সপ্তাহের অধিক সময় ধরে চলা মিয়ানমারের অভ্যন্তরের ত্রিমুখী সংঘর্ষ গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে কিছুটা কমলেও কাটেনি সীমান্তবাসীর আতঙ্ক। গতকাল বুধবার মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘাতের কোনো শব্দ শোনা যায়নি। তবে টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত দিয়ে ৬৫ জন মিয়ানমার সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) সদস্য পালিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী গতকাল তমব্রু সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে গত কয়েক দিনে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা সব বিজিপি সদস্যকে নৌপথে ফিরিয়ে নেবে দেশটি। আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে জাহাজ পাঠিয়ে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার কথা রয়েছে।
গতকাল সকালে ঘুমধুমের তমব্রু বাজারে গিয়ে দেখা যায়, পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক। তিন-চার দিন বন্ধ থাকার পর বাজারের অধিকাংশ দোকানপাট এখন খোলা। তবে ক্রেতা তেমন চোখে পড়েনি।
এ বিষয়ে বাজারের চায়ের দোকানদার শরীফ হোসেন বলেন, ‘ওপারের কোনো বিশ্বাস নেই। ওখানে কখন আবার যুদ্ধ শুরু হয় বলা যায় না। তাই সীমান্তের বেশিরভাগ শিশু ও নারী এখনো এলাকায় ফেরেনি। পুরুষরা প্রয়োজন ছাড়া ঘোরাফেরা করছেন না। সেখান থেকে একটু সামনে গিয়ে দক্ষিণপাড়ায় কথা হয় প্রায় ৫০ বছর বয়সী রহিম উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমার পরিবারের কোনো নারী ও শিশু সদস্য তিন দিন ধরে বাড়িতে নেই। আরও কয়েক দিন তাদের বাড়িতে আনব না। পরিস্থিতি বুঝি আগে, তারপর ব্যবস্থা নেব।’
এরপর ঘুমধুমের বেতবুনিয়া বাজারে গিয়ে দেখা যায়, ৫০-৬০টি দোকানের মধ্যে বেশিরভাগ দোকানই খোলা হয়েছে। মানুষ চায়ের দোকানে আড্ডা দিচ্ছেন। তরকারির দোকানগুলোতে ভিড় বাড়ছে। কয়েক দিন ধরে এই বাজারের মাত্র কয়েকটি দোকান খোলা থাকত। বেতবুনিয়া বাজার থেকে জলপাইতলী-তমব্রু সড়কে ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার চলাচল গত মঙ্গলবারের চেয়ে একটু বেড়েছে।
ঘুমধুম ইউপি চেয়ারম্যান এ কে এম জাহাঙ্গীর আজিজ বলেন, ‘মিয়ানমারের অবস্থা বৈশাখের আকাশের মতো। কখন কালবৈশাখী আসে বলা যায় না। তাই গোলাগুলির আওয়াজ না শুনলেও আমরা আতঙ্কে আছি।’
ঘুমধুম সীমান্ত ঘুরে দুপুরে উখিয়ার পালংখালীর সীমান্তঘেঁষা ১, ২ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, গ্রামগুলোতে বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। নেই শিশুদের কোলাহল। ওই সময় ওই এলাকায় বসবাসকারী আবুল বশর বলেন, বিজিপি ও মিয়ানমারের কিছু উগ্রপন্থি গ্রামে প্রবেশের চেষ্টা করেছে।
পালংখালীর ইউপি চেয়ারম্যান আবদুল গফুর বলেন, কখন কী হয় বলা মুশকিল। তাই সীমান্তবাসী আতঙ্কে রয়েছে।
বান্দরবানের জেলা প্রশাসক শাহ মুজাহিদ উদ্দিন বলেন, ‘সীমান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। গতকাল গোলাগুলির কোনো খবর শুনিনি। তবুও আমরা সতর্ক রয়েছি। সীমান্তবাসীকে আরও কয়েক দিন নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছি।’
চার দিনে পালিয়ে এলো ৩২৯ বিজিপি : গতকাল বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছেন সে দেশের সীমান্তরক্ষী বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৬৫ জন সদস্য। এ নিয়ে গত চার দিনে প্রাণে বাঁচতে বিজিপির ৩২৯ সদস্য পালিয়ে এসে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের (বিজিবি) কাছে আশ্রয় নিয়েছেন। গতকাল সন্ধ্যায় কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে একজন ও দুপুরে ৬৪ জনসহ ৬৫ বিজিপি সদস্য পালিয়ে আসেন। তাদের নিরস্ত্র করে হেফাজতে নেয় হোয়াইক্যং বিওপি।
রামুর সেক্টর কমান্ডার মেহেদী হাসান কবির বলেন, হোয়াইক্যং পয়েন্ট দিয়ে গতকাল ৬৫ জন বিজিপি সদস্য কক্সবাজারে প্রবেশ করেছেন। তাদের নিরস্ত্র করে আশ্রয় দেওয়া হয়।
সীমান্তরক্ষীদের নৌপথে ফিরিয়ে নেবে মিয়ানমার : মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা বিজিপি সদস্যদের নৌপথে ফিরিয়ে নেবে দেশটি। আজ বৃহস্পতিবার কক্সবাজারে জাহাজ পাঠিয়ে বিজিপি সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়া হবে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া বিজিপি সদস্যদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গতকাল মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী থান শোয়ের সঙ্গে ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ড. মনোয়ার হোসেন বৈঠক করেন। বৈঠকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সে সময় মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের জাহাজে করে ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেনও গতকাল সাংবাদিকদের বলেছেন, বিজিপি সদস্যদের সমুদ্রপথেই ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তবে তিনি কোনো দিনক্ষণ বলেননি। গতকাল এক আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের পর পররাষ্ট্র সচিব বলেন, ‘মিয়ানমার প্রাথমিকভাবে প্রস্তাব করেছিল যে সীমান্তরক্ষীদের সমুদ্রপথে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে। কিন্তু আমরা ভেবেছিলাম এটা নিরাপদ হবে না। এখন আমরা ভাবছি তারা যেভাবে চায় সেভাবেই তাদের সমুদ্রপথে ফেরত পাঠানো যেতে পারে।’
ঘুমধুম ও তমব্রু জনগণের জন্য নিরাপদ নয় : বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেছেন, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ও তমব্রু সীমান্ত এলাকা সাধারণ জনগণের জন্য নিরাপদ নয়। তিনি এই এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাওয়ার আহ্বান জানান। গতকাল তমব্রু সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা জানান।
বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘এটা স্বাভাবিক যে, নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র থাকাটা আদৌ সুখকর কোনো কিছু নয়। তবে জীবন রক্ষার জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি যখন হয়, তখন তো কিছুটা করতেই হবে। আমাদের সাধারণ জনগণের জন্য জায়গাটা নিরাপদ নয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘তমব্রু ও ঘুমধুমের পাশের বিওপিগুলোর সীমান্ত এলাকায় সংঘাতের প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিছু গোলাগুলি হয়েছে, কিছু কিছু হচ্ছেও। এখনই সব সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের সরে যাওয়ার কথা বলছি না।’
এক প্রশ্নের জবাবে বিজিবি মহাপরিচালক বলেন, ‘বর্ডার লাইনের কিছুটা ভেতরে ফায়ার করলে মর্টার শেল বা অন্যান্য গোলাবারুদের কিছু কিছু অংশ অন্যদিকে চলে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকে। সেই সম্ভাবনা যেন শূন্যের ঘরে চলে যায়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছি।’
এদিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন গুলিবিদ্ধ বিজিপির পাঁচ সদস্যকে দেখতে যান বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। গতকাল বিকেল ৪টার দিকে তিনি হাসপাতালে যান এবং আহত সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন ও চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
সেই ২৩ উগ্রপন্থির বিরুদ্ধে মামলা করবে বিজিবি : বাংলাদেশ মিয়ানমার সীমান্ত পেরিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে গ্রামে ঢুকে পড়া মিয়ানমারের সেই ২৩ উগ্রপন্থির বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা করবে বিজিবি। গতকাল দুপুরে ঘুমধুম সীমান্ত পরিদর্শন শেষে এক প্রেস বিফ্রিংয়ে এ কথা জানিয়েছেন বিজিবির মহাপরিচালক।
এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত ঘেঁষে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সে দেশের সেনাবাহিনী, বিজিপি ও বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মির (এএ) মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ চলছে। সেই থেকে মুহুর্মুহু গুলি, বোমা, গ্রেনেডের আওয়াজে আতঙ্ক ও অস্থিরতায় দিন কাটে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়ন, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার পালংখালী ও টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের সীমান্ত ঘেঁষে বসবাসকারী লোকজনের। এ পর্যন্ত ওপার থেকে গুলি ও মর্টার শেলের আঘাতে তিনজন নিহত ও অনেকে গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
