থেকে। পরিস্থিতি এরকম চললে এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে। এটা প্রতিবেশী দেশ হওয়ার কারণেই। আমরা তো এমনিতেই কয়েক বছর ধরে মিয়ানমারের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এবারও তাই হব।’

মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এটা আসলে কতটা সম্ভব এ বিষয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘তাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে, আমরা তা জানি না। কারণ তারা তো প্রাণ রক্ষার্থেই এখানে আশ্রয় নিয়েছেন। এমন তো হতে পারে ফিরে গেলে তাদের ফায়ারিং স্কোয়াডে দেওয়া হবে। সেরকম আশঙ্কা থাকলে আমি মনে করি না যে তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া উচিত। তারা যদি আরাকান আর্মির সঙ্গে লড়াই করে মারা যেত, সেটা ছিল অন্য ইস্যু। আমার মনে হয় একটু জেনে তাদের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।’

সীমান্তে মিয়ানমারের আরও শতাধিক নাগরিক বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার অপেক্ষা করছে, এ পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গাদের প্রবেশে ঠেকাতে সরকারের কী করা উচিত এ প্রশ্নের জবাবে কূটনৈতিক বিশ্লেষক তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশ এর আগে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে মানবিকতা দেখিয়েছে। কিন্তু কতটা সম্ভব! তাদের ১১ লাখ, সাড়ে ১১ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। এখন যদি আবারও ঢল নামে তাহলে সেটা মোকাবিলা করা অসম্ভব। কারণ এরই মধ্যে শরণার্থীদের জন্য আমাদের স্থানীয় নাগরিকদের সমস্যা হচ্ছে। যদিও আমরা এর জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসা পাচ্ছি। কিন্তু কেউই তাদের ফিরিয়ে নিতে সহযোগিতা করেনি। এখন অনুপ্রবেশের বিষয়ে আমাদের কঠোর হতে হবে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে শক্ত অবস্থান নিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত